লজ্জা লাগে; খুব লজ্জা!!!!

298

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ
একটি জিনিস আমার বুঝে আসে না। বাংলায় হাদিস, কোরআন যাই পড়ি কোথায়ও তরজমাকারীকে ‘‘বলেন” শব্দটি ব্যবহার করতে দেখি না। যে শব্দটি আমাদের প্রচলিত ভাষায় এত ব্যবহার হচ্ছে, সেই অতি চেনা “বলেন” শব্দটি কেন বাংলায় অনুবাদ করা এই কিতাব সমূহে নেই তা আমার মাথায় আসে না। লক্ষ্য করলাম ধর্মীয় আলোচনায়ও “বলেন” শব্দটি নেই; মসজিদের খুতবা, ওয়াজের বয়ান কিংবা কোরআনের তফসির সবজায়গাতেই “বলেন” এর পরিবর্তে ভিন্ন শব্দটি উপস্থিত। আলেমগন কিছু বলতে গিয়েই যখন রেফারেন্স দেন তখন এভাবে বলেন, এ ব্যাপারে মহান আল−াহপাক “এরশাদ” করেন কিংবা নবী (সাঃ) “এরশাদ” করেন। তারা কখনোই “বলেন” শব্দ না বলে সব সময় “এরশাদ” শব্দটি ব্যবহার করেন।
এরশাদ শব্দটি বাংলা, উর্দূ নাকি আরবী এই মূহুর্তে সেটাও জানি না। কেবল জানি, ধর্মীয় কিতাবের তরজমা যেমনি এই শব্দটি ছাড়া চলে না, তেমনি বাংলাদেশের রাজনীতিও এই এরশাদ শব্দটি ছাড়া পূরোপুরি অচল। টিভি মিডিয়া বা ফেসবুক, সব জায়গাতেই এরশাদ বহুল উচ্চারিত। শব্দের মালিক এরশাদ সাহেব মহা ভাগ্যবান; তার নাম উচ্চারিত হয় মসজিদ থেকে ময়দান পর্যন্ত। তাকে নিয়ে বর্তমান মিডিয়া সাংঘাতিক ব্যস্ত। তার গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার চেয়ে বেশী গুরুত্ব স্বাধীনতা উত্তর আর কোন নেতা বোধ হয় কোনদিন পাননি। যেদিন থেকে রাজনীতিতে তার আবির্ভাব, সেদিন থেকেই তিনি কোন না কোনভাবে তার গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা ধরে রেখেছেন সব মহলে।
একদিকে তার আমলে করা উন্নয়ন স্বীকৃত, তবে বিতর্কিত খাসিলতের একজন রাজনীতিক তিনি, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করা কিন্তু পতিত এক রাষ্ট্রপতি, সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক স্বীকৃত অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী এবং সর্বোপরি সর্বদা নানা মুখরোচক ঘটনা জন্মদেয়া একজন বাংলাদেশী নাগরিক। যাকে নিয়ে কথা বলা, তাকে নিয়ে কোন কিছু অনুমান করা কিংবা একসাথে চলা ভয়াবহ রকমের কঠিন একটি কাজ। কিন্তু এটা মোটেও মিথ্যে নয় যে গেল ছাব্বিশ বছর ধরে তিনি প্রতিটি নির্বাচনে সর্বোচ্চ আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভকারী একজন সংসদ সদস্য। তার দীর্ঘ নয় বছরের শাসন আমলে দেশে প্রভুত উন্নয়ন হয়েছে। যুগান্তকারী উপজেলা পদ্ধতি চালু করে তিনি প্রশাসনকে শহর থেকে গ্রামে নিয়ে গিয়েছিলেন। তার আমলে করা রাস্তাঘাট এবং ব্রিজ কালভার্টের কথা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
