রিজার্ভ চুরি: বাংলাদেশ ব্যাংকে পরিবর্তন, মামলা, কর্মকর্তাদের ক্ষোভ

78

যুগবার্তা ডেস্কঃ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকে নজিরবিহীন পরিবর্তন আনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে এমন পরিবর্তন এটাই প্রথম। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। দুপুরের মধ্যেই এটি গৃহীত হয়।
এই ঘটনার পর বিকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম ও নাজনীন সুলতানাকেও বরখাস্ত করা হয়। রিজার্ভ থেকে ডলার চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তদারকির ব্যর্থতার দায়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগের সচিব ড. আসলাম আলমকে ওএসডি করা হয়। এ ছাড়া রিজার্ভ চুরির ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয়দের আসামি করে গতকাল মতিঝিল থানায় মামলা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিলিং রুমের ইনচার্জ জোবায়ের বিন হুদা।
ব্যাংকিং খাতের এসব ঘটনা গতকাল সারা দেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ায় সরকার যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে এমন ব্যক্তি এখনো বহাল তবিয়তে থাকায় সরকারের সমালোচনাও করেছেন অনেকে।
এদিকে নতুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে সাবেক অর্থ সচিব ও সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ফজলে কবিরের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে আমেরিকা সফরে রয়েছেন। ঢাকায় ফিরবেন ১৮ মার্চ। আগামী ২০ মার্চ থেকে তিনি গভর্নরের দায়িত্ব নিতে পারেন বলে জানা গেছে।
গভর্নরের পদত্যাগ : রিজার্ভ থেকে ডলার চুরির ঘটনা ও তা গোপন করার দায়ে সরকারের ব্যাপক চাপের মুখে পদত্যাগ করেছেন গভর্নর আতিউর রহমান। গতকাল দুপুর ১২টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তিনি পদত্যাগপত্র দিয়ে আসেন। এ সময় তিনি ওই ঘটনার একটি ব্যাখ্যাও দেন বলে সংবাদমাধ্যমকে জানান প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব। গভর্নর পদত্যাগপত্র দেওয়ার পর সঙ্গে-সঙ্গে তা গৃহীত হয়। এ খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। গণমাধ্যমে এ সংবাদ প্রকাশিত হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নেমে আসে স্থবিরতা। অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। কেননা রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি না জানানোর কারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। গত কয়েক দিন ধরে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে চলছিল ঠা-া লড়াই। গভর্নর তোয়াক্কা করছিলেন না অর্থমন্ত্রীকে। মন্ত্রণালয় ঘটনা জানতে চাইলেও অফিসিয়ালি জানানো হচ্ছিল না।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার ও সোমবার দুই দফায় অর্থমন্ত্রী সাক্ষাৎ করে ডলার চুরির ঘটনা কীভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক আড়াল করেছে সে বিষয়ে তার ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন। গত সোমবারই প্রধানমন্ত্রী গভর্নর, ডেপুটি গভর্নরসহ অন্যদের বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। এর আলোকে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। ওইদিন বিকালে গভর্নরকে অর্থমন্ত্রী তলব করেন। কিন্তু তিনি ঘটনা আঁচ করতে পেরে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেননি। পরে রাতে অর্থমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে দেখা করেন। ওই সময় অর্থমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার কথা তাকে জানিয়ে দেন।
এদিকে পদত্যাগের আগে গতকাল সকালে নিজ বাসায় সাংবাদিকদের আতিউর রহমান বলেন, আমি অপেক্ষা করছি প্রধানমন্ত্রী কী বলেন। আমি পদত্যাগ করলে যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভালো হয়, তাহলে পদত্যাগ করতে দ্বিধা নেই। পদত্যাগপত্র লিখে বসে আছি। তিনি আরও বলেন, গত সোমবার বিকালে আমি ভারত থেকে দেশে ফিরেছি। ওইদিন রাতে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তার বাসায় গিয়ে দেখা করেছি অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আমি চলে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক ভালো চলবে। আমি আমার বিবেক দ্বারা চালিত হই। আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রী আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন, তিনি না বললে আমার পদত্যাগ করা উচিত হবে না। সাত বছর দায়িত্ব পালন করেছি, বাংলাদেশ ব্যাংককে সন্তানের মতো মনে করেছি। রিজার্ভ থেকে চুরি হোক, এটা আমি কখনো চাইনি।
গভর্নরের ওপর মানসিক চাপ : এদিকে সোমবার গভর্নর অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা না করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। একপর্যায়ে পুরো ঘটনা জাতির সামনে তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নেওয়অ হয়। গতকাল বেলা ১১টায় এটি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গভর্নর পদত্যাগের কথা জানালে অর্থ মন্ত্রণালয় সংবাদ সম্মেলনের সময় পিছিয়ে দুপুর আড়াইটায় নির্ধারণ করে। অবশ্য গভর্নর পদত্যাগ করায় অর্থ মন্ত্রণালয় সংবাদ সম্মেলন বাতিল করে দেয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, গভর্নরের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টিতেই এই সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়েছিল।
ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করছেন- এমন গুঞ্জন ছিল গত সোমবার থেকে। ওইদিন রাতে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী গভর্নরকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়টি নিয়ে আতিউর রহমানের গুলশানের বাসা, বাংলাদেশ ব্যাংক, সচিবালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ছিল গণমাধ্যমকর্মীদের ছোটাছুটি।
সবাই পারলেও পারেননি আতিউর : স্বাধীনতার পর থেকে ড. আতিউর রহমানের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়োগ পাওয়া সব গভর্নরই পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু পারলেন না আতিউর রহমান। মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাস আগেই পদত্যাগে বাধ্য হলেন তিনি। আগামী ২ আগস্ট তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম গভর্নর আ. ন. ম. হামিদুল্লাহ ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি দায়িত্ব নেন। তার মেয়াদ শেষ হয় ১৯৭৪ সালের ১৮ নভেম্বর। ১৯৭৪ সালের ১৮ নভেম্বর গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়া এ. কে. এন. আহমেদের মেয়াদ শেষ হয় ১৯৭৬ সালের ১৩ জুলাই। এম নূরুল ইসলাম ১৯৭৬ সালের ১৩ জুলাই থেকে ১৯৮৭ সালের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ সালের ১২ এপ্রিল থেকে ১৯৯২ সালের ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত গভর্নর ছিলেন শেগুফতা বখত চৌধুরী। ১৯৯২ সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৬ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন মো. খোরশেদ আলম। ১৯৯৬ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ১৯৯৮ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন লুৎফর রহমান সরকার। ১৯৯৮ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে ২০০১ সালের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। ২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর থেকে ২০০৫ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত গভর্নর ছিলেন ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। ২০০৫ সালের ১ মে থেকে ২০০৯ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। ড. আতিউর রহমান ২০০৯ সালের ১ মে থেকে গতকাল পর্যন্ত গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নতুন গভর্নর ফজলে কবির : নতুন গভর্নর প্রসঙ্গে গতকাল অর্থমন্ত্রী বলেন, সাবেক অর্থ সচিব ফজলে কবিরকে গভর্নর করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান। অফিসিয়াল কাজে ফজলে কবির বর্তমানে নিউইয়র্কে আছেন। ১৮ মার্চ দেশে ফিরবেন। দেশে ফেরার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তিনি এ পদে নিয়োগ পাবেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ফজলে কবিরের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৮০ সালে রেলওয়ের সহকারী ট্রাফিক সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে। তিন বছরের মাথায় তিনি প্রশাসনে যোগ দেন। ২০১২ সালে অর্থ সচিবের দায়িত্বে আসার আগে জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও ছিলেন। ফজলে কবিরের স্ত্রী মাহমুদা শারমিন বেনু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব।
দুই ডেপুটি গভর্নর বরখাস্ত : গভর্নরের পদত্যাগের পর দ্রুত বদলাতে থাকে দৃশ্যপট। বিকালের দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দুই ডেপুটি গভর্নরের বরখাস্তের সংবাদ আসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির জন্য দায়ী করা হচ্ছে অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগকে। ওই বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্বে আছেন ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানা। আইটি ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার দায়ে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
গতকাল বিকালে শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় সাংবাদিকদের প্রশ্নে দুই ডেপুটি গভর্নরকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম ও নাজনীন সুলতানাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই দুই পদে শিগগিরই নতুন নিয়োগ দেওয়া হবে।
বাংলাদেশের প্রথম নারী ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানার চাকরির মেয়াদ আগামী ১৪ জুলাই শেষ হওয়ার কথা ছিল। উল্লেখ্য, তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধের একজন অগ্রণী সেনানী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের যেসব আলোকচিত্র এখন প্রদর্শিত হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে বেশকিছু নারী সাদা শাড়ি পরে কাঁধে রাইফেল নিয়ে মিছিল করছেন। এর অগ্রভাগে ছিলেন আজকের ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ইডেন কলেজ থেকে এই মিছিলটি বের করা হয়েছিল। অন্যদিকে আবুল কাশেমের চাকরির বাড়তি মেয়াদ আগামী আগস্টে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
