শিক্ষা কি শুধু শিক্ষাঙ্গণে বাস করে ?

।। আশিকুল কায়েস ।।
মনুষ্যত্ব বিকাশে আমরা যখন মূল্যবোধ চরম পর্যায়ে ঠেকে যায়, তখন প্রশ্ন এসে ভর করে তাহলে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় একজন শিক্ষার্থীর মনুষ্যত্ব সৃষ্টিতে কতটুকু ভূমিকা রেখেছে ? তখন শিক্ষাঙ্গণের শিক্ষাটা নৈতিকতা ও অনৈতিকতার মুখোমুখি হতে বাধ্য করে।
শিক্ষাঙ্গণে একজন শিশুর মনুষ্যত্ব গঠনে প্রথম পর্যায় হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশু মৌলিক চেতনা সম্পর্কে ধারণা পায়। কিভাবে মানুষকে সম্মান করতে হবে? কিভাবে তাদের সাথে চলতে হবে? আদব-কায়দা সম্পর্কে ধারণার মাধ্যমে চরিত্র গঠনে ব্যাপক উপযোগি করে তোলে এই প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা। আর এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন স্তর পার করে মনের মধ্যে তৈরি করে নেয় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বিষয়বস্তু। প্রাথমিক পর্যায়ে মূলবোধ গঠনে যদি একজন শিশু তার মানসিক চিন্তা-ভাবনায় নিজেকে ভুল শিক্ষার দিকেও ধাবিত করে, তাহলে আজীবন শিক্ষাঙ্গণ থেকে পাওয়া ভুল শিক্ষাটাই হবে তার কাছে মূল্যবোধমূলক শিক্ষা।
বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় এর কতটুকু যথোপযুক্ত শিক্ষা শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে আশা করা যায় ? পিএসসি পরীক্ষার নামে প্রাথমিক শিক্ষায় চলছে পড়ালেখার ব্যপক প্রতিযোগিতা। তাদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ডজনখানেক বই। অথচ মূল্যবোধ সৃষ্টির প্রথম পর্যায়ে, এই বয়সে এত্তগুলো বই সম্পর্কে ওরা বোঝে কি ? তাদের মধ্যে মূল্যবোধ সৃষ্টির গুণগুলো জোর করে চাপা দেওয়া হচ্ছে। মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বিষয়টি চর্চার বিপরীতে চর্চা করা হচ্ছে পাঠ্যপুস্তকের পড়া। প্রতিদিন ভোরবেলা দেখা মেলে বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা কাধে বইয়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে কোচিং এ যাচ্ছে। তবে মজার বিষয় এই হলো, বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার প্রস্তুতির পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে ওদের মা অভিভাবকেরাও। কারণ প্রতিযোগিতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের চেয়ে মায়েদের পড়ালেখার প্রস্তুতিই বেশি। প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক শিক্ষায় রূপান্তরিত করলেও সেটার ভার সহ্য করার মতো ক্ষমতা যে কোমলমতি শিশুদের নেই, একথা সরকারি উপরি মহলের কেউ ভাবে বলে মনে হয় না। ঐসকল মহলের চিন্তা শুধু কিভাবে শিক্ষাটাকে আপডেট করা যায়। শিক্ষার্থীদের সিস্টাচারিতা ও মূল্যবোধ তৈরিতে বর্তমান শিক্ষা কতটুকু যুগোপযোগি ভূমিকা পালন করছে পারিপার্শ্বিক অবস্থার দিকে নজর দিলেই সম্যক ধারনা পাওয়া যায়।
বর্তমানে প্রাথমিক স্কুলগুলোতে চলছে ম্যানেজিং কমিটির অনিয়ম । রাজনৈতিক দলগুলো বিস্তার ঘটাতে ঘটাতে ইউনিয়ন থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে ওয়ার্ড, এমনকি তৃণমূল পর্যায়ে রাজনীতিটা এমনভাবে প্রকট আকার ধারণ করেছে যে, তার প্রভাব থেকে প্রাথমিক স্কুলগুলোও বাদ যাচ্ছে না। ম্যানেজিং কমিটিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী অভিভাবকেরা লড়ছে রাস্তাতে আর তাদের ছেলে-মেয়েরা এরই ফল ভোগ করছে স্কুলেতে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে মনোদ্বন্দ্ব। বাড়ি থেকে শিখিয়ে দেওয়া হয় অমুকের ছেলে কিংবা মেয়ের সাথে মিশতে পারবে না। ছোটবেলা থেকেই বাবা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষাটা স্কুল থেকেই তার সহপাঠিকে দুশমনে পরিণত করে দিচ্ছে। আর এর ফল ভবিষ্যতে মনুষ্যত্ব বিকাশে খুববেশি সুখকর হবে সেটাও বলার অপেক্ষা রাখে না। অধিকাংশ স্কুলগুলোতেই ম্যানেজিং কমিটির সমস্যা সমাধান নিয়ে উপজেলা-জেলা কর্তা ব্যক্তিগণ রয়েছে মহাবিপাকে। সরকারি কারিকুলামের চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষা প্রদানের বিভিন্ন পদ্ধতি স্কুলে প্রয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে । আর ম্যানেজিং কমিটি গঠনে হানাহানি রেসারেসি ইত্যাদি থেকেও বর্বরতার শিক্ষা পাচ্ছে এই বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা। ফলে তাদের মূল্যবোধ সৃষ্টিতে জায়গা করে নিচ্ছে হিংসার বিষয়টি।
মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে দেখা যাচ্ছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন। শিক্ষাঙ্গণের দ্বিতীয় ধাপে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো থেকে তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বের বিষয়টি। এ পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থী নিজের সম্পর্কে কতটুকুইবা ধারণা নিতে পারে ? সবেমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হতে না হতেই ওদের নিতে হচ্ছে ছাত্র সংসদের মত নেতৃত্বের ভার। যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা একজন শিক্ষককে ভয় করার পরিবর্তে ভয় পেতে মূল্যবোধটি তৈরি করে দিচ্ছে স্কুলের একজন সহপাঠিকে।
নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা যে শুধু শিক্ষাঙ্গণেই পাওয়া যায় এটা বলা যাবে না। শিক্ষাঙ্গণ হচ্ছে মূল্যবোধ সৃষ্টির চর্চা কেন্দ্র। এই শিক্ষাঙ্গণে সঠিক ম্ল্যূবোধ পেতে দরকার শিক্ষকদের প্রতি উপর্যুপরি সমর্থন। পরিবেশ থেকে সৃষ্ট যেসকল অনৈতিকতা একজন শিশুকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, আজ সেই সমাজের অনৈতিক প্রভাব যদি কোন শিক্ষাঙ্গণে প্রবেশ করে তাহলে সেই শিক্ষাঙ্গণের প্রদত্ত নৈতিকতা একজন শিক্ষার্থীকে কখনও ভালো কিছু উপহার দিতে পারে না।
আ-লেখকঃ সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ লেখক পরিষদ।