লঙ্কা ছিল শঙ্কা নিয়ে, ডঙ্কা ছিল বেশ! হায়রে আমার স্বপ্নঘেরা মন মাতানো দেশ!!

367

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ
আমার শোনিম খুব খুশী। মিডটার্ম পরীক্ষা শেষ। প্রতিবার শীতকালীন ছুটি শেষে পরীক্ষা হতো। এবার ছুটি শুরুর আগেই পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তাই ছুটিটা খুব মজা করে শোনিম এনজয় করতে পারবে। এ জন্যেই খুশী। আগে থেকেই ঠিক করা আছে বেড়ানোর জায়গাগুলো। তবে ওর আম্মু ততটা খুশী নয়। তার মনের মধ্যে রাজ্যের ভয়। সে মনে করে দেশ হিসেবে মালদ্বীপ এবং শ্রীলঙ্কা বেড়ানোর জন্যে মোটেই ভাল জায়গা নয়। ভয়ের মূল কারন, দুটোই দ্বীপ রাষ্ট্র এবং তার জানামতে শ্রীলঙ্কা দীর্ঘ বছরের বিচ্ছি- ন্নতাবাদীদের দেশ; গেরিলাদের দেশ। ভেবেছিল এখনো তার রেশ ছিটেফোঁটা হলেও রয়ে গেছে।
তার ভাবনা ঠিক হয়নি। মাত্র তিনদিনের অভিজ্ঞতায় তার ভাবনা বদলে যায়; কেটে যায় মনের মধ্যে থাকা সব ভয়। যুুদ্ধের ছিটেফোঁটাও এখন অবশিষ্ট নেই এদেশে। ভাবনা বদলের শুরু শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সে বসেই। পে−নে লঙ্কানদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। জাতি হিসেবে শিক্ষিত লঙ্কানরা তাদের ব্যবহারে বুঝিয়ে দিয়েছে সভ্যতার প্রথম শর্তই হচ্ছে শিক্ষা। শ্রীলঙ্কা এখন উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ। সবার পকেটেই টাকা। নিজেদেরকে তারা গরীব মনে করে না। বর্তমানে এদেশের শিক্ষার হার ৯৩% যা উন্নয়নশীল দেশে বিরল।
ছিমছাম এবং পরিপাটি কলম্বো এয়ারপোর্টের পরিবেশ ঢাকা এয়ারপোর্টের মত নয়; উন্নত দেশের মতই। ঢাকায় এয়ারপোর্টে টয়লেট পেপার পাওয়া অমাবস্যায় চাঁদ পাওয়ার মতই। এখানে এমনটি নয়; সব আছে। প্রতিটি টয়লেটে ড্রেসপরা একজন দাঁড়িয়ে থাকে। পানি কিংবা ময়লা পরার আগেই তুলে ফেলে; এটাসেটা এগিয়ে দিয়ে সাহায্য করে। ট্রানজিট লাউঞ্জ, শপিং এরিয়াসহ পূরো পরিবেশ দেখে বোঝার উপায় নেই এটা শ্রীলঙ্কা নাকি সিংগাপুর। পরিবেশে যেমনি নেই কোন ভোতকা গন্ধ, ভেতরের লোকদের চেহারায় তেমনি নেই খাই খাই ভাব। যেটা ঢাকা এয়ারপোর্টে আছে। ঢাকায় নামলেই একটা উৎকট গন্ধ নাকে লাগবে। আর চোখে লাগবে এয়ারপোর্টের লোকজনের কাজ ফেলে বেকাজে ঝাপাঝাপি, অকাজে হাপাহাপি। আর কুকাজে থাপাথাপি।
এয়ারপোর্ট থেকে ৩৬ কিঃমিঃ দূরের কলম্বো শহরেযাবার জন্যে সমুদ্রের ধার ঘেঁষে নতুন হাইওয়ে হয়েছে দুবছর আগে। মাত্র ২০ মিনিটে পৌঁঁঁঁছা যায়। দৃষ্টিনন্দন কলম্বো টাওয়ার শেষ হবার পথে। সাধারণত উন্নত দেশের রাজধানীতে এমন টাওয়ার দেখা যায় । নতুন আরো একটি অত্যাধুনিক মানের এয়ারপোর্ট করা হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে দেশের জন্যে সবচেয়ে