রাজনৈতিক দলগুলোকে না জানিয়েই বিধি চূড়ান্ত করছে ইসি

100

যুগবার্তা ডেস্কঃ রাজনৈতিক দলগুলোকে না জানিয়েই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের বিধি চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এবার ইউপি নির্বাচনেও প্রচারে নামার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এমপিরা। এতে পৌর নির্বাচনের মতো বাছাইয়ের আগেই একজনকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়ার বিধান বহাল রাখা হয়েছে। মনোনয়ন জমা দেওয়ার আগেই ওই প্রার্থী চূড়ান্ত করতে হবে রাজনৈতিক দলকে। নতুন বিধিতে তুলে দেওয়া হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের বিধানও।

গতকাল মঙ্গলবার কমিশন সভায় বিধিটি হয়েছে বলে ইসির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়াও মধ্য ফেব্রুয়ারিতে প্রথম ধাপে ৫৩৮টি ইউপি নির্বাচনের তফসিলও ঘোষণা করতে যাচ্ছে ইসি। ইসির এসব বিধি মেনেই ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে দলগুলোকে। অথচ রাজনৈতিক দলগুলো সম্ভাব্য নির্বাচন বিধি পরিবর্তনের ব্যাপারে এখনও অন্ধকারেই রয়ে গেছে। ইসি থেকে তেমন কোনো আভাসই দেওয়া হয়নি তাদের।

প্রথমবারের মতো ইউপি চেয়ারম্যান পদে দলীয় ভিত্তিতে মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ রেখে গত নভেম্বরে আইন পাস হয়। এর আলোকে নির্বাচন পরিচালনা ও আচরণবিধি সংশোধন চূড়ান্ত করেছে ইসি। চলতি সপ্তাহে তা ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইসির একাধিক সূত্র। তবে ইসির পক্ষ থেকে নিবন্ধিত ৪০ রাজনৈতিক দলকে এ বিষয়ে এখনও কিছুই জানানো হয়নি। দলগুলোর মতামত গ্রহণের কোনো পরিকল্পনাও নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইসির প্রধান ‘স্টেকহোল্ডার’ রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের না জানিয়ে আইন প্রণয়ন করা হলে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি কার্যালয়ের সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম লেন, ইউপি নির্বাচনের ‘আচরণ ও পরিচালনা বিধি’ সংশোধনের কাজ শেষ পর্যায়ে। পরিচালনা বিধিমালা কমিশন সভায় অনুমোদন হলেও আচরণবিধি নিয়ে আরও কিছু কাজ বাকি রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নেই। তবে কমিশন চাইলে পরে আলোচনা হতে পারে। রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে এই নির্বাচনে তাদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি-না জানতে চাইলে ইসি সচিব বলেন, এ বিষয়ে কমিশন সদস্যরা ভালো বলতে পারবেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, ইসির বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে রাজনৈতিক দলগুলো জড়িত। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে আস্থায় নেওয়া প্রয়োজন। সেটা করতে না পারলে আইন প্রয়োগ যথাযথ নাও হতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমান কমিশনের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রথম থেকেই প্রশ্ন রয়েছে। নিজেদের দুর্বলতার কারণেই তারা দলগুলোকে এড়িয়ে চলতে চাইছে।
এর আগে পৌরসভা নির্বাচনের আচরণবিধি নিয়ে আপত্তি তুলেছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ একাধিক রাজনৈতিক দল। বিশেষ করে প্রচারে এমপিদের বাইরে রাখার বিষয়ে আপত্তি তুলেছিল বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল। তারা ইসিতে গিয়ে এ বিষয়ে লিখিত আপত্তিও জানিয়েছিল। একই ধরনের দাবি তুলেছিল জাতীয় পার্টি, জাসদ এবং ওয়ার্কার্স পার্টি। তখন ইসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সময়স্বল্পতার কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা যায়নি। একইভাবে বিএনপির পক্ষ থেকেও তাড়াহুড়া করে আইন প্রণয়নের সমালোচনা করে বলা হয়, অনেক নতুন নিয়ম চালু করা হলেও তাদের এ বিষয়ে আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি।

জানতে চাইলে বর্তমান কমিশনের একজন সদস্য বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের বিষয়ে কমিশনের নেতিবাচক অবস্থান রয়েছে। কারণ তাদের সঙ্গে সংলাপে বসার অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। ইসি-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিশনের আমলে মাত্র একবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ হয়। ২০১২ সালের ওই সংলাপে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস ও ভোটার তালিকা হালানাগাদ নিয়ে দলগুলোর মতামত চেয়েছিল ইসি। তবে ওই আলোচনার পরে কমিশন সদস্যরা মনে করছেন, সে সময় রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে বিধি-বিধান প্রণয়নে তেমন কোনো পরামর্শ না এলেও অহেতুক বিতর্কের মুখে পড়তে হয়েছে ইসিকে। তাই সংলাপকে এড়িয়ে চলার নীতি গ্রহণ করছে বর্তমান কমিশন।

পৌরসভা নির্বাচনের মতো ইউপি নির্বাচনের প্রচারেও বাইরে রাখা হচ্ছে এমপিদের। পৌর নির্বাচনের আচরণবিধি অনুযায়ী সরকারি সুবিধাভোগীদের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের মেয়র ও এমপিদের প্রচারের বাইরে রাখা হয়েছিল। এবার নতুন করে উপজেলা চেয়ারম্যানদেরও প্রচারের বাইরে রাখার প্রস্তাব কমিশন সভায় আলোচনা হলেও পাস হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এমপিদের প্রচারে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ার ব্যাপারে একাধিক দলের আপত্তি থাকলেও ইসি মনে করছে পৌর নির্বাচনে এমপিরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়েছেন। তাই তাদের প্রচারের সুযোগ দেওয়া হলে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যাহত হবে।

একইভাবে উপজেলা চেয়ারম্যানরা সরকারি গাড়িসহ বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে থাকেন। তাদের কারণেও ইউপি নির্বাচনের মাঠ প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব বিবেচনায় নিয়েই উপজেলা চেয়ারম্যানদের প্রচারের বাইরে রাখার চিন্তা করা হয়েছিল। তবে একাধিক কমিশনার এই প্রস্তাবে আপত্তি তোলেন। তাদের যুক্তি সংসদে প্রতিনিধিত্ব না থাকায় দেশের বড় একটি রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রচারে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বেশিরভাগই এমপি হওয়ায় তারা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আগ থেকেই মন্ত্রী ও তাদের সমমর্যাদার ব্যক্তিকেও প্রচারে নামার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এরপরে উপজেলা চেয়ারম্যানদেরও প্রচারের বাইরে রাখা হলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট হতে পারে।

এ ছাড়াও মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগেই একটি রাজনৈতিক দল থেকে একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার বিধান ইউপিতেও বহাল রাখা হচ্ছে। এর ফলে কোনো দলের প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হলে ওই পদে সংশ্লিষ্ট দলের আর কোনো প্রার্থী থাকবে না। এই বিধানের ফলে পৌর নির্বাচনে বিএনপির মেয়র পদে অন্তত ১৪ প্রার্থী ছিল না। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক বলেন, সবদিক থেকে যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। সতর্ক থাকতে হবে যেন কোনো ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপিকে মনোনয়ন দেওয়া না হয়। অন্য যে সব কারণে প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে, সেসব বিষয়েও তাদের সতর্ক থাকতে হবে। সব দায় ইসির ঘাড়ে চাপালে চলবে না।নিউজওয়ার্ল্ডবিডি.কম