রাষ্ট্রধর্মে বিশ্বাসকারীরা ইসলামে বিভ্রান্তকারী ও বিপথগামী

71

খাজা নুর ইসলামঃ
রাষ্ট্রধর্ম ইসলামে যারা বিশ্বাস করেন তারা বিভ্রান্ত। তারা আসলে চূড়ান্ত অর্থে এক ধরনের পৌত্তলিকতায় আস্থাশীলদের মতোই। নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক। পরম করুণাময় আল্লাহ তাদের ক্ষমা করুন এবং সঠিক জ্ঞান দান করুন।
কীভাবে তারা পৌত্তলিকতায় আস্থাশালীদের মতো, সে কথায় আসি। পৌত্তলিকতা হচ্ছে কোনো নিষ্প্রাণ বস্তুকে প্রাণবান মনে করা। সেটিকে আল্লাহর প্রতিরূপ বা প্রতিনিধি হিসেবে কল্পনা করা। কোনো জড় বস্তুকে ভুল-বিশ্বাস ও ভুল-বিবেচনার জায়গা থেকে প্রাণ-প্রতিষ্ঠার চেষ্টার নাম পৌত্তলিকতা। যারা মনে করছেন, সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম বহাল থাকার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রে ধর্মপ্রতিষ্ঠা হয়ে গেল তাদের ভাবনাটা দেবদেবীর অধিষ্ঠান, বোধন, উপনয়নের মতো সোজা মনে হচ্ছে। সংবিধান প্রণয়ন যেমন কোনো রাষ্ট্রের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ তেমনি সংবিধানে কোনো বিধি সংযোজনও একটা প্রাথমিক কাজ। পরের কাজ হচ্ছে এই বিধি মেনে চলা। আমাদের এখানে কী সংবিধান কী ধর্ম– সবক্ষেত্রে মানামানির চিত্র তো খুব করুণ। একটি অনৈসলামিক রাষ্ট্রের অনৈসলামিক বিচারবিভাগ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল করে কীভাবে? আর রাষ্ট্র ও বিচারবিভাগ যদি ইসলামি হয়ে থাকে তবে আর ঘটা করে রাষ্ট্রধর্ম বহালের প্রয়োজনই বা কী? যারা তা বহাল করেছেন তারা কীভাবে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল করার যথাযথ কর্তৃপক্ষ? রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের সঙ্গে বিদ্যমান রাষ্ট্রের ধর্মাধর্ম, নীতি, বৈশিষ্ট্য সামঞ্জস্যপূর্ণ কি-না? যে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম বহাল থাকল সেটির সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ কি-না? শুধু তর্কের খাতিরে হলেও এসব প্রশ্ন তোলা যায়।
আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান– এমনকি যারা একেবারে অশিক্ষিত– তারাও জানেন পৌত্তলিকতা কী। মূর্তিপূজা যে পৌত্তলিকতা, সেটির বিরুদ্ধেই তো তাদের প্রধান অবস্থান। মক্কায় পবিত্র কাবা শরিফে স্থাপিত ৩৬০টির মতো দেবদেবীর মূর্তি অপসারণের মধ্য দিয়েই ইসলামের যাত্রা শুরু। প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) তাঁর কোনো ছবি বা চিত্র আঁকতে দেননি। যে কারণে ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে যখন তাঁর ছবি বা কার্টুন আঁকার চেষ্টা করে প্রিয় নবীর অবমাননার চেষ্টা করা হয় তখন সারা দুনিয়ার মুসলিম উম্মাহ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা এই ধরনের অপচেষ্টাকে প্রতিহত করা ইমানি দায়িত্ব মনে করেন। আবার এই ‍মুসলিমরাই কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক প্রয়োজনে এবং দৈনন্দিন কাজকর্মের ও আনন্দের জায়গা থেকে ছবি ও ভিডিও প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। পৌত্তলিকতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা ও কাণ্ডজ্ঞানের জায়গা থেকেই এটিকে তাদের এখন আর ইসলাম-বিরোধী মনে হচ্ছে না।