এক সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে উপ-সেনাপ্রধানের একটি পদ ছিল এবং মাত্র দুজন মহাভাগ্যবান সেই পদ অলংকৃত করার সুযোগ পেয়েছেন। এর একজন জিয়াউর রহমান আর অন্যজন এই হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। দুঃখজনক হলেও সত্যি এই দুজনই একথা সেকথার ছুতোয় কিংবা নানা ভনিতা ও ছলনার জন্ম দিয়ে প্রথম উপ থেকে প্রধান হয়েছেন এবং শেষমেষ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূল আসনটিতে বসেছেন। তারপর সময় সুযোগ বুঝে মিলিটারী পোষাক পাল্টে সিভিল রাজনীতিক সাজার চেষ্টা করেছেন। কাকতালীয়ভাবে আজ এই পদ দুটিও সেনাবাহিনীতে নেই, সামরিক ক্যুও আর বাংলাদেশে ঘটে না। বাংলাদেশে সামরিক শাসন আসার পেছনে এ পদ দুটি দায়ী, নাকি পদে থাকা উলে−খিত ব্যক্তিদ্বয় দায়ী সেটা বিশাল গবেষনা সাপেক্ষ একটি বিষয়।
তবে গবেষনা না করেই বলা যায়, এই দুজনের হাত ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার সবচেয়ে বেশী হয়েছে। নিজেকে ধার্মিক রাষ্ট্রপতি প্রমান করার জন্যে এরশাদ সাহেবতো সপ্তাহে সদলবলে তিনবার পীর আউলিয়াদের মাজার কিংবা মসজিদ মক্তবে হাজিরা দিতেন। বহিঃর্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক বলতে মধ্যপ্রাচ্যের অবৈধ রাজাবাদশাহদের সাথে দহরম মহরমই ছিল মুখ্য। যতনা অন্তরে ধার্মিক ছিলেন, ভাব দেখাতেন তার চেয়ে ঢের বেশী। তিনিদাবী করতেন প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে স্বপ্নে ঢাকার কোন না কোন মসজিদে জুম্মা পড়ছেন। যেই দেখা সেই কাজ। অমনি সকাল সকাল সেই মসজিদে গিয়ে হাজির। ঢাকা শহরের এমন কোন মসজিদ নেই যেখানে তিনি জুম্মা পড়েননি। এখন তিনি আর স্বপ্নও দেখেন না; জুম্মা পড়তে প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন মসজিদেও যান না।
তবে নতুনের প্রতি ঝোক এবং নতুনকে পাবার শখ এখনও তার আছে। নিত্য নুতন বান্ধবী বানানো তার রাজকীয় শখের মাঝে অন্যতম। বয়স এতটা হলে কী হবে, বিবাহ বহির্ভূত নারী সম্পর্ক তৈরীতে তার তুলনা তিনি নিজেই। তার বিয়ে করা বউয়ের সংখ্যা নিয়ে যেমনি সমস্যা আছে, তেমনি মেয়ে বান্ধবীর সংখ্যা নিয়েও গোলমাল আছে। আবার তার সন্তান নিয়েও বিতর্কের শেষ নেই। সবাই মানে যে এরিখ তার নিজের সন্তান; কিন্তু ক্ষমতায় থাকাকালীন রাষ্ট্রীয় ঢাক ঢোল পিটিয়ে ১৯৮৩ সনে স্ত্রী রওশনের ঘরে সাদ নামে যে ছেলের জন্ম তিনি দিয়েছেন বলে প্রচার করে আটকোড়া নাম গোছাবার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন সেটা নিয়ে নাটক সিনেমাও হয়েছে।
রাজনীতিতেও নাটক কম করেননি। একদিকে তিনি প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করেছেন। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের খাতির যতœও করেছেন। তাদেরকে এদেশে সম্মানের সাথে ফিরিয়ে এনেছেন। ক’বছর আগে ফাঁসিতে ঝোলানো কর্নেল ফারুককে প্রার্থী করে তিনি একসাথে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেছেন। তাদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে ফ্রিডম পার্টি নামে দল করিয়েছেন। এসবে তার যোগ্যতা এবং কলকাঠি চালাবার নিয়ন্ত্রন অতুলনীয়। যদিও নিজের দলের উপরই তার কোন নিয়ন্ত্রন নেই। থাকবে কিভাবে? নিজের বউদের উপরই তো তার কোন নিয়ন্ত্রন নেই। সরকার বদলের সাথে সাথে তার বউও বদল হয়। অদৃশ্য কারো ইচ্ছায় তিনি বউ রাখেন, কিংবা ছেড়ে দেন। মেরী, জিনাতের পর বিদিশা হলো লাষ্ট উদাহরণ। রওশন এখনো উদাহরণ হননি; তবে হয় হয় করছেন।
আগেই বলেছি, বহুল উচ্চারিত একটি শব্দ এরশাদ। এই শব্দটি ব্যবহার করা নিয়ে কোথায়ও আজ পর্যন্ত কোন বিতর্ক হয়নি। হবার কথাও নয়। কিন্তু স্বয়ং এরশাদ সাহেব মুখ খুলে কোন কিছু এরশাদ করলেই হয় ঘরে, না হয় বাইরে, কেউ না কেউ, কিছু না কিছু বিতর্ক করবেই। এরশাদ সাহেব আজ পর্যন্ত এরশাদীয় স্টাইলে কোন কিছু এরশাদ করে পার পাননি; একটা না একটা প্যাঁচ কোথাও না কোথাও লেগেছেই। কোন না কোন কিছু ভেঙ্গেছেই। সাম্প্রতিক জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান করা নিয়ে মহা প্যাঁচ লেগে গেছে। এখন হয় দল, না হয় ঘর; কোন একটি ভাঙ্গার সম্ভাবনা প্রবল।
তবে নাও ভাঙ্গতে পারে। অবস্থা বুঝে পল্টি নিতে তার জুড়ি মেলা ভার। ডিগবাজী দিতে তার লজ্জা শরম লাগে না; কেবল ঝামেলায় পড়লে এক আধটু সর্দি লাগে। আর লাগে সিএমএইচে ক’দিনের জন্যে ভর্তি হয়ে থাকা। জেলে থাকার চেয়ে হাসপাতালে থাকা যে অনেক শ্রেয় এটা তিনি বার বার প্রমান করেছেন। জেলকে ভীষন ভয় পান। রাজকীয় জীবনে অভ্যস্ত সাবেক সৈনিক তিনি। জেল জুলুমের কষ্ট মেনে নিতে অভ্যস্ত নন। সারা পৃথীবীতে কোন সামরিক শাসক দীর্ঘ জেলজীবন মেনে নিয়েছেন এমন একটি রেকর্ডও নেই। তিনিও পারেননি। এটা পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদগন পারেন। সামরিক শাসকরা সাময়িক সময়ের জন্যে দেশ শাসন করতে পারেন; দীর্ঘ সময়ের জন্যে শাসনও করতে পারেন না; রাজনীতিবিদও হতে পারেন না।
তিনি সবচেয়ে বেশী সর্বনাশ করেছেন আমার প্রজন্মের সকলের শিক্ষা জীবনের চারটি বছর নষ্ট করে দিয়ে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্যে তিনি চারটি বছর সকল বিশ্ববিদ্যালয় এক রকম বন্ধই রেখেছেন। এরপরও ক্ষমতায় শেষমেষ থাকতে পারেননি; সুন্দরভাবে বিদায় নিতে পারেননি ক্ষমতা থেকে। তিনি কেন, কোন সেনাশাসকই কোন দেশে এটা পারেনি। সেনাশাসকদের চিরস্থায়ী সফলতা বা অমরত্ব কোনদেশে, কোন কালেই হয়নি। তাদের কদর থাকে খুব সাময়িক। তবে কষ্টের ব্যাপার হলো, এরশাদের কদর এদেশে এখনো আছে। খালেদা-হাসিনা দু’জনের কাছেই এরশাদের কদর আছে। বিষয়টি দেখতে লজ্জা লাগে; খুব লজ্জা!!-লেখকঃ ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন, উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা