সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রাখা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থি : সুব্রত চৌধুরী

140

যুগবার্তা ডেস্কঃ রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায়। ১৯৮৮ সালের ৫ জুনে যে অষ্টম সংশোধনী পাশ করা হয়, তাতেই রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ঐ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সে সময়েই, অর্থাৎ জুন মাসেই সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেনসহ ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক হাইকোর্টে রিট করেন। দীর্ঘ ২৩ বছর যাবৎ আবেদনটি হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে রিটকারী ১৫ বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে ১০ জন মারাও গেছেন। তখন রিটের আবেদনকারীদের আইনজীবী ছিলেন সুব্রত চৌধুরী। বর্তমানেও রিটকারীদের আইনজীবী হিসেবে লড়ছেন সুপ্রিম কোর্টের সেই সিনিয়র আইনজীবী। ডয়চে ভেলের সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতায় উঠে এসেছে কোন প্রেক্ষিতে তাঁরা রিটটি করেছিলেন, সেই কথা। এই আইনজীবীর মতে, ‘‘সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম রাখা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি’।’’ কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আমলে পঞ্চদশ সংশোধনীতেও রয়ে গেছে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম।
প্রশ্ন: কোন প্রেক্ষিতে আপনারা রিটটি করেছিলেন?
সুব্রত চৌধুরী: ১৯৮৮ সালে জেনারেল এরশাদ যখন সংবিধানে আর্টিকেল ২(এ) সংযোজন করে রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে আসেন, তখন আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করেছিল। এমনকি তারা একদিন হরতালও ডেকেছিল। তারা বলেছিল, কোনোদিন যদি তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে পারে তাহলে এরশাদের এ সব কাজকে অবৈধ ঘোষণা করা হবে এবং আর্টিকেল ২(এ)-টিও বাতিল করা হবে। এমনটা তখন সকলেরই অঙ্গীকার ছিল। তারপরও সে সময়কার ১৫ জন বুদ্ধিজীবী মিলে একটি রিট আবেদন করেন, ১৯৮৮ সালের জুন মাসে। তখন অষ্টম সংশোধনীতে দু’টি অংশ ছিল। একটা হলো, হাইকোর্টকে পাঁচটি শহরে নিয়ে যাওয়া। সেটার একটা রিট হয়। আর অন্য রিটটা হয় এই রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে। তখনকার সিনিয়র আইনজীবীরা বলেছিলেন, আগে হাইকোর্টের রিটটা ধরি, তারপর রাষ্ট্রধর্ম রিটটা ধরব।
হাইকোর্ট নিয়ে যে রিটটা হলো, সেটা আপিল বিভাগ পর্যন্ত গেল এবং বাতিল হয়ে গেল। আর রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে যে রিটটা হলো, সেটা করেছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন, সুফিয়া কামাল, কে এম সোবহান, বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্রাচার্য, কলিম শরাফী, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদসহ ১৫ জন। এঁদের মধ্যে ১০ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ আর মাত্র পাঁচজন এখন জীবিত আছেন। সে সময় আইনজীবীরা বলেছিলেন, ‘এই মামলাটার জন্য আরো কিছুদিন সময় নেই, দেখি আস্তে-ধীরে কী করা যায়।’ আমি ঐ রিটের ফাইলিং ল’ইয়ার ছিলাম। ফয়েজ আহমেদ সকলের পক্ষ থেকে এফিডেফিট করেছিলেন। এরপর ২০০৯ সালে আমরা মনে করলাম আর দেরী করা যাবে না। তাছাড়া সে সময়কার জজ সাহেবরা মামলাটা শুনতেও চাননি। তাঁরা বলেছেন, ‘এটা থাক, এটা থাক।’ ২০১১ সালে অষ্টম সংশোধনীর আর্টিকেল ২(এ) ওপর রুল ইস্যু হলো। প্রশ্ন উঠলো, এটা কেন বে আইনি এবং কেন এটা বাতিল ঘোষণা করা হবে না। এরপর পঞ্চদশ সংশোধনীতে আর্টিকেল ২(এ) আবারো সন্নিবেশিত করা হলো।
এরশাদের ওটা একটু মডিফাই করে আওয়ামী লীগ সরকার আবার এটা করল। এটার ওপর আবার সাপ্লিমেন্টারি রুল ইস্যু হলো। পঞ্চদশ সংশোধনীতে শুধু আর্টিকেল ২(এ) চ্যালেঞ্জ করা হলো। অর্থাৎ ১৯৮৮ সালের মামলাতে দু’টো রুল পেন্ডিং হয়ে গেল। এই দু’টি রুলই এ মুহূর্তে শুনানির জন্য একটি বৃহত্তর বেঞ্চে অপেক্ষাধীন আছে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তারপরও এই রিট চলে কি? কারণ আপিল বিভাগের রায়ের প্রেক্ষিতেই তো পঞ্চদশ সংশোধনী হয়েছিল?