মার্কিন সুফি ও পণ্ডিত মার্টিন লিংকসের (আবু বকর সিরাজ আদ দিন নামেও পরিচিত) লেখা হযরত মুহম্মদ (সা.) এর জীবনীগ্রন্থ ‘মুহম্মদ: হিজ লাইফ বেজড অন আর্লিয়েস্ট সোর্সেস’-এ ইমাম আল ওয়াকিদির কিতাব আল-মাঘাজি এবং আল আজরাকির ‘আকবর মক্কা’ গ্রন্থের সূত্র উল্লেখ করে বলেছেন, পবিত্র কাবায় ইব্রাহিম (আ.) এবং ঈসা (আ.) ও তাঁর মায়ের চিত্র ছিল। হযরত মুহম্মদ এগুলো নষ্ট ও অসম্মান করতে নিষেধ করেছিলেন। আল ওয়াকিদির হাদিস সংকলন মুসলিমদের কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়, ইমাম শাফি সেগুলোকে মিথ্যা বলে খারিজ করে দিয়েছেন। (ইংরেজিতে লেখা নবীর জীবনীগ্রন্থের মধ্যে এটিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হিসেবে স্বীকৃত) আল ওয়াকিদিকে ঐতিহাসিক হিসেবে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়। উল্লিখিত এই বিবরণের সত্য ভিত্তি যদি থেকেও থাকে, তবে তা– পৌত্তলিকতার প্রতি নমনীয়তা নয়– ইব্রাহিম, ঈসা ও মরিয়মের প্রতি হযরত মুহম্মদ (সা.) এর প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন।
রাষ্ট্রও একটি নিষ্প্রাণ, জড় বস্তু, একটি ধারণা মাত্র। কিংবা সেই ধারণার ভিত্তিতে গড়ে উঠা একটি কল্পনা মাত্র। এই বিমূর্ত ধারণা বা কল্পনার মাথায় রাষ্ট্রধর্মের টুপি পরানোর চেষ্টা, সেটির গায়ে ধর্মীয় পোশাক পরানোর চেষ্টা সম্পূর্ণ ইসলাম পরিপন্থি একটি গর্হিত কাজ। খড়ের কাঠামোর ওপর মাটির প্রলেপ দিয়ে তার গায়ে পোশাক পরানো আর একটি ধারণার গায়ে ইসলামের পোশাক পরানোর মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। ইসলাম কোনোভাবেই কোনো বিমূর্ত ধারণাকে মূর্ত করেনি, এমনকি শয়তানেরও প্রতিরূপ নির্মাণ করেনি। রাষ্ট্রের বিমূর্ত ধারণাকে ধর্মের টুপি পরানো সরাসরি শিরক না-কি পরোক্ষ শিরক তা বলতে পারবেন অভিজ্ঞ ও বিবেকবান আলেম-সমাজ। অনেকে হয়ত বলবেন, জনসমষ্টি, ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্বের ধ্রুপদি ধারণার যে রাষ্ট্র তাঁর সঙ্গে হযরত মুহম্মদ (সা.) এর সময়ের মক্কা ও মদিনার তো মিল আছে। সেই সময়ে মুসলিম উম্মাহকে পরিচালনার জন্য যেসব নীতি– সেসবের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মদিনা সনদ– তাতেও কিন্তু রাষ্ট্রধর্মের কথা বলা হয়নি, প্রত্যেক গোষ্ঠির ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ওপরই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যে জাতি গঠনের কথা বলা হয়েছে সেটিও নানা ধর্মের লোকদের নিয়ে একটি সাধারণ জাতি। যারা সেগুলোকে সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে ব্যাখ্যা করেন তারা আসলে ইসলামকে সংকীর্ণ করার অপচেষ্টা করেন। মদিনা সনদ ছিল ইহুদি ও খ্রিষ্টান ও প্যাগানদের নিয়ে একত্রে