গুলশানে জিম্মি উদ্ধারে কমান্ড অভিযান সমাপ্ত, নিহত ৫ জনের মৃতদেহ দেখা যায়; ভীতরে আরও জবাই করা লাশ রয়েছে

226

যুগবার্তা ডেস্কঃ রাজধানী গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জিম্মি উদ্ধারের কমান্ড অভিযান শেষ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, শনিবার সাড়ে সাতটার পর অভিযান শুরুর ৪৫ মিনিটের মধ্যে পুরো পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ ঘটনাস্থলে বলেন, ভেতরে পাঁচজন মারা গেছে। তবে তারা জিম্মি না হামলাকারী সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ১২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত ও উদ্ধার করা ব্যক্তিদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে সেখানে ঠিক কতজন আটকা পড়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে কতজন জীবিত উদ্ধার হয়েছেন- তা এখনও স্পষ্ট হয়নি। শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে একদল অস্ত্রধারী গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালালে অবস্থানরত অজ্ঞাত সংখ্যক অতিথি সেখানে আটকা পড়েন। সকালে সামরিক বাহিনীর কমান্ডো দল উদ্ধার অভিযান শুরু করলে ঘণ্টাখানেক ব্যাপক গোলাগুলি চলে। প্যারা কমান্ডোদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান অংশ নেয় অভিযানে। আধা ঘণ্টায় সহস্রাধিক রাউন্ড গুলির পাশাপাশি শ’ খানেক বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। কূটনৈতিক পাড়ায় হলি আর্টিজান বেকারি নামের ওই ক্যাফে থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরের এক বাড়ির বাসিন্দা জানান, তিনি পাশের প্রায় খালি একটি ভবন থেকে টেলিস্কোপ লাগানো স্নাইপার রাইফেল দিয়ে গুলি ছুড়তে দেখতে পান। গুলি ছোড়া হয় সাঁজোয়া যান থেকেও। পরে সেনা সাঁজোয়া যান হলি বেকারির দেয়াল ভেঙে ভেতরে ঢোকে। ওই কম্পাউন্ডের বাইরের দিকে থাকা পিজা কর্নার এ সময় গুঁড়িয়ে যায়। যে সড়কে ওই বেকারি, সেই ৭৯ নম্বর সড়কের মোড় থেকে প্রতিবেদক বলেন, ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ফায়ার এক্সটিংগুইশার নিয়ে তিনি ওই ভবনের দিকে যেতে দেখেন। কিছু সময় পর একদল চিকিৎসকও স্ট্রেচার নিয়ে ওই ক্যাফের ভেতরে যান। অন্তত একজন বিদেশি নাগরিক সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেলেও পুলিশ কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী, শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে একদল অস্ত্রধারী গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালালে অবস্থানরত অজ্ঞাত সংখ্যক অতিথি সেখানে আটকা পড়েন। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে নিহত হন বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন ও গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম। রাতে হামলার পরপরই ক্যাফে থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন এমন একজন কর্মী বলেছিলেন, অন্তত ২০ জন সেখানে ছিলেন তখন, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিদেশি। তবে গণমাধ্যমে আসা তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা আরও বেশি। এদিকে অভিযান শুরুর আগে আইএসের (ইসলামিক স্টেট) কথিত বার্তা সংস্থা আমাক নিউজ ওই রেস্তোরাঁর ভেতরে তাদের হাতে নিহত কয়েকজনের রক্তাক্ত ছবি প্রকাশ করে। আমাক নিউজের সেসব ছবি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ টুইটারে প্রকাশ করে অভিযান শুরুর প্রায় আধা ঘণ্টা আগে। সকালে দিনের আলোতে অভিযান: শুক্রবার রাত পেরিয়ে যাওয়ার পর আজ শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার পর এই অভিযান শুরু হয়। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া যায় ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ। শুরুতেই সেনা সদস্যরা নারী ও শিশুসহ পাঁচজনকে উদ্ধার করে নিরাপদে সরিয়ে নেয়। সাড়ে ৭টার পরপর সোয়াতের একটি দল একটি অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে ওই রেস্তোরাঁ দিকে এগোতে থাকে। এর পর পর কয়েক দিক থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সমন্বিত অভিযান শুরু করে। শনিবার সকাল ৭টা ২০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর বড় পাঁচটি ট্রাক, ছোট জিপ ১০টি, নয়টি ট্যাংকের মতো দেখতে সাজোয়া যানসহ বিশাল বহর আসে। এদিকে সেনাবাহিনী আসার কিছুক্ষণ পরই অর্থাৎ সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে মূল অভিযান শুরু করা হয়। সেনা সদস্যদের সঙ্গে অভিযানে অংশ নেয় নৌবাহিনীর কমান্ডো, বিজিবি, পুলিশ ও র‍্যাবের বিশেষ বাহিনী। অভিযান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রেস্টুরেন্টের ভেতর থেকে অস্ত্রধারীরা গুলি ছুঁড়ে। এসময় পাল্টা গুলি চালায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। তবে জিম্মিদের জীবিত উদ্ধারে সতর্ক অবস্থানে থাকে তারা। অন্যদিকে আকাশেও হেলিকপ্টর দিয়ে টহল দেয়। অস্ত্রধারীরা যাতে রেস্টুরেন্টের পাশে থাকা লেক দিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে, সে জন্য নৌ বাহিনীর একটি কমান্ডো টিম মোতায়েন করা হয়। সাথে থাকে ফায়ার সার্ভিসের টিমও। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন সেনাবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু বেলাল মো. শফিউল হক। সেই সঙ্গে আছেন বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান। শনিবার সকাল ৬টার দিকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি সেখানে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। সকাল সাতটায় সাতটি সাঁজোয়া যানসহ সেনাবাহিনীর একটি দল ওই এলাকায় অবস্থান নেয়। ঘটনার শুরু: এর আগে শুক্রবার রাত পৌনে নয়টার দিকে গুলশানের ৭৯ নম্বরের আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ৮ থেকে ১০ জন যুবক অতর্কিত হামলা চালায়। এরপর তারা ওই রেস্তোরাঁয় থাকা লোকজনকে জিম্মি করে। জিম্মিদের মধ্যে অন্তত ২০ জন বিদেশি নাগরিকসহ ৩০-৩৫ জন আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর থেকে পুরো চার কিলোমিটার এলাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘিরে রাখে। আর্টিজান বেকারি নামের ওই রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার কিছুক্ষণ পর পুলিশের অগ্রগামী দলের দুই কর্মকর্তা জঙ্গিদের গুলি ও বোমায় নিহত হন। আহত হন অন্তত ৪০ জন পুলিশ সদস্য। নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তা হলেন, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিন। গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতাল সূত্র জানায়, ওই হাসপাতালে মোট ৩৬ জন আহত ব্যক্তিকে নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে দুজন মারা গেছেন। এখন ভর্তি আছেন ২৪ জন। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। জঙ্গি হামলা চালিয়ে দেশি-বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করার ঘটনায় দায় স্বীকার করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। এই ধরনের অতর্কিত হামলা চালিয়ে মানুষজনকে জিম্মি করার ঘটনা বাংলাদেশে এটাই প্রথম।