লঞ্চে টিকিট আজ থেকে;আগাম জুটবে না অনেকের

59

যুগবার্তা ডেস্কঃ ‘ভাই, আমরা তো অইলাম ডেকের যাত্রী, আমাগো কপালে তো আর আগাম টিকিট জোটে না। লঞ্চে বরাবরই তো আগাম টিকিট দেয় ভিআইপি আর কেবিনের যাত্রীগোরে। ’—এভাবেই নিজের আক্ষেপ কালের কণ্ঠকে জানান গার্মেন্টকর্মী শাহজাহান।

কবিরুল নামের আরেক যাত্রী ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘ঈদের সময় বস্তার মতন ঠাসাঠাসি কইর‌্যা একেকটা লঞ্চের ডেকে মানুষ বোঝাই করে। আর মানুষরাও পিঁপড়ার মতো ঢুকতে থাকে লঞ্চের মইধ্যে। মালিকের কাছে টাকার হিসাব ছাড়া যাত্রীগো কোনো হিসাবের কারবার নাই। ’

শাহজাহান বা কবিরুলের অভিযোগের সত্যতা সহজেই চোখে পড়ে ঢাকা সদরঘাটের বন্দর ভবনের ভেতর সারি সারি কাউন্টারে তাকালেই। ঝকঝকে-তকতকে সাজানো গোছানো পরিবেশ। দামি টাইলসে মোড়ানো দেয়াল, গ্রিল, থাই গ্লাসের জানালা, ভেতরে ফ্যান, চেয়ার-টেবিল সবই আছে। নেই কেবল যাদের জন্য এই আধুনিক ব্যবস্থা করা হয়েছে সেই সব লঞ্চের টিকিট দেওয়ার লোকজন। ঢাকা পড়ে আছে সব।
অথচ সরকারের তরফ থেকে প্রতিটি কাউন্টার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে একেকটি লঞ্চ কম্পানির নামে। অন্যসব পরিবহনের মতো লঞ্চের যাত্রীরাও যাতে লঞ্চে ওঠার আগে টিকিট কেটে তা হাতে নিয়ে লঞ্চে প্রবেশ করতে পারেন—তেমন পদক্ষেপের অংশ হিসেবেই এই কাউন্টারগুলোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু লঞ্চ মালিকদের বেপরোয়া আচরণের কাছে হার মানতে হচ্ছে সরকারকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দূরপাল্লার লঞ্চে শুধু ভিআইপি বা বিজনেস ক্লাস, প্রথম শ্রেণি কেবিন ও ইকোনমি ক্লাসের (সোফা) আগাম টিকিট দেওয়া হয়। কিন্তু ডেকের যাত্রীরা আগাম টিকিট পান না। ফলে এবারও আগের মতোই লাখ লাখ ডেকের যাত্রীরা পড়েছে অনিশ্চয়তায়। বাসে-ট্রেন-বিমান এমনকি সরকারি যাত্রীবাহী স্টিমারেও সব শ্রেণির যাত্রীর আগাম টিকিটের ব্যবস্থা থাকলেও কেবল বেসরকারি লঞ্চে সব শ্রেণির যাত্রীর জন্য আগাম টিকিট সংগ্রহের ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ লেগেই আছে। এমনকি লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই ও বিশৃঙ্খলার পেছনে ডেকের যাত্রীদের আগাম টিকিটের ব্যবস্থা না থাকাকেই দায়ী করা হচ্ছে। এমন অবস্থার মধ্য থেকেই আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে লঞ্চের আগাম টিকিট দেওয়া।

জানতে চাইলে বিআইডাব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমোডর এম মোজাম্মেল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনেক চেষ্টা করছি তাও পারছি না। এত সুন্দর কাউন্টারগুলো করে দেওয়া হয়েছে তা কেউ ব্যবহার করছে না। শুধু কেবিনেরই টিকিট দেওয়া হচ্ছে। ’

