লেভি ও চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, মালয়েশিয়ায় ক্ষতির মুখে বাংলাদেশী শ্রমিকরা

80

যুগবার্তা ডেস্কঃ মালয়েশিয়ার অর্থনীতি চাঙ্গা করতে নীতির পরিবর্তন করছে দেশটির সরকার। বিদেশি শ্রমিকদের উপর মেডিকেল খরচ, লেভি ও ইউটিলিটি খরচ বাড়ানো হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশের প্রায় ৬ লাখ অভিবাসী শ্রমিক। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকরা মালয়েশিয়া থেকে ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছিল। এক বছর আগে থেকেই মালয়েশিয়ার অর্থনীতি অবনমিত হচ্ছে আর সহসাই তা উন্নত হবে না বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
বেসরকারি ভোগবৃদ্ধি, ধারাবাহিকভাবে তেলের মূল্য হ্রাস, রফতানি নিত্যপণ্যের কম দামের কারণে ২০১৬ সালে মালয়েশিয়ার অর্থনীতি শ্লথ হয়ে পড়বে বলে গত বছরের ডিসেম্বরে বিশ্ব ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল। বর্তমানে মালয়েশিয়ার ৪ রিংগিতের পরিবর্তে ১ মার্কিন ডলার ক্রয় করতে হয়। আর গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৩ রিংগিত।
বাংলাদেশি ৩৫ বছর বয়স্ক শ্রমিক সোহেল রানা মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের একটি নির্মাণাধীন কোম্পানিতে কাজ করেন। তিনি বলেন, গত বছর আমি আমার পরিবারের কাছে ৫০০ রিংগিত পাঠাই। এই রিংগিত থেকে ১৩ হাজার বাংলাদেশি টাকা পেতো আমার পরিবার। আর এই বছর থেকে একই পরিমাণ রিংগিত পাঠালেও ৯ হাজার টাকা পায় আমার পরিবার।
সোহেল রানা আরো বলেন, আমি যদি আগের সমান ১৩ হাজার টাকা পাঠাতে চাই তবে আমার এখানে খরচ মেটাতে সংকটে পড়তে হয়। তাই বর্তমানে আমি আমাকে ১০ ঘণ্টার নিয়মিত কাজের সঙ্গে আরো ৩ -৪ ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করতে হচ্ছে। এখন যদি লেভি আরও বাড়ানো হয় তাহলে সত্যিই বিপাকে পড়তে হবে। কারণ এই লেভির অর্থ কোম্পানি বেতন থেকেই কেটে রাখবে।
২০১৬ সালের বাজেটে মালয়েশিয়ার সরকার বিদেশি শ্রমিকদের উপর থেকে স্বাস্থ্য খাতের ভর্তুকি প্রত্যাহার করেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রভাব পড়ছে বিদেশি শ্রমিকদের উপর। আর সরকার ভর্তুকি প্রত্যাহারের ফলে জাতিসংঘের কনভেনশন লঙ্ঘিত হয়েছে।
জাতিসংঘের কনভেনশন ‘প্রটেকশন অব দ্য রাইটস অব অল মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স অ্যান্ড মেম্বারস অব দেয়ার ফ্যামিলিজ- ১৯৯০’ অনুযায়ী অভিবাসী শ্রমিকরা স্বাস্থ্য, বেতন ভাতা ও ছুটির অধিকার পাবে। এর আগে মালয়েশিয়ার সরকার বিদেশি শ্রমিকদের ওপর ৫০ ভাগ খরচ দেওয়ার বিধান রাখলেও বর্তমানে তা পুরোপুরি প্রত্যাহার করে শতভাগ মেডিকেল খরচ বিদেশি শ্রমিকদের দিতে হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মালয়েশিয়ার গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, দেশটি আশা করছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ২১ লাখ বিদেশি বৈধ শ্রমিকের কাছ থেকে ৪০-৫০ মিলিয়ন রিংগিত অতিরিক্ত আয় হবে।