ভাতৃত্ববোধের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সনদ। বিশ্বের যে অংশে আমরা বাস করি, আমাদের পাশের রাষ্ট্রগুলোতে যারা বসবাস করে, আমাদের ও তাদের এবং বিশ্বের অন্য সবাইকে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে হলে সবার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ধর্মকে আগের চেয়ে আরো বেশি গুরুত্ব দিয়ে, আগের চেয়ে আরো বেশি উদার ও সহনশীলভাবে নিতে হবে। বুঝতে হবে যে তখনকার দিনে ভারত থেকে মক্কা বা মদিনা আক্রমণ করা সম্ভব ছিল না। এখন সম্ভব। বুঝতে হবে যে মক্কা-মদিনার বাস্তবতা ও ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মিসর, ইরান, তুরস্কের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি যেমন এক নয়, তেমনি এক নয় বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিও।
প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ (সা.) রাষ্ট্রকে কখনোই ইসলামের বিষয় ভাবতেন না। তিনি রাষ্ট্রে ন্যায্যতা নিশ্চিতের কথা ভাবতেন, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা ভাবতেন। সেই অনুযায়ী বিধিবিধান প্রণয়ন করতেন। পবিত্র কোরানের কোথাও রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের কথা বলা হয়নি। হাদিসের কোথাও সে ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। রাষ্ট্র ও রাজনীতির ধারণা যে ইসলামপূর্ব যুগে বিশ্বে ছিল না তা নয়। প্রিয় নবীর যে তৎকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি, রাষ্ট্র ও রাজনীতি সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না, তিনি যে বিশ্বের ইতিহাস এবং তৎকালীন বিশ্ব প্রেক্ষাপট জানতেন না তা ভাবা মূর্খামি ও ঔদ্ধত্য।
রাষ্ট্রধর্মের বিষয়টি ইসলামপূর্ব সময় তো অবশ্যই; এমনকি প্রাচীন শাসকদের সময়েও ছিল। যারা বিশ্ব ইতিহাস সম্পর্কে সামান্য খোঁজখবর রাখেন তাদের কাছে সেসব রাষ্ট্র ও শাসকগোষ্ঠির নজির তুলে ধরা বাহুল্য মনে হবে। ইসলামপূর্ব যুগে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রধর্মের মতো বিষয়গুলো নিয়ে প্রবল চর্চা থাকলেও মহাজ্ঞানী হযরত মুহম্মদ (সা.) কেন সেই পথে গেলেন না? কেন তিনি ইসলামি রাষ্ট্রবিধানের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে ইসলামি জীবনবিধানের ওপর গুরুত্ব দিলেন? এসব বিষয় ভুলে গেলে আমরা ইসলামের মূল পথ থেকেই সরে যাব। (এখানে বলে রাখি। প্রচলিত বলে আমিও ‘ইসলামপূর্ব যুগ’ কথাটি বলছি। প্রকৃতপক্ষে ‘ইসলামপূর্ব যুগ’ বলে কিছু নেই। আদম আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেই তো ইসলাম শুরু, হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁরই ধারাবাহিকতা।)
