সংসদে অর্থ বিল-২০১৭ পাস

24

যুগবার্তা ডেস্কঃ প্রস্তাবিত নতুন ভ্যাট আইন প্রত্যাহার ও ব্যাংক আমানতের উপর বিদ্যমান আবগারি শুল্ক প্রত্যাহার, চালের উপর আমদানি শুল্কসহ বেশ সুবিধা দিয়ে অর্থ বিল-২০১৭ পাস হয়েছে। আজ বুধবার রাতে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এ সময় মন্ত্রী বহুল বিতর্কিত ভ্যাট আইন প্রত্যাহার এবং ব্যাংক আমানতের এক লাখ টাকা পর্যন্ত শুল্ক মওকুফ করে ৫ লাখ টাকার ওপর আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক পুনর্বিন্যাস করেন।

এর আগে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তৃতা করেন অর্থমন্ত্রী। এই আলোচনায় তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকটি প্রস্তাব করেছেন। তার এই প্রস্তাবকে আমি অনুশাসন মনে করে তার সব প্রস্তাবই প্রহণ করছি।

এরপর অর্থমন্ত্রী অর্থ বিল উত্থাপন করলে তার বিরোধীতা এবং বিলের ওপর সংশোধনী প্রস্তাব করেন বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য। অবশ্য কণ্ঠভোটে তাঁদের প্রস্তাব ও সংশোধনীগুলো নাকচ হয়ে যায়। তবে সরকারি দলের দুই হুইপ শহীদুজ্জামান সরকার ও মোহাম্মদ শাহাব উদ্দীনের আনীত কয়েকটি সংশোধনী এবং জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমামের দুটি প্রস্তাব গ্রহণ করেন অর্থমন্ত্রী। পরে সংশোধিত আকারে অর্থ বিলটি পাস হয়।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেতা রওশান এরশাদসহ অধিকাংশ সংসদ সদস্য সংসদে উপস্থিত ছিলেন।

বিল পাসের সময় অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত বাজেটকে আবারো তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম বাজেট উল্লেখ করে বলেন, ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থকে তুচ্ছ করে দেশের বৃহত্তর কল্যাণে ত্যাগ স্বীকার না করে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর কোন দেশই উন্নত বিশ্বের কাতারে সামিল হতে পারেনি। দেশকে উন্নত করতে হলে আমাদেরও একই ভাবে ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির উর্ধ্বে ওঠে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গঠনের মাধ্যমে জাতির জনকের স্বপ্ন পূরণে আত্মনিয়োগ করতে হবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে আমরা একটি সমৃদ্ধ, উন্নত, সুখী ও শান্তিময় বাংলাদেশ বিনির্মাণে সফল হবোই হবো।

প্রস্তাবিত বাজেটের শুল্ক প্রত্যাহার ও পুনবিন্যাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনকে একটি সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম হিসেবে আমরা বিবেচনা করব এবং ধ্যান অথবা যোগ (মেডিটেশন) এর উপরে আগামী ২ বছরে কোন ভ্যাট আরোপ হবে না। কম্পিউটার, সেলুলার ফোন এবং তার যন্ত্রাংশ এখন দেশে তৈরি হচ্ছে। এগুলোকে মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি প্রজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্ত করে তাদেরকে মূসক অব্যাহতি প্রদান করা হবে। শিপ ব্রেকার্স এন্ড রিসাইকেল এসোসিয়েশন বাংলাদেশের বিষয়ে বর্তমানে বলবৎ প্রজ্ঞাপনই বহাল থাকবে। তবে মোটরসাইকেল শিল্পের উপর স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে আরোপনীয় সমুদয় মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করেন।

এছাড়া মাইক্রোসফট বাংলাদেশ লিমিটেড অনেক সফটওয়্যার আমদানি করে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রদান করে এবং কতিপয় পণ্য বিনা আমদানি শুল্কে আমদানি করে। যেসব পণ্যে আমদানি শুল্ক নেই সেগুলোর উপরে প্রস্তাবিত ভ্যাট অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। রেফ্রিজারেটর উৎপাদনের ওপর আরোপিত শুল্ক বা কর হার অবনমিত করে সংযোজনকারীদের ওপর প্রযোজ্য ৩০ শতাংশের স্থলে ২০ শতাংশ হারে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। প্লাস্টিক ও গ্লাস ফাইবার নির্মিত এলপিজি কন্টেইনারের উপর আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট আরোপ না করার প্রস্তাব করা হয়। এলপিজি সিলিন্ডার এখনো ব্যাপকভাবে আমদানি নির্ভর। তাই স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষায় আমদানি পর্যায়ে লৌহ নির্মিত এলপিজি কন্টেইনারের উপর ভ্যাট বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, মোটরসাইকেলের সব যন্ত্রপাতি উৎপাদনকে সাহায্য করার জন্য গত বছরের অর্থ বিলে প্রগ্রেসিভ উৎপাদনকে কিছু কর/শুল্কের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। এবারে তাদের অগ্রগতি লক্ষণীয় না হওয়ায় সেটি বাদ দেওয়া হয়। তবে তারা জানিয়েছেন, অতি সত্বরই তারা উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করবেন এবং সেই বিবেচনায় এর উপর বর্ধিত শুল্ক করাদি মওকুফ করার প্রস্তাব করেন।

