রাষ্ট্রপতি দয়ালু মানুষ, তিনি বেগম জিয়ার দণ্ড মওফুক করতে পারেন–হানিফ

স্টাফ রিপোটারঃ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এমপি বলেছেন, বিএনপি নেতারা বেগম জিয়াকে বিদেশ পাঠাতে সকাল-বিকাল অযৌক্তিক দাবি তুলে যাচ্ছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির বিদেশে চিকিৎসা দেশের আইনের মধ্যে পড়ে না। দণ্ড স্থগিত অবস্থায় কেউ দেশের বাইরে যেতে পারে না। একমাত্র দণ্ড মওকুফ হলে তিনি বিদেশে যেতে পারেন। দোষ শিকার করে রাষ্টপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ আছে। রাষ্ট্রের অভিভাবক দয়ালু মানুষ। তিনি চাইলে ক্ষমা করে দিতে পারেন।

আজ বৃহস্পতিবার (২ ডিসেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে “পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গণমাধ্যম: ভূমিকা ও সংকট” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে বিবার্তা২৪ডটনেট ও জাগরণ টিভি।

গোলটেবিল বৈঠকে বিবার্তা সম্পাদক বাণী ইয়াসমিন হাসির সভাপতিত্বে জাগরণ আইপি টিভির প্রধান সম্পাদক এফএম শাহীনের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন বৈশাখী টেলিভিশনের এই প্রধান বার্তা সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, আজকের পত্রিকারসম্পাদক গোলাম রহমান, কলামিস্ট ও বিশিষ্ট সাংবাদিক স্বদেশ রায়, ডিবিসি নিউজ সম্পাদক প্রণব সাহা, ঢাকা পোস্টের সম্পাদক মহিউদ্দিন সরকার, নিউজ টোয়েন্টিফোর টিভির যুগ্ম বার্তা সম্পাদক এবং ডব্লিউজেএনবির সমন্বয়ক আঙ্গুর নাহার মন্টি প্রমুখ।

বৈঠকে হানিফ বলেন, ২০০৭ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের টাকা আত্মসাতের কারণে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মামলা হলো। বিএনপির বড় বড় আইনজীবীরা তার জন্য লড়েছেন। সন্দেহাতিতভাবে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে দণ্ড দিয়েছেন। নৈতিক স্খলনের কারণে তার শাস্তি হয়েছে।

মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, বাংলাদেশ গণমাধ্যম সবচেয়ে বেশি স্বাধীন এবং তারা পুরোপুরি স্বাধীনতা ভোগ করছে। দেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে টকশো, অনুষ্ঠানে আলোচকরা কোনো ধরনের সেন্সর ছাড়া সরকারের কর্মকাণ্ডের যথেচ্ছা সমালোচনা করেন। এ ধরনের স্বাধীন মতপ্রকাশে সরকার কখনো হস্তক্ষেপ করে না, কোনো ধরনের বাধার সৃষ্টি করে না।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, জনগণের ভরসার এখনও শেষ ঠিকানা গণমাধ্যম। এটা জাতির জন্য আয়নাস্বরূপ। যে আয়নায় ভেসে ওঠে জাতির ও দেশের প্রতিচ্ছবি। এই প্রতিচ্ছবি যারা ফুটিয়ে তুলেন তারা কেমন আছেন? প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে তাদের সাংবাদিকতা করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও সংকট নিরসনে গণমাধ্যমের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা হওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, গণমাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের লক্ষ্য থাকে ব্যবসা করা। গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা তাদের নিজেদের কর্মস্থলে চাকরির অনিশ্চয়তায় ভোগেন। গণমাধ্যমের আয়ের উৎস বিজ্ঞাপন। দেশের বিজ্ঞাপনের বাজারের সাথে মিলিয়ে গণমাধ্যমের সংখ্যা থাকলে সংকট হতো না। লাইসেন্স দেয়া এবং নেয়ার ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের বাজার হিসেব করে দেয়া হলে বেতন, কর্মচারী সংকট তৈরি হতো না। গণমাধ্যম নীতিমালা হওয়া জরুরি। ছোট দেশে ৩০টির বেশি টেলিভিশন, কয়েকশ দৈনিক পত্রিকা আছে। এসবের ধারণক্ষমতা আছে কি-না ভাববার বিষয়। গণমাধ্যমের করপোরেট কালচার ডেভেলপ করা দরকার।