রাষ্ট্র বা জাতি বা মুসলিম উম্মাহকে পরিচালিত করার ব্যাপারে যেসব বিধিবিধান কোরান ও হাদিসে আমরা দেখতে পাই সেগুলো মোটেও ধর্মভিত্তিক নয়। সেসব বিধিবিধান ধর্মনিরপেক্ষ ও ন্যায্যতাভিত্তিক। খোলাফায়ে রাশেদিনও সেই মতো ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। রাষ্ট্র বা রাজনীতিকে ইসলামিকরণ করার চেষ্টা তারা করেননি। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা যদি হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর প্রধান আগ্রহের বিষয় হত, তাহলে তো তিনি খুব সহজেই তা করতে পারতেন। এক আল্লাহর উপাসনা করা এবং ন্যায়পরায়ণ হওয়ার তিনি মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ও তাঁর সাহাবিরা এজন্য যত অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করেছেন, যত ত্যাগ স্বীকার করেছেন, রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠা বা শাসক হয়ে উঠার জন্য সেসবের দরকারই ছিল না। কোরাইশরা তো তাকে নেতৃত্বও সেধেছিল। তিনি মানুষকে ন্যায়পরায়ণ ও ইসলামে দীক্ষিত করার চেয়ে চোর, বাটপার, সুবিধাভোগী, দস্যু, লুটেরা ও বিভিন্ন কওমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়ে রাষ্ট্র বা শাসন প্রতিষ্ঠা করে ফেললেই পারতেন। তাঁর সেই দক্ষতাও ছিল। সেই প্রক্রিয়ায় তিনি আলেকজান্দার বা নেপোলিয়নের চেয়ে বড় সাম্রাজ্যও প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। এমনকি, তেমন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেও তিনি লোকজনকে ইসলামের দাওয়াত দিতে পারতেন, তাতে অনেক লোকজনও জুটত।
ইসলামি রাষ্ট্র বা অন্য কোনো রাষ্ট্র কায়েমের চিন্তা বা কোনো শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চিন্তা যদি আমাদের প্রিয় নবীর থাকত তবে তাঁর মৃত্যুর পরপরই মুসলিম কওমের নেতৃত্ব (প্রথম খলিফা নির্বাচন) নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা, অসন্তোষ ও সময়ক্ষেপণ হত না। পাঠককে মনে করিয়ে দিতে চাই, আমরা যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর আস্থা রেখে স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর প্রথম নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে ফিরেছিলাম, সেই রকম তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা কিন্তু প্রিয় নবীর উফাতের পর মুসলিমরা শুরু করেছিলেন। দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.) ছয়জন সাহাবিকে নিয়ে সেই তত্ত্বাবধায়ক গঠন করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তৃতীয় খলিফা নির্বাচিত হওয়ার আগপর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক খলিফা কে থাকবেন তা-ও নির্ধারিত ছিল। ওমর (রা.) নিহত হওয়ার পর সুয়াইব আর রুমি (রা.) তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বও পালন করেছিলেন।
খোলাফায়ে রাশেদিনের সময়ের শাসনব্যবস্থায়ও রাষ্ট্র পরিচালনার দূরদর্শিতা, নেতৃত্বের গুণ, সব গোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও ন্যায়পরায়ণতার মাপকাঠিতেই খলিফা বেছে নেওয়া হয়েছে। বাছাইয়ের এই পদ্ধতি– কী ইসলাম, কী অনৈসলামিক অঞ্চল– সারা বিশ্বে সময়ই একই রকম। যে দশজনকে হযরত মুহম্মদ বেহেস্তবাসী হবেন বলে আগাম সুসংবাদ দিয়েছিলেন তাদের সবাইকে কিন্তু খলিফা হিসেবে তৎকালীন মুসলিম জনগোষ্ঠি মেনে নেননি। ওপরের গুণাবলির বিবেচনায়ই তারা প্রথমে আবু বকর (রা.) এবং পরে পর্যায়ক্রমে ওমর (রা.) ওসমান (রা.) ও আলী (রা.)-কে বেছে নিয়েছেন। এইখানেই আছে ইসলামের নেতৃত্ব বাছাইয়ে ধর্মনিরক্ষেতার নীতি ও গণতন্ত্র।
রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বা ইসলামি রাষ্ট্রের ধারণা খুব প্রাচীন নয়। খোলাফায়ে রাশেদিনের গণতান্ত্রিক সময় তো নয়ই, পরবর্তী সময়ে ইসলামের নামে যেসব রাজতান্ত্রিক শাসন চলেছে একেবারে বিশ শতকের গোড়া পর্যন্ত, কোথাও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বা ইসলামি রাষ্ট্রের কথা বলে পুরোপুরিভাবে কেউ শাসন করেননি। আংশিক ব্যবহারের জায়গায় থেকেছেন সাধারণ মুসলিম প্রজাকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য আর ইসলামের দোহাই দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য। মুসলিম সম্প্রদায়ের এই যে হাজার বছরের শাসন তার মধ্যে কেউই সামগ্রিকভাবে ইসলামের আওতায় রাষ্ট্র পরিচালনা করলেন না, করতে পারলেন না, কেন? এখন বিশ শতক থেকে আমরা কেন তবে ইসলামি শাসনের কথা শুনছি? রাষ্ট্রধর্মের তোড়জোর দেখছি কেন? ইসলামি রাষ্ট্রের কথা বলে পাইকারি হারে খুন করতে দেখছি কেন? যেখানে ইসলামি রাষ্ট্রের কথা বলছে আইএস সেখানে তো মুসলিম শাসকরাই শাসন করেছেন। তারা কমবেশি রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বা ইসলামি রাষ্ট্রের নামেই তো শাসন করেছেন, করছেন। যারা তাদের খারিজ করেন তাদের কি আমাদের সত্যিকারের ইসলামপন্থি মনে হয়? তাদের কার্যক্রম, বিধি-ব্যবস্থা কি ইসলামের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে? ইসলামি রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের নামে মুসলিমদের ধোঁকা দিয়ে দুনিয়ায় জান্নাতি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে জাহান্নাম কায়েমের চেষ্টা ছাড়া তাদের তৎপরতাকে তো আর কিছুই মনে হয় না। হযরত মুহম্মদ (সা.) এর পর থেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অভ্যন্তরে ক্ষমতা ও শাসন নিয়ে যে পরিমাণ খুনোখুনি ও হানাহানি হয়েছে তার হিসেব নিতে গেলে তো যে কোনো সাধারণ মুসলিমের মাথা খারাপ হয়ে যাবার জোগাড় হয়। ক্ষমতা ও শাসন কেন্দ্রিক এই খুনোখুনি ও হানাহানির সবচেয়ে হৃদয় বিদারক ঘটনা যে কারবালা প্রান্তরে ঘটেছিল, প্রিয় নবীর দৌহিত্ররা যেখানে প্রাণ দিয়েছিলেন, তা থেকেও তো পরবর্তী সময়ের মুসলিম শাসকরা শিক্ষা নেননি। বরং রক্তপাত ও হানাহানি, পবিত্র ইসলাম ধর্মের নাম ভাঙিয়ে রাজনীতি, শাসন ও ক্ষমতা কুক্ষীগত রাখার চেষ্টা ক্রমেই বেড়েছে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) আব্বাসীয় শাসকদের নির্যাতনে প্রাণ দিয়েছেন। যে বাদশাহদের প্রধান বিচারপতির পদ প্রত্যাখ্যান করায় তিনি জেল-জুলুম ও হত্যার শিকার হলেন, সেই বাদশাহরা তাঁরই শিষ্য আবু ইউসুফ (রহ.)