না, না। আপিল বিভাগের রায় কিন্তু রাষ্ট্রধর্মের কোনো বৈধতা দেয়নি। পঞ্চম সংশোধনীর রায়ে জিয়াউর রহমান সাহেব যে কাজগুলো করেছেন, সংবিধানকে একটা সাম্প্রদায়িক আবহে এনেছেন, সেটাকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করেছে আদালত। যে কারণে পঞ্চদশ সংশোধনীতে আমাদের চার মূলনীতি আবারো বহাল করলাম। আর্টিকেল টুয়েলভে বলা আছে, রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা দেবে না। ধর্মের ভিত্তিতে কারো প্রতি বৈষম্য হবে না। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ছিল যে আমাদের চারটি জাতীয় মূলনীতি আমরা পুনর্বহাল করলাম। সেখানে আর্টিকেল ২(এ) পুনর্বহালর আর তো কোনো সুযোগ নেই। এটা সম্পূর্ণ কন্ট্রাডিকটরি এবং রায়ের খেলাপ। পঞ্চম সংশোধনীর রায়ে এমনভাবে বলা হয়েছে যে, সেখানে কোনো ধরনের ধর্মীয় আবহ রাখার কোনো সুযোগ ছিল না।
পঞ্চাদশ সংশোধনী যখন উচ্চ আদালতের রায়ের প্রেক্ষিতে হয়, তখন সরকার একটি কমিটি করেছিল। ঐ কমিটি বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। তখন এই বিষয়টা আপনারা তোলেননি কেন?
হ্যাঁ, অবশ্যই আমরা তুলেছি। কামাল হোসেন, আমিরুল ইসলাম ও মাহমুদুল ইসলাম সাহেব তখন আইনজীবীদের পক্ষ থেকে ঐ কমিটিতে গিয়েছিলেন। সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত সেই কমিটি তো তখন একমতই হলো যে, রাষ্ট্রধর্ম রাখা যাবে না। এই যে মামলাটা পেন্ডিং আছে, সেটাও তাদের বলা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন কমিটি তো রাষ্ট্রধর্ম না রাখার পক্ষেই বক্তব্য দিয়েছে। এটা তো সিদ্ধান্তেই আছে। কিন্তু কিভাবে যেন অনেক কিছুই বদলে গেল।
স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটির এ ধরনের রিট আবেদন করার এখতিয়ার কি আছে?
অবশ্যই আছে। কারণ তারা সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। শুধু সংগঠন হিসেবে নয়, তারা ব্যক্তি হিসেবেও ১৫ জন আবেদন করেছেন। ১৯৭২-এর মূল চেতনায় ফিরে যাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। রাষ্ট্রধর্ম থাকলে সংবিধানের মূল চেতনা ধ্বংস করে দেয়। আদর্শ, মূল্যবোধ আর থাকে না।
সরকার বলছে, তারা ৭২-এর সংবিধানে ফিরে গেছে। কিন্তু সেই সংবিধানে তো রাষ্ট্রধর্ম ছিল না। পঞ্চদশ সংশোধনীতে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে ৭২-এ ফিরে যাওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, তা কতটা যৌক্তিক?
এটা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি মনে করি, এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি’, আদর্শের পরিপন্থি বক্তব্য দিচ্ছে সরকার। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাষ্ট্রে তো বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বাস করে। সেখানে সংবিধানে কোনো ধর্মের অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন আছে কি?
আমরা যে বাংলাদেশ চেয়েছিলাম এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে বাংলাদেশ সৃষ্টি হলো- সকল শহিদদের স্বপ্ন, যে সকল মুক্তিযোদ্ধা, মানে যারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তারা তো সকলে বলবেই যে, আমরা সেই চেতনা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করিনি। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, পাকিস্তানে এটা এসেছে জেনারেল জিয়াউল হকের সময়। আর বাংলাদেশে এটা নিয়ে আসল আরেকজন জেনারেল, একেবারে হুবহু, আর্টিকেল ২(এ)-তে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার এটা বহাল রাখবে, সেটা ১৬ কোটি মানুষের আশা-আকাক্সখার একেবারেই পরিপন্থি। আপনি কিভাবে এই মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন?
১৯৮৮ সালে ঐ যে ১৫ জন শীর্ষ বুদ্ধিজীবী মামলাটা করল, আমার সৌভাগ্য হয়েছিল এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার। যখন পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হলো, তখন অনেক বেশি উৎসাহিত হলাম। আমার মনে হয়, পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হওয়ায় আমরা যা অর্জন করলাম, তা পরিপূর্ণ করতে হলে সংবিধানে কোনোভাবেই রাষ্ট্রধর্ম রাখা যাবে না।আমাদের সময়.কম