রেমিটেন্সে ধ্বস; অথচ ভাবনা নেই, চিন্তা নেই কারো!!!

66

ইঞ্জি: সরদার মো: শাহীনঃ চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পুরো পরিবার নিয়ে কেমন ভাবে পর্যুদস্তু হয়েছিলাম তা আর নাইবা লিখলাম। প্রথমে আমি, তারপর আমার শোনিম এবং সর্বশেষ শোনিমের মা। একজন একজন করে ধরেছে; কাউকেই রেহাই দেয়নি। এক অচিন্তনীয় এবং অসহনীয় অবস্থা। দু’তিন দিনে জ¦র সেরেছে বটে তবে থেকে গেছে সর্বাঙ্গের ব্যথা। গিরায় গিরায় ব্যথা। লোহা দিয়ে পিটিয়ে শরীর থেতলা করে দিলে যেমন ব্যথা হয়, ঠিক তেমন ব্যথা। অনেকটা রিমান্ড ফেরত আসামীর গায়ের ব্যথার মত। মাস পেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ব্যথা যাচ্ছে না। যাবার কোন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
তবে শরীরের ব্যথা যেমন তেমন, মনেও অনেক ব্যথা আছে। মনের ব্যথার কারণ চিকনগুনিয়া নিয়ে সরকারের নির্লিপ্ত আচরণ। সারাদেশ বিশেষ করে শহরাঞ্চলের মানুষ চিকনগুনিয়ায় কুপোকাত। বলা যায় মহামারী লেগে গিয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে সর্বস্তরের মানুষ। কিন্তু দায়দায়িত্ব নিয়ে এসব দেখার জন্যে, মানুষের পাশে থাকার জন্যে দেশে সরকার নামক কোন সিস্টেম ছিল না। সরকার ছিল একেবারেই নির্বিকার। কারণে অকারণে রসকসহীন কথা বলা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মিডিয়ার চাপাচাপিতে নিজের দায় এড়িয়ে এক কথায় দায় চাপালেন সিটি মেয়রের উপর। সিটি মেয়রও কথা কম বলেন না! গা বাঁচিয়ে কৌশলে দায় চাপালেন শহরের বাসিন্দাদের উপর। দেশের মহামারীতে গা বাঁচানো নিয়ে মহা মানুষদের মধ্যে মহা প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে গেল!
গা বাঁচানোর এমন প্রতিযোগীতায় নামলে সব দায় যে মহামন্ত্রী অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর গায়ে গিয়ে পড়ে এটা তাঁরা আমলে নেননি। পুরো বিষয়টিকে তাঁরা খুবই হালকা করে দেখেছেন। ব্যাপারটা এমন যে, মশার মত সামান্য একটা জিনিস মারতে সরকারকে লাগবে কেন? এ তো খুবই সামান্য একটি বিষয়। সামান্য কাজের জন্যে তো আর সরকার না। সরকারের হাতে কত অসামান্য কাজের পাহাড়! এসব সামান্য কাজের পুরো দায়িত্ব দেশের সামান্য জনগনের। মশাকে নিজের হাতে থাপড়িয়ে মেরে ফেলবে দেশের জনগণ। এটা নিয়ে এত্ত কথা কেন? তাদের কাজটা কি? একটা করে থাপ্পড় দেবে; দুইটা করে মশা মরবে!! ব্যাস কেল্লা ফতে!!!
তবে কেল্লা তো আর এত সহজে শেষ হয় না! হয় মন খারাপ আর শরীর কাহিল। এমনি মন খারাপ করা কাহিল শরীরেই প্রবাসে ফিরছিলাম পরিবারের সবাইকে নিয়ে। পথে মালয়েশিয়াতে দিন তিনেকের যাত্রা বিরতি। শরীরের যে অবস্থা তাতে করে একটানা লম্বা জার্নি করার জো নেই। কোন রকমে গাঠ্ঠি বোসকা হোটেল রুমে রেখে শোনিমকে নিয়ে রাতের খাবার খেতে বের হয়েছি। পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের বিশাল ফুডকোর্ট লোকে লোকারন্য। আমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছি আর পছন্দের খাবার খুঁজছি। খাবার তো আর মেলে না! শরীর খারাপ হলে যা হয়, কোন খাবারেই রুচী থাকে না।
রুচীহীন এই আমাকে খোঁড়াতে দেখে এক বাঙালী দোকানী ভাই বললো, “আহারে! ভাইজানের উপর দিয়ে বোধ হয় বেশী চোট গেছে। আর বইলেন না ভাই! ওরা যারে ধরে, আর ছাড়ে না। কইলজাডা দেহ থিকা বাইর কইরা ফালায়। এরা ইমিগ্রেশান পুলিশ না; সাক্ষাত আজরাইল!” কথা শুনেই বুঝতে পারছিলাম মানুষটি ভুল করছেন। টাংগাইলের মানুষ তিনি। ছয় বছর ধরে আছেন এখানে। ভুল করে আমাকেও মালয়েশিয়ান প্রবাসী ভেবেছেন। ভেবেছেন পুলিশের ধরপাকড়ে আমিও পড়েছিলাম। হাড্ডিগুড্ডি আমারও শেষ। যাই হোক, খেতে খেতে অনেক কথা হলো তার সাথে। সুখদুঃখের অনেক কথা, অনেক অভিমান। যতনা মালয়েশিয়ান পুলিশের উপর, তার চেয়েও ঢের বেশী বাংলাদেশ সরকারের উপর।
নির্বিচারে যখন বাংলাদেশী শ্রমিকগণ নিস্পেষিত হচ্ছিল মালয়েশিয়ার আনাচে কানাচে, তখনও নির্বিকার ছিল হাইকমিশন তথা বাংলাদেশ সরকার। ধরপাকড়ের সময় কে বৈধ আর কে অবৈধ সেটাও পরখ করেনি পুলিশ। সামনে যাকেই পেয়েছে তাকেই বেধরক পিটিয়েছে। পিটিয়ে হাড্ডিগুড্ডি শেষ করে দিয়েছে। হাইকমিশনারের কথা বাদ দিলাম; আমাদের প্রবাসীমন্ত্রী ব্যক্তিগত সফরে তখন মালয়েশিয়াতেই ছিলেন। একেবারে ঘাপটি মেরে ছিলেন; চুপটি মেরে ছিলেন। কার ভয়ে কার হয়ে চুপটি মেরে ছিলেন কেউ জানে না! তবে সবাই জানে এবং মানে যে, ব্যবসায়ী এই মন্ত্রী বাহাদুর প্রবাসীমন্ত্রীর মত আচরন করেন নাই। অথচ এই প্রবাসীদের দেখভাল করা তাঁর দায়িত্বেই পড়ে। এই প্রবাসীরাই পুরো জীবনটাকে স্যাক্রিফাইজ করে রেমিটেন্স পাঠিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারকে ভরে দিচ্ছে। তারা স্যাক্রিফাইজ করে পরিবারের জন্যে, দেশের জন্যে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্যাক্রিফাইজ করে। জীবনও দিয়ে দেয়। প্রতিদিন বিভিন্ন দেশ থেকে গড়ে দশটি করে প্রবাসীর লাশ দেশে আসছে। এরপরও কোথায়ও এতটুকু সম্মান নেই তাদের। সবখানে কেবল এদেরকেই হেনস্থা পোহাতে হয়। এরা বিদেশে হেনস্থায় পড়ে, দেশেও পড়ে।
প্রথম হেনস্থায় পড়ে দেশের বিমানবন্দরে। কেন জানি না সবাই তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করার জন্যে বন্দরে সদা প্রস্তুত থাকে। সবাই লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে। একগ্র“প দাঁড়িয়ে থাকে তাদের লাগেজ কাটার জন্যে। আর একগ্রুপ থাকে তাদের কাগজপত্রের ভুল ধরে পকেটের ডলার হাতরাবার কাজে। এরা অল্প শিক্ষিত, তাই ভুল থাকবেই। আর জেনেশুনেই সবাই এই সুযোগটাই নেয়।
