রোমান্স ভাগ হয়ে গিয়েছে বিপ্লবের সঙ্গে

8

শান্তনু দে: এই শহরের ইতিহাস জানে মান্টোর প্রথম সবকিছু।
এই শহরে নিজের ঘরে রাখতেন ভগৎ সিংয়ের ছবি। যে ঘরকে তিনি ডাকতেন ‘রেড রুম’!
অমৃতসর। আসার কথা ছিল না। চণ্ডীগডে বারকয়েক আসলেও এই শহরে কখনও আসা হয়নি। এবারেও খানিকটা অফ রুট। তবু জালিয়নওয়ালাবাগ, রাতের স্বর্ণমন্দিরের অমোঘ আকর্ষণের সঙ্গেই মান্টো আর ফয়েজের জন্য আসা। যদিও সাতচল্লিশে দাঙ্গার আগুনে মান্টোর গোটা মহল্লাই পুড়ে খাক হয়ে গিয়েছে। এখন সেখানে কাটরা জয়মাল সিং মার্কেট। শহরের কোথাও নেই মান্টো, কিংবা ফয়েজের স্মৃতিসৌধ। দু’জনের নামের সঙ্গে আমজনতাও তেমন পরিচিত নয়।
অথচ, এই শহরেই মুসলিম-অ্যাঙ্গলো ওরিয়েন্টাল (মেয়ো) কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন ফয়েজ। আর তাঁর ছাত্র ছিলেন মান্টো। ছাত্র সম্পর্কে শিক্ষকের প্রতিক্রিয়া: ও কখনোই বেশি পড়াশোনা করত না। খুবই দুষ্টু ছিল। কাউকে সম্মান করত না। তবে আমায় করত, আমাকে ওর ‘উস্তাদ’ মানত।
এই শহরকে চেনে তামাম দুনিয়া। এই শহরেই জালিয়নওয়ালাবাগ। বর্বর হত্যাকাণ্ড। মান্টো তখন সাত। এবং তিনি তাঁর সাক্ষী। জালিয়নওয়ালাবাগের ‘নায়ক’ সইফুদ্দিন কিচলু ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। সেকারণে তাঁর পরিবারকে কম দুর্বিপাকের মুখোমুখি হতে হয়নি। ৯ এপ্রিল, ১৯১৯। মানুষ যখন হল গেট থেকে মিছিল শুরু করেন, তখন তাঁদের সঙ্গে ছিলেন মান্টোও। গেটের কাছে থামানো হয় সেই মিছিল। এগোতে চাইলে বিপরীত দিক থেকে শুরু হয় গুলিবৃষ্টি। ১,৬৫০ বুলেট। দক্ষিণদিকে ছিল একটি অগভীর নালা। অনেকেই তাতে পড়ে যান। গুলি থামা না পর্যন্ত কিশোর মান্টো সেখানেই লুকিয়ে ছিল।
মুম্বাই, কিংবা লাহোর নয়। এই শহরে বসেই মান্টো লেখেন তাঁর প্রথম গল্প ‘তামাশা’, জালিয়নওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড নিয়ে। প্রকাশিত হয় ১৯৩৪ সালে, লাহোরের একটি ছোট সাহিত্য পত্রিকায়। পরে জালিয়নওয়ালাবাগ নিয়ে লেখেন আরও গল্প। স্বরাজ কে লিয়ে, সন ১৯১৯ কী এক বাত।
এই শহরেই সাজ্জাদ জাহিরের সঙ্গে ফয়েজের প্রথম আলাপ। প্রথম পড়া ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’। মার্কসবাদ নিয়ে আগ্রহের শুরু।
ফয়েজের নিজের কথায়: ‘১৯৩৫, আমি অমৃতসর কলেজে পড়ানো শুরু করি। কলেজের তরুণ শিক্ষকদের মাঝে এসব বিষয়ে নিয়ে তর্ক হতো। একদিন আমার এক বন্ধু সাহেবজাদা মাহমুদুজ্জাফর আমাকে একটা পাতলা বই দিয়ে বলল, ‘নাও, এটো পড়ো, আগামী সপ্তাহে এটা নিয়ে তোমার সাথে তর্ক হবে। তবে বেআইনি বই, একটু সাবধানে রেখো।’ বইটা ছিল ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’। আমি এক বসাতেই বইটি শেষ করলাম। তারপর আরো তিন-চারবার পড়লাম। মানুষ আর প্রকৃতি, ভবিষ্যৎ আর সমাজ, সমাজ আর শ্রেণি, শ্রেণি আর উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্টন, উৎপাদন ব্যবস্থা আর উৎপাদন সম্পর্ক আর সমাজ সম্পর্ক, মানব পৃথিবীর মাঝে স্তরে স্তরে সম্পর্ক, বিশ্বাস, চিন্তা আর কাজ— মনে হলো এইসব রহস্য সমাধানের চাবি যেন কেউ হাতে ধরিয়ে দিল। এমনি করে সোশ্যালিজম আর মার্কসবাদ নিয়ে আমার আগ্রহের শুরু।’
কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো পড়ার সময়ই, কিংবা খানিক পরে তিনি লেখেন: ‘মুঝসে প্যাহলি সি মুহাব্বাত মেরি ম্যাহবুব না মাংগ।’ আগের মতো ভালোবাসা আমার কাছে আর চেয়ো না প্রিয়!
তখন যে তাঁর রোমান্স ভাগ হয়ে গিয়েছে বিপ্লবের সঙ্গে।