তিনি বলেন, জাপান দূতাবাস এবং নিটোল নিলয় কম্পানি আমাদের জানিয়েছেন, অদূর ভবিষ্যতে হোন্ডা এবং অন্যান্য কম্পানি মোটরসাইকেল এবং মোটর গাড়ির উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করবে। সেই বিবেচনায় এজন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের উপর আমদানি পর্যায়ে হ্রাসকৃত হারে শুল্ক-কর আরোপ করার প্রস্তাব করেছেন। দেশে সোলার প্যানেল তৈরি হওয়ায় অধিকহারে সোলার প্যানেলের উপর যে আমদানি শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল সেটি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে উৎসে কর ১ শতাংশ বহাল থাকবে। তবে সবুজ কারখানার ক্ষেত্রে আয়কর হার ১০ শতাংশ এবং অন্যদের ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে গুড়া মসলা জাতীয় মরিচ, হলুদ, ধনিয়া এগুলোর ট্যারিফ মূল্য বহাল রেখে ভ্যাটের হার নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ভ্যাট প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সংসদ সদস্যগণ এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রেক্ষিতে আমি মূসক আইনের পূর্ণ কার্যকারিতা পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করছি। আগের ধারাবাহিকতায় কিছু সংশোধন করে ২০১২ সালের আইনই যেভাবে গত চার বছর ধরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হচ্ছে ঠিক তেমনিভাবে বর্তমান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ব্যাংক আমানতের উপর আবগারী শুল্ক তিন স্তরে আরোপ করা হয়েছে। এগুলো হলো- ১ লাখ টাকা পর্যন্ত শূন্য, এক লাখ এক টাকা থেকে থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ১৫০ টাকা। পাঁচ লাখ এক টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ৫০০ টাকা, ১০ লাখ এক টাকা থেকে থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ২ হাজার ৫০০ টাকা, ১ কোটি এক টাকা থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ১২ হাজার টাকা এবং ৫ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে ২৫ হাজার টাকা।

বাজেটের ওপর আলোচনা-সমালোচনা প্রসঙ্গে আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন, বাজেট উপস্থাপনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সব দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় দু’ চারটি শুল্ক বা কর হারে বৃদ্ধির প্রস্তাবাবলীর ওপর। ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবের উপর শুল্ক বৃদ্ধি ছিল একটি বিতর্কের বিষয়। অনেক সংসদ সদস্য এবং গণমাধ্যম ভুলেই গিয়েছিলেন যে এই শুল্কটি ২০০২ সাল থেকে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ বলেছেন, এই বাজেটটি একটি শ্রেষ্ঠ তামাশা। মূল্য সংযোজন কর নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। এই আইন এদেশে প্রবর্তিত হয় ১৯৯১ সালে। সেটা পুরোপুরি সংশোধন করে একটি খসড়া ২০০৮ সালেই প্রস্তুত হয়। আমরা এই আইন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা, ডায়ালগ, বিতর্ক ইত্যাদি অনুষ্ঠান করে ২০১২ সালে আইনটি পাস করি। তবে বলে দিই, এটি কার্যকরি হবে ২০১৬ সালে। ২০১৬ সালে এর কার্যকারিতা আরো এক বছর পিছিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু তাতেও মনে হয় করদাতাদের আমরা সন্তুস্ট করতে পারিনি।

তিনি বলেন, এবারের বাজেট ঘোষণার পর দেশের সর্বস্তরে এর পক্ষে-বিপক্ষে যেভাবে আলোচনা পর্যালোচনা হয়েছে তা আমার কাছে ইতিবাচক মনে হয়েছে। আমাদের সরকার জনগণের সরকার। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর জনগণের মতামত সঠিক পথে চলার নির্দেশনা দেয়।

বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমরা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি ৭.৪ শতাংশ। এটি অর্জনের বিষয়ে কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেছেন। ২০১৫-১৬ সালে আমাদের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭.০৫ শতাংশ। এর বিপরীতে আমরা ৭.১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিলাম। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমাদের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭.২ শতাংশ। এর বিপরীতে বিবিএস এর সাময়িক হিসাবে আমাদের প্রবৃদ্ধি এসেছে ৭.২৪ শতাংশ। তার মানে হচ্ছে, আমরা বিগত ২ বছর যাবত্ আমাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছি। এ ধারা সামনের দিনগুলোতে অব্যাহত থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমাদের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তির অন্তর্ভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সমূহের সাম্প্রতিক ইতিবাচক পরিবর্তন আমার এই দাবির স্বপক্ষেই সাক্ষ্য দিচ্ছে।

খাত ভিত্তিক প্রবৃদ্ধি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের এপ্রিল নাগাদ আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১.৭ শতাংশ এবং একই অর্থবছরের মে নাগাদ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল মাসে ব্যক্তিখাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬.২১ শতাংশ, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৫.৫৯ শতাংশ। প্রবাস আয়প্রবাহ নিয়ে আমরা কিছুটা উদ্বেগের মধ্যে ছিলাম। তবে প্রবাস আয় প্রবাহ সম্প্রতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের মে মাসে আমাদের প্রবাস আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৪.৩৮ শতাংশ, যা বিগত অর্থবছরে একই সময়ে ৮.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত (মে,২০১৭) তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে মোট ৮ লাখ ৩৭ হাজার প্রবাস নিয়োগ হয়েছে, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৬ লাখ ২২ হাজার। আশা করি প্রবাস আয়কে ঘিরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির অনিশ্চয়তা অচিরেই দূর হবে।

তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি নির্দেশক অন্যান্য চলকগুলোর মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উৎপাদন সূচক বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষভাবে ম্যানুফেকচারিং ও মাইনিং খাতের উৎপাদন সূচক চলতি অর্থবছরে ডিসেম্বর নাগাদ ৭.৪১ শতাংশ ও ২.৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাংক ব্যবস্থায় সুদের হার ও হার ব্যবধান অব্যাহতভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এতে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়বে। আবার চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে নীট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০.৭ শতাংশ। মূলত দীর্ঘদিন যাবৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকা, নীতি কৌশলগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা ও এগুলোর সুসমন্বিত প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অব্যাহত সরকারি উদ্যোগের সারণেই ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির পথকে প্রশস্ত করেছে। এছাড়া চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে এডিপি বাস্তয়ন হয়েছে ৬৪.৭২ শতাংশ, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৬১.৮৫ শতাংশ। এটি সরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সহায়ক মুদ্রানীতির অনুসরণের কারণে দীর্ঘদিন যাবৎ দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রয়েছে। এটি টেকসই উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য একটি আবশ্যকীয় পূর্বশর্ত। আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপির ৭.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির অর্জনে আমরা মোট বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি জিডিপির ৩১.৯ শতাংশ। এসব বিষয় বিবেচনায়, আমার বিশ্বাস আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমাদের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আমরা অর্জন করতে সক্ষম হব।

কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধির বিষয়ে আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন, আমাদের উচ্চ প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে না মর্মে অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ত্রৈমাসিক শ্রমজরিপ ২০১৫-১৬ প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের বেকারত্বের হার ২০১৩ সালের ৪.৩ শতাংশ হতে ২০১৫-১৬ সালের শেষ প্রান্তিকে ৪.০ শতাংশে নেমে এসেছে। কর্মসংস্থান সঞ্চারি প্রবৃদ্ধি না হলে বেকারত্বের হার কমা সম্ভব হতো না।

বিনিয়োগ বৃদ্ধি প্রবৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে সচল রাখার বিষয়ে আমরা বরাবরের মত এ বাজেটে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছি। আমরা পর্যায়ক্রমে শিল্প স্থাপনের বাধাসমূহ দূরীকরণে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এসব পদক্ষেপের মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, পিপিপি’র দক্ষ ও গতিশীল আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি, বেসরকারি বিনিয়োগ অর্থায়নে ফাণ্ড স্থাপন, বিদেশি বিনিয়োগে বাধা অপসারণে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ওয়ান স্টপ সার্ভিসসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসব চলমান উদ্যোগসমূহ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের উন্নয়ন আকাঙ্খা পূরণে কাঙ্খিত অগ্রগতি সাধিত হবে।

