রাজশাহীর তিন দলিল লেখকের ৪৬ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি

মাহী ইলাহি, রাজশাহীঃ রাজশাহী সদর দলিল লেখক সমিতিতে তিন সদস্যর একটি জালিয়াত চক্র সক্রিয় আছে। তারা ইতিমধ্যেই কয়েকটি দলিল লেখায় সরকারকে প্রায় ৪৬ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। এ নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে দলিল লেখক সমিতিতে লিখিত অভিযোগ দায়ের হলে সমিতির তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে।

এরপর সমিতির পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সদর সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশ পেয়ে সদর সাব-রেজিস্ট্রার ওই তিন দলিল লেখককে সাময়িকভাবে দলিল লেখা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে না, তা সাত কার্যদিবসের মধ্যে স্ব-শরীরে উপস্থিত হয়ে জবাব দেওয়ার জন্য অভিযুক্তদের শোকজ করেছেন সাব-রেজিস্ট্রার।

অভিযুক্ত তিন দলিল লেখক হলেন, শফিউর রহমান (সনদ নম্বর-৩৯৮), আখেরুল ইসলাম (সনদ নম্বর-৪৭৩) ও বদরুদ্দোজা বাবর (সনদ নম্বর-৪০৮)। গত ১৮ জুলাই সদর দলিল লেখক সমিতির ছয়জন সদস্য সমিতির সভাপতির কাছে তাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগ পত্রে বলা হয়, এই তিন দলিল লেখক সমিতিতে একটি জালিয়াত চক্র গড়ে তুলেছেন। বিভিন্ন দলিল লেখায় তারা সরকারকে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন। এতে তারা নিজেরাও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। আর ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জমি রেজিস্ট্রি করতে আসা সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি এতে দলিল লেখক সমিতির ভাবমূর্তিও চরমভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। কিন্তু অভিযুক্তদের বাড়ি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস সংলগ্ন এলাকায় হওয়ায় কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পান না।

তাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ দায়েরের পর বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নামে দলিল লেখক সমিতি। এ জন্য পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। গত ৩০ জুলাই এই কমিটি সমিতির কাছে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। এতে দেখা গেছে, ওই তিন দলিল লেখকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সবই সত্য। গত প্রায় এক বছরেই তারা তিনজন সরকারকে ৪৫ লাখ ৯৮ হাজার ১৯৩ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, দলিল লেখক শফিউর রহমান গত বছরের ২৬ এপ্রিল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১৭২৮ নম্বর কবলা দলিল রেজিস্ট্রি করেছেন। এই দলিলে তিনি ধানী জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে লিখেছেন ডোবা। দলিলে জমির মূল্য দেখানো হয়েছে দুই লাখ টাকা। ধানী জমি হওয়ায় দলিলে ওই জমির মূল্য হতো ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ২৪২ টাকা। এখানে তিনি সরকারকে ১২ লাখ ৮৯ হাজার ২৪২ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন।

গত বছরের ১৬ নভেম্বর শফিকুর রহমান ৫০৪৫ নম্বর বিক্রয় কবলা দলিল রেজিস্ট্রি করেছেন। এই দলিলে তিনি ভিটা জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে লিখেছেন বিল। দলিলে জমির মূল্য দেখানো হয়েছে তিন লাখ ২৩ হাজার টাকা। প্রকৃতপক্ষে ওই জমির মূল্য হতো ৫ লাখ ৫৫ হাজার ১৮০ টাকা। এখানে তিনি সরকারকে দুই লাখ ৩২ হাজার ১৮০ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন।

গত ২২ মার্চ শফিকুর রহমান ১৪২২ নম্বর দলিলে ভিটা জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে লিখেছেন বাঁশঝাড়। দলিলে তিনি জমির মূল্য দেখিয়েছেন চার লাখ এক হাজার টাকা। প্রকৃতপক্ষে ওই জমির মূল্য হতো ২০ লাখ ১১ হাজার ৯৮৩ টাকা। এখানে তিনি সরকারকে ১৬ লাখ ১০ হাজার ৮৩ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন।

এর আগে গত ২২ ফেব্রুয়ারী শফিকুর রহমান ৯০৮ নম্বর দলিলে একটি পুকুরের শ্রেণি পরিবর্তন করে লিখেছেন লায়েক পতিত। দলিলে তিনি জমির মূল্য দেখিয়েছেন এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা। প্রকৃতপক্ষে সরকার নির্ধারিত ওই জমির মূল্য হতো দুই লাখ ১৯ হাজার ৭০৫ টাকা। এখানে তিনি সরকারকে ৮৪ হাজার ৭০৫ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন।