ব্যাংকিং সচিব ওএসডি : অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলমকে ওএসডি করা হয়েছে। এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত সচিব গকুল চাঁদ দাসকে। ড. এম আসলাম অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্য সরকারি ব্যাংকগুলো দেখাশোনা করতেন। পদাধিকারবলে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সদস্য। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনাটির বিষয়ে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেননি।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া : গভর্নরের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে তা দেখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা গতকাল সকাল থেকেই খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। গতকাল সকাল ১০টায় আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুর’স-এর পূর্বনির্ধারিত বৈঠক ছিল। ওই বৈঠকে সভাপতি হিসেবে গভর্নরের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু গভর্নর ব্যাংকে না যাওয়ায় ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান ও নাজনীন সুলতানার উপস্থিতিতে বৈঠক শুরু হয়। এতে নির্বাহী পরিচালক ও কয়েক বিভাগের মহাব্যবস্থাপকরা উপস্থিত ছিলেন। দুপুর ১২টায় টেলিভিশন ও অনলাইন নিউজপোর্টালের মাধ্যমে গভর্নরের পদত্যাগের বিষয়টি জানতে পারেন কর্মকর্তারা। খবরটি জানার পর মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক ওই সভা থেকে বেরিয়ে নিজের চেম্বারে গিয়ে বসেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে ড. আতিউর রহমানের বিদায় নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ আনন্দ প্রকাশ করেন, কেউ তার প্রতি অবিচার করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানান, ড. আতিউর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একটি বলয় তৈরি করেছেন। তার পছন্দের মানুষদের সব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে অধিকাংশকে বঞ্চিত করেছেন। এমনকি চাকরির বয়স শেষ হওয়া কর্মকর্তাদের পুনরায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন। এ ছাড়া পছন্দের মানুষদের বাইরে থেকে ডেকে এনে নিয়োগ দিয়েছেন। এতে নিয়মিত কর্মকর্তারা বঞ্চিত ছিলেন। তাদের ক্ষোভ ছিল অনেক বেশি। গভর্নর তার পদকে অপব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগ করেন কেউ কেউ। অত্যধিক বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে।
এদিকে আরেক শ্রেণির কর্মকর্তারা দাবি করেন, ড. আতিউর রহমান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেহারা পাল্টে দিয়েছেন। কাজে স্বচ্ছতা এনেছেন। তার ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ১০ টাকার হিসাব বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।
গভর্নরের পদত্যাগের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলতে গেলে একটি বিরানভূমিতে পরিণত হয়। প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে অসংখ্য লোকজন এখানে আসেন। গতকাল তাদের আগমন ছিল অনেক কম। গভর্নরের ফ্লোর বলে খ্যাত নির্বাহী ফ্লোরে ছিল সুনসান নীরবতা। সংবাদমাধ্যমের কর্মী ও ব্যাংকের নিজস্ব কর্মীদের ছাড়া কাউকে দেখা যায়নি। বিকালে দুই ডেপুটি গভর্নরের বরখাস্তের সংবাদ চলে এলে ভেঙে পড়েন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এ সময় অনেকেই বলতে থাকেন, তাহলে কীভাবে ব্যাংক চলবে। তাদের মধ্যে গুজব রটতে থাকে আরও কিছু কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত এ ধরনের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
অর্থ মন্ত্রণালয় সকালে উৎসবমুখর, বিকালে হতাশ : গতকাল সকাল থেকেই গভর্নর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাপারে উৎসুক ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। মন্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েক কর্মকর্তা ছাড়া সবার মধ্যেই এমন অবস্থা দেখা গেছে। সকালে সংবাদ সম্মেলন হবে তা আগে থেকেই জানা ছিল তাদের। এজন্য গণমাধ্যমকর্মীদের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেন তারা। শুধু গভর্নরের বিষয়েই নয়, অন্যদের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় কিনা তাও জানতে চেয়েছেন। তবে বিকালের দিকে হতাশ দেখা গেছে কর্মকর্তাদের। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলমকে ওএসডি করা হচ্ছে এমন খবরে হতাশ হন অনেকেই। তবে চাকরির ভয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি। গতকাল বিকালে তার বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বিদায় নেন ড. এম আসলাম আলম। এ সময় ব্যাংক সচিব হিসেবে আজ তার শেষ কর্মদিবস হিসেবে ড. আসলাম উল্লেখ করেন বলে জানান একাধিক কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশে ক্ষুব্ধ অফিসার্স কাউন্সিল : গণমাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ স্থানান্তরিত হয়ে যাওয়ার বিষয়টি তদন্তাধীন। চলমান তদন্ত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ উদ্ঘাটনের পূর্বেই বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন কর্মকর্তার নাম উল্লেখপূর্বক পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
তদন্ত কমিটির প্রজ্ঞাপন : এদিকে অর্থ লোপাটের ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেন, তদন্ত কমিটি তো অলরেডি করা হয়েছে। ড. ফরাসউদ্দিন কমিটির প্রধান। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গকুল চাঁদ দাসকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। কমিটিতে সদস্য হিসেবে বুয়েটের অধ্যাপক কায়কোবাদকে রাখা হয়েছে। ওই কমিটিতে কয়জনকে রাখা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপাতত তিনজন। আমি অপশন রাখছি টু গিভ মোর।
সূত্র জানায়, এ বিষয়ে গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। অচিরেই কমিটি কাজ শুরু করবে। এদিকে কমিটির কর্মপরিধিও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কমিটিকে ৩০ দিনের মধ্যে অন্তর্র্বতীকালীন রিপোর্ট এবং ৭৫ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। কমিটি চাইলে বিশেষজ্ঞদের সেবা নিতে পারবে। সরকার প্রয়োজনে কমিটিতে অতিরিক্ত সদস্যও নিয়োগ করতে পারবে। কমিটির সভা বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন অথবা কমিটির আহ্বায়কের নির্ধারিত স্থানে অনুষ্ঠিত হবে।