সমঝোতা ইস্যুতে কঠোর হাসিনা, নমনীয় খালেদা

69

যুগবার্তা ডেস্কঃ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা অনঢ় ও কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। তিনি বিএনপির সঙ্গে কোন ধরনের সংলাপ চাইছেন না। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করতে চান, এই জন্য সংলাপ চান। দেশের চলমান অবস্থারও নিরসন চেয়েছেন। কিন্তু সরকার এই ব্যাপারে বিএনপির কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন না। এই কারণে সরকারের সিনিয়র যারা মন্ত্রী রয়েছেন তারাও চাইছেন যাতে বিএনপির সঙ্গে কোন সংলাপ না হয়। এবং তারা এই ব্যাপারে অব¯’ান নিয়েছেন কোনভাবেই ২০১৯ সালের আগে কোন নির্বাচন হবে না। কোন আলোচনাও হবে না। ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে যদি তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে চায় তাহলে আলোচনা হতে পারে তাও সংবিধানের আলোকে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী মেনে নিয়েই যদি বিএনপি নির্বাচন করতে রাজি হয় তাহলে। না হলে কোন সম্ভাবনা নেই। তবে নীতি নির্ধারকদের কয়েকজন বলেছেন, সেটা বিএনপি করতে চাইলেও হয়তো প্রয়োজন হবে না। কারণ তারা আন্দোলনের নামে যেভাবে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছে এরপর তাদের সঙ্গে সমঝোতার কোন সুযোগ নেই। যার হাতে মানুষ পোড়ানোর গন্ধ তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কোন সংলাপ চান না।
বিএনপি চেয়ারপারসনের একজন উপদেষ্টা বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিএনপিকে নিয়ে সমঝোতার এক টেবিলে বসতে চাইছেন না। তিনি ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে চাইছেন। এই জন্য সব ব্যব¯’া করছেন। আমাদের নেতা কর্মীদের দমন করতে করতে এমন অব¯’ায় নিয়ে গেছেন যাতে আমরা আন্দোলনও করতে না পারি। সরকার মনে করছে আমাদের কাউন্সিল করতে না দিলে অন্তত নির্বাচনে আসার একটা ধাপ পিছিয়ে রাখা যাবে। তবে সরকার এখন ভুল পথে হাঁটছে। এই পথ পরিহার করেই সংলাপ ও সমঝোতা করতে হবে। না হলে তারা ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার যে পরিকল্পনা করছে, তা স্বপ্নই রয়ে যাবে। অনেকেইতো অনেক পরিকল্পনা করেন সব কি আর বাস্তবায় হয়? সরকারেরটাও হবেনা। আমরা সেটা হতে দিব না।
এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা আলোচনা হবে না। আওয়ামী লীগ লড়াইয়ে বিশ্বাস করে। এ লড়াই হবে ২০১৯ সালের নির্বাচনে। কার সঙ্গে সমঝোতা বা আলোচনা করব? এগুলো তো আসলে চটকদার কথা। এর মাধ্যমে কোনো সমস্যার সমাধান আসে না। সংবাদ মাধ্যমে শুধু হেডলাইন হওয়া যায়। আমরা কোনো আলোচনা বা সমঝোতা করবো না। নির্বাচনের মাধ্যমেই সবকিছু নির্ধারিত হবে। আর ২০১৯ সালের আগে কোনো নির্বাচন হবে না। আরও বলেন, ২০১৯ সালের লড়াইয়ে প্রমাণ হবে কে বাংলাদেশ, কে জিম্বাবুয়ে। আমাদের একটাই লক্ষ্য, ৭১’র ঘাতকদের দন্ড কার্যকর করা। বিএনপি’র চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তার স্বামী জিয়াউর রহমান একাত্তরের খুনিদের প্রশ্রয় দিয়েছেন। খালেদা মনে করেন, একাত্তরের ঘাতক জামায়াত-শিবির তাদের বন্ধু। তাই তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হতে পারে না। তার মতে, নির্বাচনে আসুন। নির্বাচনের মাধ্যমেই ফলাফল নির্ধারিত হবে। খালেদা জিয়ার দল লড়াই না করে পালিয়ে যায়। কিন্তু আমরা লড়াইয়ে বিশ্বাস করি। নির্বাচনী লড়াইয়েই জনগণ রায় দেবে।
আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকও বলেছেন, বিএনপিতো জানে যে এখন আর তাদের হাতে কোন সুযোগ নেই। কারণ তারা ভুল করেছে। এই ভুলের কোন মাশুল নেই। এই কারণে তারা সব চেষ্টা করেও নিজেদের ট্রেন লাইনে তুলতে পারছে না। বরং তাদেরকে লাইনে আসতে হলে সংবিধানের মূল ধারায় নিয়ে এসেই সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হবে। সরকারের অবস্থান মেনে নেওয়ার পরই তাদের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে। এর আগে কোন সুযোগ নেই। দেশ নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র চলছে। কিন্তু এই সব ষড়যন্ত্রের কাছে সরকার হার মানবে না নতিও স্বীকার করবে না। সব ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করা হবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বাংলাদেশে আইএস আছে, জঙ্গিরা আছে, এটি প্রমাণ করতে পারলে দেশের কী হবে, একবার ভেবে দেখেছেন। একটি পক্ষের লক্ষ্য হলো সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তানের পর্যায়ে বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়া। সেজন্য আমাদের সচেতন থাকতে হবে। জনগণকে সচেতন থাকতে হবে। জাতি হিসেবে সচেতন না থাকলে আমাদের সর্বনাশ হবে। বিদেশি হত্যার মতো ঘটনাগুলো কেন ঘটানো হচ্ছে? কারণ, একটি পক্ষ চায় দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া। এগুলো কারা করছে? হাড়ির ভাত একটি টিপলে যেমন বোঝা যায়, বাকিগুলো কেমন, তেমনি একটি ঘটনার উদঘাটন হলেই বোঝা যায় ওই ধরনের অন্যান্য ঘটনা কীভাবে ঘটছে।
তিনি বলেন, তারাই বাংলাদেশে আইএস আছে- এটি প্রমাণ করতে চাইছে। প্রমাণ করা গেলে বাংলাদেশে কী ঘটতে পারে তা দেশবাসিকে অনুধাবন করতে হবে। সিরিয়ায় কী হচ্ছে, লিবিয়ায় কী হচ্ছে, ইরাকে কী হচ্ছে সেসব দেশে যা হচ্ছে, তারা বাংলাদেশেও সেই অবস্থা সৃষ্টি করতে চায়। বাংলাদেশে ওই অবস্থা সৃষ্টি হোক তা তার সরকারের কাম্য নয়। প্রচ- চাপ.. যে আমরা কেন স্বীকার করি না। আমরা দেখতে পাচ্ছি কে, কারা এসব করছে। আমাদের যে সমাজ, তাতে সবাই তো চেনা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটিয়ে দেশকে অকার্যকর করার ষড়যন্ত্র চলছে। যারা জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটিয়ে দেশকে অকার্যকর করতে চায় তাদের প্রতিহত করা হবে। দেশের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে। দেশে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। ইতোমধ্যে সরকার অরাজকতা সৃষ্টিকারীদের আইনের আওতায় এনে দমন করেছে। বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সব ধরনের ব্যবস্থ্য গ্রহণ করবে সরকার। যারা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। কোনো অবস্থাতেই ষড়যন্ত্রকারীরা পার পাবে না।
ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়ার দাবি, মিলিটারি পুলিশের ওপর হামলার এই ঘটনা পরিকল্পিত। যারা আন্দোলনের নামে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল, নিরীহ মানুষ ও শিশু পুড়িয়েছিল তারাই এ হামলার সঙ্গে জড়িত। তারা পুলিশের ওপর এই হামলা করে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়। পুলিশ তা প্রতিহত করবে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ট্রাস্টিবোর্ডের সদস্য এম হাফিজ উদ্দিন বলেছেন, দেশে গণতন্ত্রের কোন চর্চা নেই। সকল রাজনৈতিক দলের