-কে প্রধান বিচারপতির (প্রধান কাজি) দায়িত্ব দিলেন। আবু ইউসুফই (রহ.) আবার হানাফি মজহাবের প্রভাবশালী ব্যাখ্যাতা। হানাফি মজহাবের মুসলিমদের মধ্যে আবু ইউসুফের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। তাদের কাছে আব্বাসীয় খলিফাদের (আসলে বাদশাহ) গ্রহণযোগ্যতাও কম নয়। এক্ষেত্রে বাদশাহ হারুন আল রশিদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আধুনিক জামানায় এসে একই রকম ঘটনা আমরা দেখি আজকের সৌদি রাজবংশের গোড়াপত্তনকারী ইবনে সৌদের সময়ে। তিনি হযরত মুহম্মদ (সা.) রওজা মোবারক ধ্বংসের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বিশ্ব ও মুসলিম উম্মাহর প্রতিবাদের মুখে তিনি সে পদক্ষেপ থেকে সরে আসেন। তাঁর হাতে নিশ্চিহ্ন হয়েছে হযরত খাদিজাতুল কোবরার (রা.) কবরসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি নিদর্শন। তিনি ও তাঁর বংশের শাসকরা প্রকৃত ইসলামপন্থি দাবিদার সালাফিদের (ওয়াহাবি মতবাদ) শক্তিশালী করেছেন শাসন কাজে ইসলামের অপব্যবহারের স্বার্থে। আব্বাসীয় ও সৌদি শাসকদের যেসব কথা এখানে উল্লেখ করলাম দেড় হাজার বছরের মুসলিম শাসকদের এই রকম শত শত ঘটনা আছে।
সব কথা খুলে বলা যায় না। ইসলামের অনেক ঘটনার উল্লেখ ও বিশ্লেষণকে অনেকে স্বাভাবিকভাবে নিতেও পারেন না। কিন্তু তারা আবু হানিফাকেও মানেন, ঘাতক আব্বাসীয় শাসকদেরও সম্মান ও সমর্থন করেন, আবু ইউসুফকেও সম্মান ও সমর্থন করেন। একইভাবে তারা সৌদি রাজবংশকেও সম্মান ও সমর্থন করেন, খাদিজাকেও সম্মান ও সমর্থন করেন, আবার মোহাম্মদ ইবনে আবদাল ওয়াহাবকেও সম্মান ও সমর্থন করেন। এসব শাসকরা যে সঠিক ছিলেন না তা জানার জন্য বিস্তর ইতিহাস জানার দরকার নেই। তাদের স্ত্রীদের সংখ্যার দিকে তাকালেই বোঝা যায়– শাসনের জায়গা থেকে তো দূরের কথা– ব্যক্তিগত জীবনে কতটুকু ইসলাম তারা মানতেন।
আমাদের বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী? রাষ্ট্রধর্মের ধুয়া তোলা স্বৈরাচারী এরশাদের প্রহসনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন (১৯৮৬) যখন বড় দলগুলো বর্জন করল তখন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সম্মানিত হাফেজ্জি হুজুর তাঁর সঙ্গে নির্বাচনে গেলেন। পরে যেসব দল এরশাদ-বিরোধী অবস্থান নিল তাদের সঙ্গে জামায়াতসহ কিছু ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকল। তারা এরশাদের রাষ্ট্রধর্মের ধোঁকাবাজির বিরোধিতা করল। এখন এসেও আমরা দেখছি, কিছু ইসলামি দল সরকারের পক্ষে আর কিছু ইসলামি দল সরকার-বিরোধীদের পক্ষে। একই ইসলামের দাবিদার, একই আল্লাহ-রসুলের নাম করে আলেমরা এইভাবে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিচ্ছেন। আমরা দেখছি, ২০১৩ সালে সরকারের বিরুদ্ধে থাকা আলেমদের একটি পক্ষ মতিঝিলের শাপলা চত্বরে নিরীহ মুসলিম ও তালেবুল এলেমদের জড়ো করে সরকারের সঙ্গে আপোসরফায় যান। সাধারণ মুসলিমরা রাষ্ট্রধর্মের জন্য এরশাদকেও সম্মান ও সমর্থন করেন, সরকারের পক্ষের আলেমদেরও সম্মান ও সমর্থন করেন, আবার বিপক্ষের আলেমদেরও সম্মান ও সমর্থন করেন। সম্মানে তেমন সমস্যা নেই, সমস্যা তৈরি হয় মান্য ও সমর্থন করায়। মান্য ও সমর্থন করায় দুই পক্ষের রাজনৈতিক আলেমরাই সাধারণ মুসলিমদের বর্তমান ও আগামীর ক্ষমতাসীন দলের কাছে আল্লাহ-রসুলের নামে উৎসর্গ করার বা বিনেমাগনায় বেচে দেওয়ার এবং ইসলামের অবমাননা করার সুযোগ পান।
সাধারণ মুসলমানের এই যে সঠিক-বেঠিক সবকিছুকে সমানভাবে নেওয়া এর মধ্যেই সমস্যা; সমাধানও এর মধ্যেই। হয় তাদের সঠিক থেকে বেঠিক বেছে নিতে হবে, না হয় ধর্মকে রাজনীতির বাইরে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায় রাখতে হবে। শাসক যদি কুশাসক হন– তিনি যে ধর্মেরই হোন– তাতে ধর্মের ক্ষতি বিনে কিছু হয় না। এমনকি সুশাসকের হাতেও ধর্ম নিরাপদ নয়, টিকে থাকার জন্য সে তা অপব্যবহারেও দ্বিধা করেন না। ইসলামের দেড় হাজার বছরের রক্তাক্ত ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, রাষ্ট্র ও শাসকের হাতে ধর্ম তুলে দেওয়ার চেয়ে বোকামি আর কিছু নেই। এতে করে সাধারণ মুসলিম হিসেবে আপনার-আমার যে দায়িত্ব আছে সেটি এড়ানো যায়, কিন্তু ধর্মের ক্ষতি এড়ানো যায় না। প্রকারান্তরে তা মুসলিম উম্মাহরই ক্ষতি।
রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের কথা বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন, তিউনিসিয়া, আফগানিস্তান, আলজেরিয়া, ব্রুনেই, মিসর, জর্দান, মালয়েশিয়া, মৌরিতানিয়া, কাতার, সৌদি আরব, ইরান ও ওমানসহ আরো বেশকিছু দেশের সংবিধানে বলা আছে। এসব দেশের যেসব শাসকরা সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মের বিষয়টি ঢুকিয়েছেন নৈতিকতা, ধার্মিকতা ও চারত্রিক গুণে তাদের অধিকাংশই আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মের বিধি ঢোকানো এরশাদের মতোই। বাংলাদেশের এরশাদ বা পাকিস্তানের জিয়াউল হকের মতো অপশাসকরা ব্যক্তিগত জীবনে কিংবা রাষ্ট্রপরিচালনায় কতটা সৎ ও ইসলাম অনুসারী তা আমরা জানি। অন্যদের কথা না জানলেও তাদের দেখেও অন্যদের চরিত্রও আন্দাজ করতে পারি। (পাকিস্তান সংবিধানে ১৯৫৬ সাল থেকে ইসলামি রিপাবলিক ছিল। এটিই বিশ্বে প্রথম এই ধরনের রাষ্ট্র। এটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ ও জনতন্ত্রের সঙ্গে প্রকৃত খিলাফতের আপোসরফা বলে ওই সময়ে ইসলামি চিন্তাবিদদের সমালোচনার বিষয় ছিল। ক্ষমতা কুক্ষীগত রাখতে পাকিস্তানে ইসলামিকরণে জিয়াউল হক রেখেছেন নজিরবিহীন ভূমিকা। সেই ইসলামিকরণ যতটা নামে, ততটা কিন্তু কাজে নয়, যতটা পরামর্শ দানে ততটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় নয়।) রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের মতোই হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েও চলছে বেশকিছু দেশ। তার মানে কী– এসব দেশে অধর্মের কাজ হচ্ছে না বা আগের চেয়ে অধর্মের কাজ কমেছে? বানরকে রুটি ভাগ করতে দিলে সে শুধু রুটিই আত্মসাৎ করে; আটার গুদাম কিংবা গমের ক্ষেত নিয়ে টান দেয় না। শাসক বা রাষ্ট্রের হাতে ধর্ম তুলে দিলে তারা ধর্মকে আত্মসাৎ ও অপব্যবহার তো করেই ঈশ্বর ও ধর্মের নামে নাফরমানি করার অফুরন্ত সুযোগ পান এবং ঈশ্বরকে নিজের ইচ্ছায় চালানোর মতো দুঃসাহস ও শঠতা দেখান।
