রামপালে পরোক্ষ অর্থায়নে বিশ্বব্যাংক

base_1475524071-1ছয়টি ব্যাংকের মাধ্যমে রামপাল কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। এ লক্ষ্যে ভারতের আইসিআইসিআই, এইচডিএফসি, আইডিএফসি, কটক মাহিন্দ্র, ইয়েস ও অ্যাক্সিস ব্যাংককে ৫২ কোটি ডলার জোগানও দিয়েছে আইএফসি। এর মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করছে বলে অভিযোগ তুলেছে ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল (আইডিআই) নামে একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন পরামর্শক সংস্থা।

এ অর্থায়নের মধ্য দিয়ে সংস্থাটি পরিবেশ দূষণকারী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন না করার অঙ্গীকারও ভঙ্গ করেছে বলে মনে করছে আইডিআই। কারণ ২০১৩ সালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কোনো ধরনের সহায়তা না করার ঘোষণা দেয় বিশ্বব্যাংক। ওই সময় সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়, হাতে কার্যকর বিকল্প উপায় থাকলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কোনো ধরনের অর্থায়ন তারা করবে না। কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ছয়টি ব্যাংকে আইএফসি তহবিল জোগান দিয়েছে ২০১৪ সাল পর্যন্ত।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা আইডিআই মূলত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে সুশাসন ও অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর বিষয় নিয়ে কাজ করে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন বিষয়ে সংস্থাটি বলছে, প্রথম দিকে বিশ্বব্যাংক প্রকল্পটিতে সরাসরি অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়েছিল। একই আগ্রহ দেখায় ফ্রান্সের তিনটি ব্যাংক ক্রেডিট এগ্রিকোল, বিএনপি পারিবাস ও সোসিয়েতে জেনারেলে। কিন্তু প্রকল্পটি ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে ব্যাংক তিনটি। রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে বিশ্বব্যাংকও। যদিও আইএফসির মাধ্যমে তহবিলের জোগান দিচ্ছে তারা।

আইডিআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড প্রেড এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আইএফসি যখন মধ্যস্থ পক্ষগুলোর মাধ্যমে অর্থায়ন করা প্রকল্পগুলোর সঙ্গে নিজের দূরত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, তখন প্রতিষ্ঠানটির প্রাতিবেশিক ও সামাজিক শর্তগুলোকে এসব ব্যাংক নির্লজ্জভাবে উপেক্ষা করে গেছে।’

প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টিও ‘ডিজাস্টার ফর আস অ্যান্ড দ্য প্লানেট: হাউ দি আইএফসি ইজ ফান্ডিং আ কোল বুম’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে আইডিআই। গতকাল প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের কোলঘেঁষে। বেশকিছু বিপন্ন প্রজাতির আবাসস্থল সুন্দরবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা। বায়ু ও পানি দূষণের মাধ্যমে সুন্দরবনের অস্তিত্ব হুমকির মুখে ঠেলে দেবে প্রকল্পটি। সুন্দরবনের ক্ষতির প্রভাব শুধু আশপাশ এলাকা নয়, গোটা বিশ্বের ওপর পড়বে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনেও এর বড় ভূমিকা থাকবে।

রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে সেখানকার প্রতিবেশের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করে ইউনেস্কোও। সরকারকে দেয়া এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশের যে অংশটিতে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে, সেটিকে বায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং স্থানটিও ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এতে। প্রতিবেদনে চার ধরনের ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো— বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, জাহাজ চলাচল বৃদ্ধি ও জাহাজের বর্জ্য এবং নদী খনন থেকে ক্ষতি, সর্বশেষ শিল্পায়ন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন-বিষয়ক সামগ্রিক ক্ষতি।

আইডিআইয়ের প্রতিবেদনের বিষয়ে আইএফসির মুখপাত্র ফ্রেডরিক জোনস বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, বৈশ্বিক অর্থায়ন সংস্থাটি এ প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বাজার সৃষ্টি এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি খাতে কয়লার বদলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের প্রণোদনা দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকা প্রসঙ্গে দীর্ঘ প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে।

ফ্রেডরিক জোনস বলেন, ২০০৫ সালের পর থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি সক্ষমতাসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত দেড় হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে আইএফসি। একই সঙ্গে প্রস্তুত রাখা হয়েছে আরো ১ হাজার কোটি ডলার।

তবে তিনি এও স্বীকার করেন, আইএফসির নীতিমালায় সংস্থাটির মূলধনি গ্রাহকদের জন্য কয়লাভিত্তিক প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি। ফলে না চাইলেও শিল্পটির সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও তার ভাষ্য অনুযায়ী, আর্থিক সেবা খাতে কয়লাসংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোয় কোনো ধরনের ঋণ দেয় না আইএফসি।

আইডিআই প্রতিবেদনটি ব্যাংক ইনফরমেশন সেন্টার অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি কাউন্সিলের মতো কয়েকটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করেছে।

উল্লেখ্য, ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২০১১ সালের ১০ জানুয়ারি ভারতের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে সরকার। এর পর একই বছরের ৩০ আগস্ট এনটিপিসির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এনটিপিসি ও পিডিবির সমান অংশীদারির এ যৌথ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৪ একর। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হবে আমদানি করা কয়লা।