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মূলত ব্যাংক ব্যবস্থায় সুদের হার কমার কারণে সঞ্চয়পত্রের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সঞ্চয়পত্র হতে অধিক ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছে। ফলে সুদ বাবদ ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে যা সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনার ওপর একটি বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। আমি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই, জাতীয় সঞ্চয়পত্রের সুদের হার নির্ধারণের কারণে কোন পেনশনভোগী, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত কেউ যাতে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়টি আমাদের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।

তিনি বলেন, অনন্তকালের জন্য সঞ্চয়পত্রের সুদের হার নির্দিষ্ট থাকতে পারে না। সুদের হারের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে, মূল্যস্ফীতি বাড়লে সুদের হার বাড়ে আর মূল্যস্ফীতি কমলে সুদের হার কমে। বিষয়টি তাই আমাদের পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তবে, আমরা চাচ্ছি সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে যে সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে তা যেন সঠিক ব্যক্তিরা পায়। এজন্য আমরা এর একটি পুর্ণাঙ্গ তথ্য-ভান্ডার তৈরি করব যেখানে ক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সাথে সঞ্চয়পত্রের তথ্যকে সম্পৃক্ত করা হবে। পাশাপাশি, পেনশন সুবিধা সর্বসত্মরের জনগণের জন্য বিস্তৃত করতে চাই।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে। সক্ষমতা বিবেচনায় বাজেটটি হয়েছে অতি উচ্চাভিলাষী-এরূপ মতামতও ব্যক্ত করা হয়েছে। এছাড়া রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বিষয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছেন। আমি এসব আলোচনা-সমালোচনাকে সবসময়ই স্বাগত জানাই। আমাদের বাজেট কিছুটা উচ্চাভিলাষী হবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে, বিগত ২০০৮-০৯ অর্থবছর হতে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত প্রত্যেকটি বাজেটের বাস্তবায়ন রেকর্ড প্রমাণ করে বাজেট উচ্চাভিলাসী কিন্তু কল্পনাবিলাসী নয়। এই সময়ে প্রাক্কলিত বাজেটের তুলনায় গড় বাস্তবায়নের বার্ষিক হার হয়েছে ৮৮.৮ শতাংশ।

রাষ্ট্রায়াত্ত্ব ব্যাংক সমূহের মূলধন পুনর্ভরণ নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার দেশের বৃহত্তম কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিক। এ ব্যাংকগুলোর কোন কোনটিতে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে এবং সে সব বিষয়ে মামলা-মোকদ্দমা হয়েছে। অনেক শীর্ষ স্থানীয় ব্যাংক কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হয়েছে এবং বিচারাধীন আছে, যা এর আগে কখনো হয়নি। দায়ী ব্যক্তিদের বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বেসিক ব্যাংকের নতুন পর্ষদ গঠনের পর ব্যাংকটির শ্রেণীকৃত ঋণ অনেক কমেছে। সবোর্চ্চ ৬৭ শতাংশ শ্রেণীকৃত ঋণ কমে বর্তমানে ৫২ শতাংশ ভাগে নেমে এসেছে। একটানা ০৫ বছর লোকসান দেওয়ার পর ২০১৬ সন শেষে ব্যাংকটির পরিচালন মূনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৫ সালে বেসিক ব্যাংক ২৫৬.৪২ কোটি টাকা পরিচালন ক্ষতির সম্মুখীন হলেও ২০১৬ সালে তা ৯.০৮ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে। তাই মূলধন সরবরাহ না করা হলে ব্যাংকটি বন্ধ করে দেয়ার মত পরিস্থিতির উদ্ভব হতো। এর ফলে ব্যাংকটির আমানতকারী, ঋণ গ্রহীতা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ দেশের ব্যাংকিং খাতে নেতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি হতো।

রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা উচ্চতর প্রবৃদ্ধি নিয়ে উন্নয়নের মহাসড়কে যাত্রা করতে চাই। আমরা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে বাজেট পরিচালনায় যাবতীয় কর্মকাণ্ড নির্ধারণ করেছি। ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ উন্নত দেশে উন্নীত হতে হলে আমাদের বিপুল সরকারি বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। সেজন্য যৌক্তিক কর সংগ্রহ অপরিহার্য। আমাদের কর জিডিপির অনুপাত উন্নয়নশীল দেশের সর্বনিম্নের একটি। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সাথে আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ জড়িত। যার উপর নির্ভর করে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হব এবং উন্নত দেশ হব।-কালেরকন্ঠ