শহীদ ধীরেন গাইনের স্ত্রী দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন

কল্যাণ কুমার চন্দ,বরিশালঃ বৃদ্ধ বয়সেও অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে পাকসেনাদের হাতে নির্মমভাবে নিহত শহীদ ধীরেন গাইনের স্ত্রী বিশকা রানী গাইনের (৬৫)। ভাঙ্গাচোরা একটি খুপড়ির মধ্যে কোনমতে বসবাস করছেন তিনি।
সূত্রমতে, জেলার গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর ইউনিয়নের হরহর গ্রামের বিশকা রানী স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে তার স্বামী ধীরেন গাইনকে হারিয়েছেন। আর বছর দুয়েক আগে মানসিক প্রতিবন্ধী একমাত্র পুত্র সুধীর গাইন বাড়িঘর ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। এ কারণে বিশকা রানী মানসিকভাবে অনেকটা ভেঙ্গে পরেছেন। বর্তমানে নানা রোগে ও শোকে কাতর বিশকা রানী গাইন পেটের দায়ে বৃদ্ধ বয়সেও অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে কোন একমতে জীবন যাপন করছেন। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে বাঁচার তাগিদে অসহায় বিশকা রানী প্রধানমন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্য সহ দেশের বিত্তবানদের সহযোগীতা কামনা করেছেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা বলতেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন বিশকা রানী। দেশ স্বাধীনের ৪৬ বছর পরেও স্বামীকে হারানোর ব্যাথা আজো মন থেকে মুছে ফেলতে পারেননি বিশকা। সেই ভয়াল দিনটির কথা আজও তাকে পীড়া দেয়। উপজেলার চন্দ্রহার গ্রামের মৃত অমর চাঁদ রায়ের কন্যা বিশকা রানী গাইন। স্বাধীনতা যুদ্ধের চার বছর আগে তার বিয়ে হয়েছিল পাশ্ববর্তী হরহর গ্রামের মৃত আদারী গাইনের পুত্র ধীরেন গাইনের সাথে। বিয়ের দেড় বছর পরে তার গর্ভে জন্ম নেয় পুত্র সন্তান সুধীর গাইন। বিশকা রানী জানান, ১৯৭১ সালের বাংলা ৩ রা জৈষ্ঠ্য পাকসেনাদের তাদের গ্রামে আসার খবর পেয়ে তিনিসহ তার স্বামী ও শিশুপুত্র সুধীরকে নিয়ে স্থানীয় মরার ভিটার জঙ্গলে পালিয়েছিলেন। সেদিন ওই এলাকার কয়েক শত মানুষ ওই জঙ্গলে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো। কিন্তু পাক সেনারা স্থানীয় রাজাকারদের ইশারায় ওই জঙ্গলে হানাদিয়ে বৃষ্টিরমতো গুলিবর্ষন করে। তাদের ছোঁরা বুলেটে সেদিন তার স্বামীসহ (ধীরেন গাইন) বহু মানুষ মারা যায়। চন্দ্রহার গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ওসমান গনি জানান, হরহর মৌজার (মরার ভিটা) জঙ্গলে সেদিন পাকসেনাদের বুলেটে ১৩৫ জন নিরীহ গ্রামবাসী শহীদ হয়েছিলেন।
সূত্রমতে, ভাগ্যক্রমে সেদিন বিশকা রানী ও তার পুত্র সুধীর গাইন প্রাণে বেঁচে গেলেও দেশ স্বাধীনের পর তার জীবনে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। দেশ স্বাধীনের পর বিধবা বিশকা রানী পুত্র সুধীরকে নিয়ে তার বাবার বাড়ি চন্দ্রহার গ্রামে আশ্রয় নেন। পুত্রের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বিশকা রানী আর বিয়ে করেননি। পুত্র সুধীরকে নিয়ে তিনি সংগ্রামী জীবন শুরু করেন। বাবার বাড়িতে একটি খুপড়ি ঘর তৈরী করে বিশকা তার পুত্র সুধীরকে নিয়ে সেখানে কোনমতে বসবাস শুরু করেন। পুরুষের পাশাপাশি বিশকা রানী অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। ৭/৮ বছর আগে তার (বিশকা) পুত্র সুধীরের মানসিক রোগ ধরা পরলে টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারেননি। গত দুই বছর পূর্বে সুধীর নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। একারনে শহীদের স্ত্রী বিশকা রানী গাইন মানসিকভাবে অনেকটাই ভেঙ্গে পরলেও জীবিকার তাগিদে আজো তাকে অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করতে হচ্ছে।