যাত্রীবাহী নৌযান নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা জানান, দূরপাল্লার একেকটি লঞ্চে মাত্র দেড় থেকে দুই শ যাত্রী থাকেন কেবিনের। এর সঙ্গে যেগুলোতে ইকোনমি শ্রেণির ব্যবস্থা আছে সেগুলোয় বড়জোর আরো এক-দেড় শ যাত্রী থাকে নির্ধারিতভাবে, যা একেকটি যাত্রীবাহী লঞ্চের পুরো যাত্রীর ৫ শতাংশেরও কম। যারা সাধারণ সময়েও যেমন আগাম টিকিট কাটে তেমনি ঈদের সময়ও একইভাবে আগাম টিকিট কাটে। কেবল ঈদের সময় অন্য সময়ের তুলনায় কয়েক দিন আগে ওই টিকিটগুলো ছাড়া হয়। কিন্তু এর বাইরে প্রতিটি লঞ্চে কাগজে-কলমেই থাকে ৮০০-এক হাজার ২০০ যাত্রী, বাস্তবে যে সংখ্যা থাকে কয়েকগুণ বেশি। ফলে ঈদের সময়ে প্রতিটি লঞ্চেই নির্ধারিত যাত্রীদের ডেক উপচে পুরো লঞ্চে সব করিডর, কেবিন ব্লক, মাস্টার ডেক, ফ্রন্ট ডেক, সিঁড়ি, স্টাফ কেবিনেও ভিড় লেগে থাকে অনির্ধারিত যাত্রীদের। যে ভিড়ের চাপে ভিআইপি বা বিজনেস ক্লাস, প্রথম শ্রেণি কেবিন ও ইকোনমি ক্লাসের যাত্রীদের রুমের ভেতরে প্রায় বন্দি হয়ে থাকতে হয়। করিডরে পা ফেলার জায়গাও থাকে না।

যাত্রীরা জানায়, দিনে দিনে একের পর এক লঞ্চের চেহারা বদলায়, উন্নত প্রযুক্তি যোগ হয়, বিশাল আকৃতির লঞ্চ তৈরি হচ্ছে, টার্মিনাল ভবন আধুনিক হচ্ছে, কিন্তু ডেকের যাত্রী ব্যবস্থাপনা একই রয়ে গেছে। লঞ্চ মালিকরা নিজেদের টাকা কামাইয়ের ফন্দি হিসেবে যত খুশি তত যাত্রী লঞ্চে তোলার পথ খোলা রাখে। সরকারও এ ক্ষেত্রে কঠোর হতে পারছে না। ফলে ঈদের সময় ঠেলাঠেলি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চে চলাচল করতে হয়।

বিআইডাব্লিউটিএর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা সব শ্রেণির জন্যই সমানভাবে আগাম টিকিট বিক্রি করার কথা বলেছি। এ জন্য আমরা গত বছর থেকে কাউন্টার করে দিয়েছি। লঞ্চ মালিকরা এগুলো বিনা পয়সায় ব্যবহার করবে যাত্রীদের আগাম টিকিট দেওয়ার কাজে। কিন্তু তা হচ্ছে না। আমরা আগামী দিনে এ ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেব। ’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা থেকে দেশের দূরপাল্লার বিভিন্ন নৌ-রুটে প্রতিদিন ৪০-৫০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করলেও ঈদের সময়ে এই সংখ্যা বেড়ে উঠে যায় তিন-চার লাখে। এত যাত্রীর চাপ সামলাতে ব্যবহার হয় মাত্র ৫৫ থেকে ৬০টি লঞ্চ-স্টিমার। এসব লঞ্চের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকৃতির লঞ্চগুলোতেও সরকার অনুমোদিত যাত্রী ধারণক্ষমতা এক হাজার ২০০ জনের বেশি নয়। বাকি বেশির ভাগ লঞ্চেই এ সংখ্যা ৪০০-৬০০ জনের মধ্যে। এমনকি ৩০০-৪০০ জনের ধারণক্ষমতার কিছু লঞ্চ চলাচল করে ঢাকা থেকে বিভিন্ন দূরপাল্লার রুটে। কিন্তু ঈদের সময়ে এই যাত্রী ধারণক্ষমতার কোনোই নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বরং সরকারের পক্ষ থেকেও এক ধরনের প্রশ্রয় দেওয়া হয় লঞ্চগুলোকে। ফলে প্রশাসনের দায়িত্বশীল লোকজনের চোখের সামনেই প্রকৃত ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বা উপচে পড়া যাত্রী নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবেই ঘাট ছাড়ে একেকটি লঞ্চ। যাত্রীরা এ জন্য দায়ী করেন লঞ্চ মালিকদের কারসাজি ও কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ডেকের যাত্রীদের আগাম টিকিটের ব্যবস্থা না করার মাধ্যমেই অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের সুযোগ দেওয়া হয়। একই কারণে নানাভাবে যাত্রী হয়রানি ও বিশৃঙ্খলা ঘটে থাকে।-কালেরকন্ঠ