শিল্প শ্রমিকদের মজুরি কমলেও কৃষিতে বাড়ছে

7

ডেস্ক রিপোর্ট : সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার কৃষি শ্রমিক সৈয়দ উল্লাহ। প্রতি বছর গড়ে ৪৫০-৫০০ টাকা মজুরিতে বোরো মৌসুমের ধান কাটেন তিনি। গত বছর করোনা মহামারী শুরুর পর তার এলাকায় অনেক সাধারণ মানুষ ধান কেটে দেয়। আবার জমি মালিকদের পরিজনকেও ধান কাটতে দেখা যায়। এতে গত বোরো মৌসুমে সৈয়দ উল্লাহর মতো কৃষি শ্রমিকদের মজুরি কমে ২৫০-৩০০ টাকায় দাঁড়ায়। চলতি বোরো মৌসুমে মজুরির কিছুটা উন্নতি হলেও তা আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি। এবার বোরো ধান কাটার জন্য তারা ৪০০ টাকা করে মজুরি পেয়েছেন।

গত বছর লকডাউন ঘোষণার পর থেকে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়েছে দেশের কৃষি ও শিল্প খাত। কভিড-১৯-এর কারণে শিল্প খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। বেকার হয়ে পড়েন লাখ লাখ শ্রমিক। তারা মূলত শহর থেকে চাকরি হারিয়ে বা নিরাপত্তাজনিত কারণে গ্রামে ফিরে যান। এতে শহরে শিল্প মজুর কমে গেলেও গ্রামে বেড়ে যায় কৃষি মজুরের সংখ্যা। আবার গ্রামাঞ্চলে ধান কাটার জন্য যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি, করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেক স্থানে বিভিন্ন পেশাজীবীও বিনা মূল্যে কৃষকের ধান কেটে দেয়ার ফলে গ্রামে কৃষি শ্রমিকের উদ্বৃত্ত সরবরাহ দেখা দেয়, যারা কমিয়ে দেন কৃষি মজুরি।

তবে আশার কথা হলো কৃষি খাতের কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। পরপর দুটি মৌসুমে শস্য খাতে উৎপাদন বেড়েছে। এতে কৃষি খাতে আগের চেয়ে বেশি শ্রমিক নিয়োজিত হয়েছেন। তাছাড়া গ্রামে যাওয়া শ্রমিকরা আবার শহরে ফিরতে শুরু করেছেন। এ অবস্থায় দ্রুত হারে কৃষিতে মজুরি বাড়ছে, যার প্রভাব পড়েছে সার্বিক মজুরি হারে।

কয়েক বছর ধরেই দেশে সাধারণ মজুরি হারের বৃদ্ধি (পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে) ছিল সাড়ে ৬ শতাংশ। তবে কভিড-১৯ শুরুর পর থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত তা ৬ শতাংশের নিচে নেমে আসে। এ সময়ে কৃষি মজুরি হার কিছুটা বাড়লেও নিম্নমুখী ছিল শিল্প মজুরি হার। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে কৃষি মজুরি বৃদ্ধি আগের অবস্থায় ফিরে এলেও শিল্প মজুরি সাড়ে ৫ শতাংশের ঘরেই আটকে রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত গত ১৫ মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছর লকডাউনের পরই কমতে থাকে সাধারণ, কৃষি ও শিল্প মজুরি হারের প্রবৃদ্ধি। গত বছরের জানুয়ারিতে কৃষি মজুরি হার পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ছিল ৬ দশমিক ৬৭ ও শিল্প মজুরি হার ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। গত জুলাইয়ে তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে আসে। সে মাসে কৃষি মজুরি হার ৬ দশমিক ১৭ ও শিল্প মজুরি হার ৫ দশমিক ১৮ শতাংশে নামে।

নয় মাসের ব্যবধানে কৃষি মজুরি ফিরেছে স্বাভাবিক অবস্থায়। তবে এখনো পিছিয়ে রয়েছে শিল্প মজুরি হারের প্রবৃদ্ধি। চলতি বছরের এপ্রিলে কৃষি মজুরি হার ছিল ৬ দশমিক ৬৭ ও শিল্প মজুরি ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ।