বড় কাজটি করেছেন তামিল বিচিছন্নতাবাদীদের সমূলে নির্মূল করে। এখন আর গেরিলারা নেই। নেই খুন, গুম, গুপ্ত হামলা। অনেক আগে প্রেসিডেন্ট প্রেমাদাসা নিহত হন তামিল গেরিলাদের আত্মঘাতি বোমা হামলাতেই। সেই গেরিলারাই প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের কাছে দলবেঁধে আত্মসমর্পন করে গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়েছে। বেঁচে গেছে লঙ্কান জাতি; বেঁচে গেছে দেশটি। রাবনের লঙ্কা নামেই যেটি সমাধিক পরিচিত।
এরপর একটুও দেরী না করে দেশ পূনর্গঠন প্রক্রিয়ায় হাতে হাত মিলিয়ে দলমত নির্বিশেষে সবাই ঝাঁপিয়ে পরেছে। রাজনৈতিক কলহ বিবাদ একেবারেই নেই; পূরোপুরি থেমে গেছে। রাজনীতিতে মত পার্থক্য আছে; আছে বিরোধীদল। রাজাপাকসেই এখন বিরোধী দলের প্রধান। তার দলের কর্মসূচী আছে; মিটিং, সভা আছে। তবে আন্দোলন নেই, মিছিল নেই। ধর্মঘট আর হরতাল নেই। খুনোখুনি, রক্তপাত নেই। উল্টো সবার মনের মধ্যে দেশ গড়ার, দেশকে এগিয়ে নেবার ব্যাকুলতা আছে। বিশ^ মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার বলিষ্ঠ প্রত্যয় আছে। বলা যায় গৃহযুদ্ধ শেষে শ্রীলঙ্কা এখন শান্ত। দেশী বিদেশী সব মানুষের জন্যে শ্রীলঙ্কা একটি নিরাপদ দেশ।
নিরাপদ বলেই এক দূপুরে দুকদুকে চড়ে সিটি ট্যুরে বেরুলাম শোনিমকে নিয়ে। দুকদুক দেখতে বাংলাদেশের সিএনজির মত; তবে পেট্রোলে চলে। মোটামুুটিভাবে শহর দেখা শেষ করে সাধারণ মানের এক রেস্টুরেন্টে বসলাম। খাবার খেতে খেতে আলাপ হচ্ছিল বেয়ারার সাথে। দারুন ইংরেজী বলে ছেলেটি। কাস্টমারকে খুশী করার সব কায়দা জানে। লক্ষ্য করলাম কেউ কেউ চামুচ দিয়ে খাচ্ছে; আবার কেউবা হাতে। ছেলেটির কাছে লঙ্কানরা সাধারণত কিভাবে খায় জানতে চাইলাম। ঝটপট উত্তর, এখনো হাতেই বেশী খায়। তবে অভ্যাস বদলাচ্ছে। আস্তে আস্তে চামুচ ধরা শিখছে। আশা করি একদিন লঙ্কানরা খাবারের ব্যাপারেও অধিক সচেতন হবে। শিক্ষিত জাতি সচেতন না হয়ে পারে না। সচেতনতা বোধ লঙ্কানদের হাত রেখে চামুচ ধরতে শিখাবে। খুব সাধারণ একটি রেস্টুরেন্টের বেয়ারার কাছ থেকে এই কথা শুনে আমার মনে পড়ছিল বাংলাদেশের মহি ভাইয়ের কথা।
খুব বেশীদিন হয়নি তার সাথে আমার পরিচয়। তবে অন্তত এটুকু বুঝেছি যে মহি ভাই বন্ধুবৎসল একজন ভাল মানুষ। রাজনীতি করেন সামনের কাতারে থেকেই। পেশায় শিক্ষক; একটি কলেজের অধ্যক্ষ। পারিবারিক ব্যবসা আছে। পোষাকেআশাকে অত্যন্ত রুচিশীল এবং মানানসই চেহারার একজন সমাজ সচেতন মানুষ। ক’দিন আগে একটি বিয়ের দাওয়াতে এক টেবিলে বসেছি। খাবার পরিবেশন শুরু হয়েছে কেবল। হাত ধোয়া দরকার। তাকে নিয়ে ওয়াশ রুমে যেতে চাইলাম। তিনি জানালেন এর দরকার হবে না। কমিউনিটি সেন্টারের ওয়াশরুম নোংরা থাকে। এর জন্যে বাসা থেকে আসার সময়ই ভাল করে হাত ধুয়ে আসেন। এ ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত সচেতন এবং হাইজেনিক বিষয়গুলোতে সদা সতর্ক থাকেন।