এটাতো গেল ভিতরের কথা। বাইরেও কথা আছে। বাইরে হয় টানাহেচরা। একগ্রুপ এদিকে টানে, অন্যগ্রুপ ওদিকে। কেউ গাড়ীর জন্যে, কেউ বাড়ীর জন্যে। সাথে ভদ্রবেশী প্রতারক গ্রুপ তো আছেই। এরা হয় খুবই মারাত্বক; সর্বশান্ত করে ছাড়ে। পাশাপাশি আছে পুলিশ আনসারের উৎপাত। এরা প্রতারকদের কিচ্ছু বলতে পারে না। পারে কেবল বেছে বেছে যাত্রীদের আর তাদেরকে নিতে আসা খুবই অসহায় স্বজনদের হয়রানী করতে। পদে পদে হয়রানী।
হয়রানীর চরমে পৌঁছেছে দেশের সব ব্যাংকের আচরন। প্রবাসীরা রেমিটেন্স ব্যাংকে পাঠিয়ে মহা সমস্যায় পরে। ব্যাংকের খবরদারিত্ব আর বাড়াবাড়ি সর্বকালের সর্বরেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গ্রাহকদের সাথে ব্যাংক জাস্ট চোরের মত আচরন করে। ভাবখানা এমন যেন টাকার প্রকৃত মালিক ব্যাংক নিজে আর গ্রাহকরা ব্যাংকের দয়া আনতে যায়। টাকা কে পাঠাইছে, কেন পাঠাইছে, প্রবাসী কী করে, এত্ত টাকা কামায় কেমনে, এই টাকা দিয়ে কী করবেন, কাকে দিবেন, কেন দিবেন, এত্ত খরচ করার দরকার কি, খরচের ভাউচার দেখান, ইত্যাদি।
এটা সত্যি যে গুলশানে হলি আর্টিসানের ঘটনার পরে জঙ্গীবাদের বিদেশী অর্থের উৎসের সন্ধানে সরকারকে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে। এটা কৌশলগত সতর্কতা; করতে হবেই। বিষয়টি জটিলও নয়। একটু ম্যাকানিজম প্রয়োগের ব্যাপার মাত্র। হয়রানী করার ব্যাপার নয় নিশ্চয়ই। কিন্তু এই সুযোগটা নেয় কিছু সংখ্যক ব্যাংকার এবং আমলা। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে সারতে পারে না, বাস্তবায়নের নামে অতি উৎসাহী সেই আমলারা অমনি ঝাপিয়ে পড়ে নিরীহ জনগণের উপর। এতে করে জঙ্গীবাদের সহযোগীরা আদৌ ধরা পড়ে কি না জানি না, কিন্তু নিরীহ জনগণ ধরা পড়ে। তাদের হয়রানীর জালে ধরা পড়ে নাভিশ্বাস ওঠে। আর এসবে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেল বাদ দিয়ে ঝুট ঝামেলা মুক্ত হুন্ডীমুখী হয়। এতে করে বঞ্চিত হয় দেশ বৈদেশিক মুদ্রা হতে। আমলারা যত কারনই দেখাক না কেন, কেবল মাত্র এই একটি কারনেই থেমে যাচ্ছে রেমিটেন্সের প্রবাহ। থেমে যাবে বিদেশী বিনিয়োগও।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এসবে আপনার আমলাদের কিচ্ছু আসবে যাবে না। তাদের বেতনভাতা আপনি আগেই বাড়িয়ে দিয়েছেন। ভবিষ্যতে আরো দেবেন। তারা নিশ্চিন্তে আছে আপনার উপর ভরসা করে। কিন্তু যে রেমিটেন্সের উপর আপনার এত ভরসা, এত উন্নয়নের মহা পরিকল্পনা, সে সবে টান ধরেছে। নিশ্চিন্তে থাকা আমলাদের অতি উৎসাহের কারনেই টান ধরেছে। গেল বছরে রেমিটেন্স কমেছে ১৫%। বিষয়টি ভয়াবহ রকমের অশনি সংকেত। একদিকে ছোটখাট বন্যা গেল। হাওরে ধান উৎপাদনে ঘাটতি; আমদানী করতে হয়েছে চাল। এর উপর রেমিটেন্সে টান পড়লে আপনি মহা বিপদে পড়বেন। বিপদে পড়বে পদ্মা সেতুর মত বড় বড় প্রকল্পগুলো।
বিনয়ের সাথেই বলছি, দেশের তথা আপনার বিপদে মুখচেনা একজন আমলাকেও পাশে পাবেন না। তারা সিদ্ধান্ত নেয়ার কিংবা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যত না সিদ্ধহস্ত, তারচেয়ে ঢের বেশী সিদ্ধহস্ত জটলা লাগাতে। সব জায়গায় প্যাঁচ আর জটলা লাগান। এবং নির্মম সত্যি হলো, তাঁরা কেবল জটলা লাগাতে পারেন; কিন্তু কখনোই খুলতে পারেন না। খোলার কাজটি সব সময় আপনাকেই করতে হয়; এবং আজীবন করতে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!!!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা