রাজিবের মায়ের মৃত্যু ও আমাদের স্বস্তি!

ড: আবুল হাসনাৎ মিল্টন: রাজনীতিতে টুকটাক হত্যাকান্ড ঘটেই, মনে রাখতে নেই। হয়তো এরকমই একটা ঘটনা, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আসাদ রাজিবকে ২০০৯ সালের ৩১ মার্চ শহীদ ডা: ফজলে রাব্বী হলে হত্যা করা হয়েছিল। আমরা অনেকেই মনে রাখিনি। যদিও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের প্রায় সত্তর বছরের ইতিহাসে ক্যাম্পাসে আজ অব্দি এটিই একমাত্র হত্যাকান্ড, এর আগে আর কোন মেডিক্যাল ছাত্রকে কখনো এভাবে খুন করা হয়নি। কী নৃশংস ছিল সেই রাতের হত্যাকান্ড! প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে শুনেছি, মুমূর্ষ রাজিবের মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাকে সময়মত হাসপাতালেও নিতে দেয়নি খুনিরা। আহতাবস্থায় দীর্ঘক্ষণ রাজিবকে হলের স্কোয়াশ কোটের রুমে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

কারা রাজিবকে হত্যা করেছিল? আইনের দৃষ্টিতে হয়তো এই প্রশ্নটির উত্তর নেই। রাজিবের মৃত্যুর পর খুব স্বাভাবিকভাবেই একটি মামলা হয়েছিল। কিন্তু রাজশাহী থেকে বারবার ঢাকা এসে রাজিবের পরিবারের পক্ষে মামলা চালানোটা কঠিন হয়ে পড়েছিল। মামলাটা না চলার আরো হয়তো নানাবিধ কারণ ছিল। বর্তমানে মামলাটা আর নেই, অনেক আগেই ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়ে গেছে। সেই হিসেবে মামলার পরিণতিকেই যদি চুড়ান্ত ধরে নেই, তাহলে আর কারো বলার কিছু থাকে না। কারো বিরুদ্ধেও আর তখন খুনের অভিযোগে আঙ্গুল তোলা যায় না। সব যেন আজ ফিলিপস বাতির আলোয় ধোয়া, ধবধবে সাদা, নিষ্কলুষ!

বাংলাদেশে বোধ হয় এটাই স্বাভাবিক। এই দেশে হত্যাকান্ডের সাথে যদি একটু রাজনীতির তকমা জুড়ে দেওয়া যায়, তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আর তার বিচার হয় না। সুতরাং আইনি আদালতে রাজিব হত্যার বিচার না হওয়াটা আমাকে আদৌ বিস্মিত করে না। এ এমন এক দেশ, যেখানে জাতির পিতার হত্যার বিচারের জন্য প্রতীক্ষায় থাকতে হয় সিকি শতাব্দীরও বেশী, আর রাজিব তো কোন ছার!

তবে রাজিব হত্যার সাথে কারা জড়িত ছিল, সুইডেন থেকে উড়ে এসে ঢাকা মেডিক্যাল ছাত্রলীগের কোন প্রাক্তন নেতা এই হত্যাযজ্ঞের আয়োজন করেছিল, তা কারোই অজানা নয়। তবু আমার মনে একটা খটকা লেগেই থাকে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ কী এমন সোনার ডিম পাড়া রাজহাস যে সুইডেনের নিশ্চিত প্রাচুর্যের জীবন ফেলে এসে ক্যাম্পাসে খুনোখুনি করতে হবে? ওই ক্যাম্পাসে আমরাও রাজনীতি করেছি, কখনো তো চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি-ধান্দাবাজির কথা মাথায় আসেনি। বরং বারবার মিথ্যে অজুহাতে বাবার কাছ থেকে টাকা এনে সংগঠনের পেছনে ঢেলেছি। আর সেই ক্যাম্পাসেই ভোগ দখলের ধান্দায় মানুষ খুন!