সমঝোতায় আবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনই এখন গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার একমাত্র সমাধান। দেশে হত্যা-গুমের ঘটনা বেড়েই চলেছে প্রতিদিন শত শত মানুষ গ্রেপ্তার হচ্ছে। প্রতিটি সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এমনকি কচুক্ষেত এলাকায় সেনানিবাসের চেকপোস্টের মিলিটারি পুলিশকে পর্যন্ত কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। কাদের এত বড় সাহস। কারা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে এসব নিয়ে সরকারের কোন মাথাব্যথা নেই। বিরোধী দলও সংসদে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলে না। কিন্তু তাদের নিয়ে কেউ সমালোচনা করলে কিংবা স্বার্থে আঘাত লাগলে সরকারি দল ও বিরোধী দল একই সুরে কথা বলে। বাংলাদেশে বিরোধী দল কোন কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। এটি কোন সংগঠনের মতামত নয় এটি সর্বসাধারণের মতামত। সংসদে কার্যকর বিরোধী দল না থাকা একটি দেশের জন্য ক্ষতিকর। এম হাফিজউদ্দিন বলেন, টিআইবির প্রতিবেদনে কোন ভুল নেই। টিআইবি দুর্নীতি নিয়ে কাজ করে। এটি কোন রাজনৈতিক সংগঠন নয়। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সে সরকারই বলে টিআইবি বিরোধী দলের হয়ে কাজ করছে। এর আগে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তারাও বলেছে টিআইবি আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করছে। হাফিজ উদ্দিন বলেন, টিআইবির অর্থ সরকারের মাধ্যমেই বিদেশ থেকে আসে। এ অর্থের উৎস সম্পর্কে সরকার খুব ভালোভাবেই অবগত। সংসদের বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ণ সম্পর্কিত প্রিভিলেজ কমিটিতে তলব করা হলে তারা যেতে রাজি আছেন।
খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান বলেন, সরকার এখনও জঙ্গী দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সতর্ক রয়েছে বললেও সেটা পারছে না। একের পর এক ঘটনা ঘটছে। তবে রাজনৈতিক দলকে দমনে বসে নেই বিএনপির উপর নির্যাতন অত্যাচার চলছেই। এক মামলায় নেতারা জামিন পেলে আরেক মামলায় আবার তাদেরকে আটকানোর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকারের আইনজীবীরা। মঙ্গলবার বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার ও যুগ্ম মহাসচিব বরকত উল্লাহ বুলুসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লা অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে এ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এইভাবে বিএনপিকে মাইনাস করার চেষ্টা চলছে। সেটা পারবে না।
বিএনপির নেতারা জামিন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদেরকে আবার কারাগারে নিতে সব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রোবার দুই নেতার জামিন হয়ে মুক্ত হওয়ার পর মঙ্গলবার আবার তাদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারী হলো। সূত্র জানায়, বিএনপি বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করতে চাইছে। এক সঙ্গে কাজ করতে চাইছে। এই জন্য সংলাপ চাইছে ও নমনীয় হয়ে প্রস্তাবও দিয়েছে। কিন্তু সরকার সেটা আমলেই নিবে না। কোন সংলাপ করবে না। সাফ জানিয়ে দিয়েছে। বিএনপি মনে করছে, বাংলাদেশের সংকট আরো ঘনীভূত হতে যাচ্ছে, অনিশ্চয়তা আরো বাড়ছে। সেটা ভাল হবে না। এই জন্য দ্রুত সংলাপে বসে সমস্যার সমাধান করে দ্রুত নির্বাচন নেওয়া জরুরি।আমাদের সময়.কম