সারা দুনিয়ায় পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম কিংবা ইসলামি রাষ্ট্রের ধারণা খুব শক্তিশালী হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে চার্চের আধিপত্য দেখে সেই অনুসারে মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে এই ধারণাকে এক ধরনের ইসলামি আধুনিকতাবাদীরা প্রয়োগ করতে চেয়েছেন। তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইউরোপীয় ধ্যানধারণায় উদ্বুদ্ধ। ইসরায়েলের মতো ইহুদি রাষ্ট্র দেখে তাদের মনে হয়েছে আমাদেরও ইসলামি রাষ্ট্র দরকার। ভ্যাটিকান সিটি কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চার্চের আধিপত্য দেখে তাদের মাথায় রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মীয় রাষ্ট্রের চিন্তা বলিষ্ঠ হয়েছে এবং সে অনুযায়ী তরিকা দিয়েছেন। তারা এক ধরনের আধুনিকতাবাদী হলেও ন্যায়বাদী ইসলামের অনুসারী নন, প্রকৃত ইসলামপন্থি নন, ইসলামের সত্যিকারের কল্যাণকারী নন, বরং তাদের বলা যায় নব্য ইসলামপন্থি। যারা তাদের অনুসারী তাদের চেতনাও ইসলামের মূল চেতনা নয়। তারা ইসলামের নামে বিভ্রান্তকারী ও বিপথগামী।
গ্রিক, ল্যাটিন, রোমান বা অন্য কোনো প্রাচীন সভ্যতা, শাসন পদ্ধতি ও দর্শন তথা পশ্চিমা ব্যবস্থার অনুসরণে হযরত মোহাম্মদ (সা.) ইসলামকে সাজাননি, সাজিয়েছেন আল্লাহর নিদের্শিত পন্থায়। আল্লাহর নির্দেশিত পন্থার দায়িত্ব আল্লাহর প্রতিনিধি ছাড়া আর কাউকে দিতে হলে সে সঠিক ব্যক্তি কি না তা আগে জানতে হবে। ইসলামের দেড় হাজার বছরে এত এত বিভ্রান্তি, এত এত মতপথের মধ্যে এখন আর সাধারণ মুসলিমের পক্ষে বোঝাই সম্ভব নয় যে কে সঠিক আর বেঠিক। তা যদি বোঝা সম্ভব না হয়, তবে এইচ এম এরশাদ, খালেদা জিয়া কিংবা শেখ হাসিনার হাতে ইসলামের দায়িত্ব দেওয়া কতটুকু বুদ্ধিবান ও মুমিনের কাজ?
রাষ্ট্রধর্ম ইসলামপন্থি, ইসলামি রাষ্ট্রপন্থি কিংবা ইসলামি গণতন্ত্রপন্থি– এরা সবাই পশ্চিমের আধুনিকতার পরোক্ষ অনুসারী। পশ্চিমা বিশ্ব যেখানে ব্যর্থ, যেখানে সে আপোসকামী, যেখানে সে ভুল, সেখানেই আমাদের এই নব্য ইসলামপন্থি ও তাদের অনুসারীদের চোখ। তারা পশ্চিমা দুনিয়ার ব্যর্থতা, আপোস ও ভুলের অনুকরণ করতে চান। পশ্চিমা দুনিয়ার দানবের আদলে তারা দানব নির্মাণ করতে না পারলেও তার একটি ছায়া, প্রতিরূপ, মূর্তি বা ছায়ামূর্তি বানাতে চান। দানবের ছায়ামূর্তি দিয়ে তারা দানব ঠেকাতে চান। আমরা সাধারণ মুসলিমরা সিরাতুল মোস্তাকিমের রাস্তায় থেকে, আমাদের সাধারণ বোঝ-বিবেচনা ও কাণ্ডজ্ঞান থেকে, যতটুকু বুঝি তাতে আমাদের মন এসব তথাকথিত ইসলামপন্থিদের পক্ষে সায় দেয় না। তাদের এই ভুল ও বিভ্রমের দায় কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইসলামকে দূষিত করার দায় আমাদের মতো সাধারণ মুসলিমরা কেন নেব?