গোলটেবিল আলোচনা সভায় কি-নোট স্পিকারের বক্তব্যে জিটিভির প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যম নাগরিকের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখে, তথ্য জগতে তার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে। মানুষ জানতে চায়, মানুষ সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চায়। আর সেখানেই গণমাধ্যমের ভূমিকা। নীতিনির্ধারক, আইনসভাসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ ঘটাতে ভূমিকা রাখে গণমাধ্যম।

আজকের পত্রিকার সম্পাদক গোলাম রহমান বলেন, আমরা অনেক কিছুই বলছি, লিখছি কিন্তু আমরা অনেক কিছুই প্রকাশ করছি না। এর মানে হচ্ছে আমাদের নিজেদের ভেতরেই অনেক ধরনের স্ববিরোধীতা আছে। আমরা নিজেরাই অনেক সময় বাংলাদেশ বেতার বা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মতো গণমাধ্যমের সমালোচনা করি, যখন দেখি গণমাধ্যম জনমুখী ভূমিকা রাখছে না।

সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির যুগে যেমন অনেক বেশি তথ্যবহুল সংবাদ পরিবেশন করা যায়, ঠিক তেমনি এর মাধ্যমে খুব দ্রুত গুজবও ছড়িয়ে দেয়া যায়। আইপি টিভির একসময় অবাধ বিচরণ ছিল, যাচ্ছেতাই মনগড়া সংবাদ পরিবেশন করতো তারা। তবে আশার কথা হচ্ছে সম্প্রতি সরকার সেটারও নীতিমালা দিয়েছেন।

ডিবিসি নিউজ সম্পাদক প্রণব সাহা বলেছেন, সাংবাদিকদের তথ্য প্রবাহের জন্য প্রতিদিনই পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। সাংবাদিকরা হচ্ছেন কাঁটা বিছানো পথে হাঁটা মানুষ। প্রতিনিয়ত তাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমাদের গণমাধ্যমের সংকট শেষ হবে না, কিন্তু আমাদের চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের সাংবাদিকদের মনে রাখতে হবে, আমি যখন সাংবাদিকতা করছি তখন দেশের ও সমাজের খারাপ দেখলে আমাদের সমালোচনা করতেই হবে। আমরা সমালোচনা না করলে এগুলো শোধরাবে কী করে?

দেশের ডিজিটাল প্লাটফরম এগিয়ে নিতে ফেসবুক এবং ইউটিউবের একচেটিয়া মনোপলি ব্যবসা বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা পোস্টের সম্পাদক মহিউদ্দিন সরকার।

তিনি বলেন, দেশে ফেসবুক এবং ইউটিবের এ একচেটিয়া মনোপলি ব্যবসা বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে যদি কোনো উদ্যোগ না নেয়া হয় তাহলে দেশের ডিজিটাল মিডিয়া এগোতে পারবে না।

নিউজ ২৪ এর যুগ্ম বার্তা সম্পাদক আঙ্গুর নাহার মন্টি বলেন, মূলধারার সাংবাদিকতার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে সোশ্যাল মিডিয়া। বর্তমানে গণমাধ্যম নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় যে উদ্বেগ, সেটা হচ্ছে সাংবাদিকতা ও সংবাদকর্মীরা একেবারেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আস্থার সেই জায়গাটা সাধারণ মানুষের কাছে আর নেই।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বিবার্তা২৪ডটনেট সম্পাদক বাণী ইয়াসমিন হাসি বলেন, আমি দীর্ঘ ১০ বছর ধরে একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক, একইসাথে এটার মালিকও। কাজেই সাংবাদিকতাকে দুইদিক থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। আমার মতে, সাংবাদিকতা হচ্ছে থ্যাংকলেস জব। এখানে ভালো কাজ করলে কেউ ধন্যবাদ দিবে না। আবার নাম আগে-পরের জন্যও অনেকে চার্জ করার জন্য বসে থাকে। এ সেক্টরে সংকট রয়েছে, সংকট থাকবে। তবে এটাকে সম্ভাবনায় পরিণত করতে হবে। আর যদি এ পেশার চাপের কথা বলি, তাহলে এ চাপটা সরকার ও রাজনৈতিক দল থেকে না, এটা নিজের ভেতর থেকে আসে।

গোলটেবিল আলোচনা সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী যুব মহিলা লীগের সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট কুহেলী কুদ্দুস মুক্তি, মাহমুদ সালাউদ্দিন চৌধুরী, হাবিবুর রহমান রোমেল,নাজমুল হক সিদ্দিক, বরিকুল ইসলাম বাঁধন, এস এম রাকিবুল হাসান, রবিউল রূপমসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার বিশিষ্টজন।