বিষয়টি দেখে ভাল লাগলো আমার। একজন মানুষ সামাজিকভাবে শিক্ষিত না হলে এমনটা ভাবতে পারেন না। স্বাস্থ্য সচেতনতায় এমন না হলে চলে না। কিন্তু তিনি একা সচেতন হলে লাভ কি? নিজের হাত ধূয়ে টেবিলে ফিরেছি কেবল। আরে মহি যে, কেমন আছো? বলেই হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলেন মহি ভাইয়ের সাথে তার পরিচিত একজন। হাত আর ছাড়েন না ভদ্রলোক। মহি ভাইয়ের চেহারা বিবর্ণ। লোকটি যাবার পরে মুখটি কালো করে আমায় বললেন, দেখলেন! লোকটির কোন কান্ডজ্ঞান আছে? খাবার টেবিলে সবাই হাত ধুয়ে বসে। এখানে কি কারো হ্যান্ডশেক করা উচিত? আমার উত্তর শোনার অবস্থা তার নেই। অবস্থা বেগতিক; রাগে তিনি মনে মনে ফুঁসছেন। না পারছেন ওয়াশ- রুমে যেতে, না পারছেন বাসায় ফিরতে!
আমরা শ্রীলঙ্কা বেড়ানো শেষে দেশে ফিরছি। পে−নে বসে মহিভাইয়ের কথাটা মনে পড়লো। স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও আমরা ব্যাপারটি নিয়ে এখনো ভাবতে শুরু করিনি। অথচ লঙ্কানরা অনেক আগেই শুরু করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষও ভাবতে শুরু করেছে খাবার পূরোপুরি জীবানুমুক্ত থাকা দরকার। হাত ধুয়ে খেলেও কি পূরোপুরি হাত ধোয়া হয়? সারাদিন আমরা কেবল ভাইরাস খাই। আগে মানুষের শরীরে ছিল, এখন কম্পিউটার এবং মোবাইলেও ভাইরাস। সারা দেশটাই ছেয়ে গেছে ভাইরাসে।
শ্রীলঙ্কায় যাবার সময় মনে হয়েছিল যাওয়া ঠিক হচ্ছে কি না। ফিরতি যাত্রায় উল্টো অবস্থা। পাল্টা মনে হচ্ছে দেশে ফেরা ঠিক হবে কি না। স্বপ্নঘেরা দেশটাতো কেবল ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া নয়, অশান্তি আর অস্থিরতায়ও ভরা। সব সময় একটা আতঙ্ক বিরাজ করে মনের মধ্যে। ভয় আর ভীতি শেষ হয় না। শ্রীলঙ্কায় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শেষ; যুদ্ধও শেষ। ফিরে এসেছে স্থিতাবস্থা, ফিরে এসেছে শান্তি।
বাংলাদেশে যুদ্ধ শেষ হয়েছে ৪৪ বছর; কিন্তু আজো স্থিতাবস্থা কিংবা শান্তি ফিরে আসেনি। বিজয়ের পর থেকেই চলছে আন্দোলন। দূর্বার আন্দোলন, দূর্বার সংগ্রাম। আর আমরা রাজনীতিবিদদের লাল সালাম গ্রহন করতে করতেই ক্লান্ত। কিন্তু তারা ক্লান্ত হচ্ছে না, শান্ত হচ্ছে না। আমাদেরকে শান্ত করতে পারছেনা। হয়ত এদেশে আমাদের জন্মই হয়েছে জনমভর তাদের অশান্ত আন্দোলন আর ক্ষমতায় থাকা বা যাওয়ার অমানবিক সংগ্রাম দেখার জন্যেই!! নতুন বছরের নতুন আলো দেখার জন্যে নয় নিশ্চয়ই! তবুও নতুন বছর আসে। আমরা সবাইকে বলি শুভ নববর্ষ!!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পদক, যুগবার্তা