কুয়ালালামপুর ভিত্তিক এনজিও ক্যারাম এশিয়ার রিজিওনাল কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, যদি মালয়েশিয়ার কোনো নাগরিককে চিকিৎসার জন্য এক রিংগিত খরচ করতে হয় তবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের খরচ করতে হয় ১০০ রিংগিত। আমি বাংলাদেশি এক শ্রমিককে দেখেছি অনেক বেশি জ্বর নিয়েও চিকিৎসার খরচ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা না করে বাসায় ফেরত এসেছে। আইনে সকল শ্রমিকের বীমা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা নেই বলেও রশিদ জানান।
১৮ মার্চ থেকে বিদেশি শ্রমিকদের ওপরে সব ক্ষেত্রে লেভির খরচ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে ১২৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৮৫০ রিংগিত করা হয়েছে। প্লান্টেশনে ৬৪০ থেকে বাড়িয়ে ৫৯০ রিংগিত করা হয়। আর কৃষি খাতে ৪১০ থেকে বাড়িয়ে ৬৪০ রিংগিত করা হয়েছে। লেভি বাড়ানো হলেও বেতন রয়েছে আগের মতো ৯০০ রিংগিতই। আর এই লেভি প্রতি মাসের বেতন থেকে কেটে রাখা হবে।
মালয়েশিয়ার নিউজ পোর্টাল মালাইশিকিনির এক খবরে বলা হয়, ২০১৩ সাল থেকে বাধ্যতামূলকভাবে বছরের পরিবর্তে প্রতি মাসে লেভি রাখার সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার সমাজতান্ত্রিক দল পারটি সোসিয়ালিজ মালয়েশিয়ার (পিএসএম)’র মহাসচিব এ সিবারাজান।
কুয়ালালামপুরের মানবাধিকার সংগঠন তিনাগানিতার নির্বাহী পরিচালক গ্লোরেন্স দাস বলেন, যখন অভিবাসী শ্রমিকদের উচ্চ পরিমাণে লেভি, মেডিকেল খরচ ও ইউটিলিটি বিল দিতে হয় তাহলে তারা তো দেশে অর্থ পাঠাতে পারবে না। অন্য দিকে মালয়েশিয়ার নাগরিকদের এক মাসে ৩ হাজার রিংগিতের বেশি আয় করলে আয়কর দিতে হয়। তাহলে এই শর্তে বিদেশি শ্রমিকরা স্থানীয়দের চেয়ে বেশি আয়কর দাতা। এছাড়া তারা নিয়োগদাতার কাছ থেকে প্রভিডেন্ট ফান্ড বা সামাজিক নিরাপত্তা স্কিমও পায় না। তারা ডার্টি, ডেঞ্জারাস ও ডিমেনিং (থ্রি ডি)কাজ করে মালয়েশিয়াকে সুরক্ষা দিচ্ছে বলেও জানানো হয়।
এমন বাস্তবতাকে অবজ্ঞা করে ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকার মালয়েশিয়ায় নতুন করে শ্রমিক পাঠাতে চুক্তি করে। মালয়েশিয়ার শ্রমিক ইউনিয়ন ও সুশীল সমাজের বিরোধিতার মধ্যে ১২ মার্চ দেশটির সরকার বিদেশি শ্রমিক আমদানির সিদ্ধান্ত স্থগিত করে।
এ সম্পর্কে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাই কমিশনের কাউন্সিলর সায়েদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মালয়েশিয়া তাদের নীতির বিষয়ে হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি তাই বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সিআর আবরার বলেন, নতুন শ্রম বাজার তৈরি করতে সরকারকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে কর্র্তৃপক্ষকে মনে রাখতে হবে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার যাতে সুরক্ষা পায়। এই বিষয়টি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন এই অধ্যাপক।আমাদের সময়.কম