কেমন আছে রাজিবের খুনীরা? যদ্দূর জানি, সবাই বহাল তবিয়তেই আছে। এই হত্যাকান্ডের প্রধান রূপকার, সেই প্রাক্তন ছাত্রলীগ নেতা এখন ইউরোপের একটি দেশের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। মাঝে মধে দেশে আসে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে এসে হম্বি-তম্বি করে যায়। আর করবেই না বা কেন? স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নেতারা ইউরোপের সেই দেশে বেড়াতে গেলে সেই অভিযুক্তের আতিথ্য গ্রহণ করে ধন্য হয়। মাঝে মধ্যে দুয়েকজন মন্ত্রীর কাফেলায়ও সে ঢুকে পড়ে। আর এইসব মন্ত্রী-নেতাদের সাথে ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করে। দেখে আমরা মুগ্ধ হই, তার ক্ষমতার দাপটে পুলকিত বোধ করি। রাজিবের রক্ত লেগে থাকা খুনীর হাতের দিকে আমাদের নজর যায় না। সেই সময়ই বা কোথায়? তার প্রয়োজনই বা কী? কোথাকার কোন অজপাড়াগাঁয়ের রাজিব!

রাজিবের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে আমি ‘এই নাও মৃত্যু তোমাকে দিলাম’ শিরোনামে ‘আমাদের সময়’ পত্রিকায় একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। সেই লেখাটি পড়ে অশ্রুসিক্ত রাজিবের মা আমার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলেন। আমি দেশে গিয়ে খালাম্মাকে ফোন করেছিলাম। ফোনে রাজিবের মা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বাবা, আমার রাজিব কি ছাত্রলীগ করে কোন অপরাধ করেছিল, যার জন্য তাকে জীবন পর্যন্ত দিতে হল?’ খালাম্মার প্রশ্নের কোন জবাব আমি সেদিন দিতে পারিনি। কিন্তু প্রশ্নটা আমাকে আজো তাড়িয়ে বেড়ায়। যেহেতু সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতি করেছি, মৃত্যু তাই আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বাসুনিয়া, চুন্নু, ডা: মিলনের মত কাছের মানুষসহ রাজপথের বহু স্বজনকে হারিয়েছি। সেইসব মৃত্যু একদিকে যেমন কষ্ট দেয়, অন্যদিকে একধরণের অহংকারও বোধ হয়। আমাদের স্বজনের রক্তে জাতি স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিল। কিন্তু রাজিবের মৃত্যু তো সেরকম কিছু নয়। রাজিবকে হত্যা করেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের তারাই, যারা রাজনীতিতে একসময় তারই পূর্বসূরী ছিল।

গতবার দেশে গিয়ে রাজিবের মায়ের খোঁজ করেছিলাম। তিনি আর বেঁচে নেই। আপন সন্তান হারানোর শোকে বিপর্যস্ত এক মায়ের বেদনার অবশেষে পরিসমাপ্তি ঘটেছে। পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে তিনি ছেলের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। ফোন করলে তিনি হয়তো আর প্রশ্ন করে আমাদের কাউকে বিব্রত করবেন না।

তবু তার সেই প্রশ্নটি আজো কানে বাজে, ‘বাবা, আমার রাজিব কি ছাত্রলীগ করে কোন অপরাধ করেছিল, যার জন্য তাকে জীবন পর্যন্ত দিতে হল?’ তবু আজো রাজিবের মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়! আর রাজিবের খুনিরা দেশে- বিদেশে বুক ফুলিয়ে হাঁটে এবং কোন কোন নেতার প্রশ্রয়ে রাজনীতিকে কলুষিত করতে থাকে। খুনিদের মতই, তাদের পৃষ্ঠপোষক সেইসব নেতাদের অনুশোচনা তো দূরের কথা, সামান্য লজ্জাও করে না।

লেখক পরিচিতি: ড: আবুল হাসনাৎ মিল্টন: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কবি ও চিকিৎসক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা।
(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)