সম্প্রতি অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। শিল্প-কারখানাগুলো চালু হতে শুরু করেছে। ফলে আবারো নিয়োগ পাচ্ছেন শিল্প শ্রমিকরা। তবে এখনো অনেক শ্রমিক আগের মতো বেতন বা মজুরি পাচ্ছেন না। কমিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের অনেক সুযোগ-সুবিধা। ফলে শিল্পের মজুরি কৃষির মতো দ্রুত হারে বাড়ছে না।

করোনাকালে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের কয়েকটি কারখানা উৎপাদন স্থগিত রাখায় অস্থায়ী শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েন। অন্যদিকে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) সব কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কারখানায় সরাসরি ৫০ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করতেন। সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও এ খাতে সহায়ক শিল্প হিসেবে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ছিল। এখন এসব শ্রমিকের অনেকেই কাজ ফিরে পাননি বা অন্য কোথাও কম মজুরিতে কাজ করছেন। ফলে এটিও সার্বিক শিল্প খাতের মজুরির ওপর প্রভাব ফেলেছে।

এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির সঙ্গে মজুরি হার বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। আমরা দেখেছি, লকডাউন বা সাধারণ বন্ধ ঘোষণার পরই অনেক শিল্প-কারখানা প্রায় বন্ধের পর্যায়ে চলে যায়। লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হন। ফলে শিল্প মজুরি কমে যায়। অন্যদিকে শিল্প খাতের কাজ হারানো মানুষ গ্রামে গিয়ে সেখানে শ্রমিকের সরবরাহ বাড়িয়ে দেন। ফলে কৃষি মজুরিও কমে যায়। তবে সম্প্রতি অর্থনীতির উত্থানের এ সময়ে শিল্প মজুরি কিছুটা বাড়ছে। যদিও সে হার এখনো মহামারীর আগের মতো হয়নি। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো শ্রমিকদের নিয়োগ দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মজুরি বা বেতন কমানোর পাশাপাশি নানা সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করেছে। এর সঙ্গে যদি আমরা মূল্যস্ফীতিকে বিবেচনায় নিই, তাহলে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় আরো কম দেখাবে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় ঋণাত্মক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গ্রামে শ্রমিক সংকট ও শহুরে শ্রমিকদের ফিরে আসার কারণে কৃষিতে দ্রুত হারে মজুরি পুনরুদ্ধার হবে। তবে সেটিও স্বাভাবিক অবস্থায় যেতে বেশ সময় লাগবে।

বিবিএসের তথ্যমতে, দেশে প্রায় ২ কোটি ৪২ লাখ মজুরি ও বেতনভোগী শ্রমিক রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ শ্রমিক দৈনিক বা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে মজুরি পান। বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। এ খাতের বড় একটি অংশই দৈনিক, চুক্তিভিত্তিক মজুরি ও নিয়োগপত্র ছাড়াই কাজ করেন।

বিবিএসের ‘রিপোর্ট অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, কৃষিতে এখন ২ কোটি ৪৩ লাখ ৯২ হাজার ৮৭৮ জন শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। এর মধ্যে ৮৭ লাখ ৬৫ হাজার ১০৭ জন বা প্রায় ৩৫ দশমিক ৯০ শতাংশই পারিবারিক সাহায্যকারী। স্বকর্মসংস্থান হয়েছে ৮১ লাখ ৭৭ হাজার ৩৭ জন বা প্রায় ৩৩ দশমিক ৫২ শতাংশের। আর কৃষি শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন ৭২ লাখ ৯১ হাজার ৮৪০ জন বা প্রায় ৩০ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্যভাবে নিয়োজিত রয়েছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার শ্রমিক। তবে সারা বছরই যেহেতু কিছু না কিছু কৃষিকাজ চলমান থাকে, তাই শিল্প শ্রমিকদের মতো এরা সবাই পুরোপুরি কর্মহীন হয়ে পড়েননি। –আমাদের সময়.কম