এছাড়া গত ৩ মে শফিকুর রহমান ২২৩৬ নম্বর দলিলে একটি বাড়ির শ্রেণি পরিবর্তন করে লিখেছেন ভিটা। দলিলে তিনি জমির মূল্য দেখিয়েছেন দুই লাখ ৪৯ হাজার ১০৮ টাকা। প্রকৃতপক্ষে সরকার নির্ধারিত ওই জমির মূল্য হতো দুই লাখ ১৭ হাজার ১২৮ টাকা। এখানে তিনি সরকারকে এক লাখ ১৪ হাজার ১২৮ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন।

এদিকে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর দলিল লেখক আখেরুল ইসলামও ৫৯০১ নম্বর দলিল লিখতে গিয়ে একটি বাড়ির শ্রেণি পরিবর্তন করে লিখেছেন ভিটা। দলিলে তিনি জমির মূল্য দেখিয়েছেন নয় লাখ ৬৯ হাজার টাকা। প্রকৃতপক্ষে ওই জমির মূল্য হতো ১৪ লাখ ৩৮ হাজার ২২৮ টাকা। আখেরুল ইসলাম এই দলিলে সরকারকে চার লাখ ৬৯ হাজার ২২৮ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন।

একই দিন এর পরের দলিলেই আখেরুল ইসলাম আরও একটি বাড়ির শ্রেণি পরিবর্তন করে লিখেছেন ভিটা। দলিলে তিনি জমির মূল্য দেখিয়েছেন ছয় লাখ ১১ হাজার টাকা। প্রকৃতপক্ষে ওই বাড়ির মূল্য হতো নয় লাখ সাত হাজার ২৩৪ টাকা। আখেরুল এই দলিলে সরকারকে দুই লাখ ৯৬ হাজার ২৩৪ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। এ ছাড়া চলতি বছরের ২৭ জুলাই আখেরুল ইসলাম ৩৪৬১ নম্বর দলিলে সরকারকে এক হাজার টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন বলে প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

এদিকে চলতি বছরের ১২ এপ্রিল দলিল লেখক বদরুদ্দোজা বাবর ১৮১৮ নম্বর দলিলে ভিটা জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে লিখেছেন ধানী। দলিলে তিনি জমির মূল্য দেখিয়েছেন পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। জমিটি ভিটা হওয়ায় দলিলে সরকার নির্ধারিত এর মূল্য হতো ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৪৯৮ টাকা। কিন্তু জালিয়াতি করে এখানে তিনি সরকারকে পাঁচ লাখ ২১ হাজার ৪৯৮ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন বলে প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, সনদপত্রে তার নাম ‘বদরুদ্দোজা বাবর’ থাকলেও জালিয়াতি করতে তিনি তার রেজিস্ট্রি করা সকল দলিলে নাম লিখেছেন ‘বদরুদ্দোজা বদর’।

তদন্ত কমিটির এই প্রতিবেদন হাতে পেয়ে গত ৪ আগস্ট রাজশাহী সদর দলিল লেখক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক সাদিয়ার রহমান এক চিঠিতে জেলা সাব-রেজিস্ট্রারকে বলেছেন, ‘দলিল লেখক শফিকুর রহমান, আখেরুল ইসলাম ও বদরুদ্দোজা বদরের সমন্বয়ে শক্তিশালী জালিয়াত চক্রটি প্রতিনিয়ত একদিকে লুটপাট করছে সরকারের লাখ লাখ টাকা রাজস্ব অন্যদিকে করছে জনসাধারণের ভোগান্তি। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে গঠিত ছয় সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সরকারি রাজস্ব ফাঁকির ভয়াবহ চিত্র। তাই তাদের দলিল লেখার সনদ বাতিল, ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা করা এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করছি।’
এরপর গত রোববার (২১ আগস্ট) সদর সাব-রেজিস্ট্রার অভিযুক্ত তিন দলিল লেখককে চিঠি দিয়ে দলিল লেখা থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তা স্ব-শরীরে উপস্থিত হয়ে জানাতে তাদে সাত দিন সময় বেঁধে দিয়েছেন।

জানতে চাইলে রাজশাহী সদর দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ জাকাতুল্লাহ বলেন, ওই তিন দলিল লেখক সমিতির সুনাম ক্ষুন্ন করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, সেটি তারাও চান।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে তিন দলিল লেখক শফিউর রহমান ও আখেরুল ইসলামের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ না করায় এ ব্যাপারে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জেলা সাব-রেজিস্ট্রার মীর্জা মোর্তজা রেজা বলেন, দলিল লেখক সমিতির তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওই তিন দলিল লেখককে দলিল লেখা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাদের শোকজও করা হয়েছে। এর জবাব পাওয়ার পর এ বিষয়ে যা যা করা দরকার তিনি করবেন।