রাজধানীর ১৯ আস্তানার তথ্য গোয়েন্দার হাতে

যুগবার্তা ডেস্কঃ রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের দুর্গম-নিরিবিলি এলাকায় ঘাঁটি গাড়ছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলো। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ও লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতে এ কৌশল নিয়েছে তারা। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ শেষে জঙ্গি সংগঠনের এসব সদস্য বেছে নিচ্ছে নিম্নবিত্ত-স্বল্প শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে এমন এলাকা। গার্মেন্টকর্মীসহ ছোটখাটো পেশার সঙ্গে যুক্ত পরিচয়ে কম ভাড়ায় জনবহুল এসব এলাকাকে তারা বেছে নিচ্ছে। এসব স্থানে অবস্থানের পর জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা সুযোগ বুঝে হামলার টার্গেট নির্ধারণ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেফতার হওয়া বেশ ক’জন জঙ্গির কাছ থেকে অন্তত ১৯টি আস্তানার খবর পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এসব আস্তানায় ছোট ছোট স্লিপার সেলে ৭ থেকে ১২ জন্য সদস্য অবস্থান করছে। আস্তানাগুলোর প্রত্যেকটিতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক রয়েছে। এসব আস্তানার অবস্থান নিশ্চিত হতে গোয়েন্দারা কাজ করছেন জানিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও জঙ্গি দমনে নবগঠিত কাউন্টার টেরোরিজমের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা পাওয়ামাত্র পর্যায়ক্রমে এসব আস্তানায় অভিযান চালানো হবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বর্তমান সরকারকে হটাতে বিভিন্ন নাশকতার ছক বাস্তবায়নে একাট্টা হয়েছে নিষিদ্ধ বেশ ক’টি জঙ্গি সংগঠন। এসব সংগঠনের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবি, হিযবুত তাহরির ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম অন্যতম। ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, সময়-সুযোগ বুঝে এসব জঙ্গি রাজধনীর বিভিন্ন স্থানে হামলার জন্য নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেফতারকৃতরা এ ধরনের অন্তত ১৯টি আস্তানার অবস্থানের কথা জানিয়েছে বলে জানান নবগঠিত ওই সংস্থার আরেক কর্মকর্তা। তবে গ্রেফতারকৃতরা থানা ও এলাকার নাম জানালেও তারা পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা জানাতে পারছে না বলে ওই কর্মকর্তা জানান। জঙ্গি দমনে নবগঠিত কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম মঙ্গলবার বলেন, গ্রেফতারকৃতরা শুধু থানা ও এলাকার নাম জানাতে পেরেছে। দু’একটি আস্তানায় অবস্থানরতদের নাম-পরিচয় জানার পর গোয়েন্দা অনুসন্ধান চালিয়ে অভিযানগুলো পরিচালনা করা হচ্ছ বলে তিনি জানান। সোমবার গভীর রাতে কল্যাণপুরের ৫ নম্বর রোডে মমতাজ মঞ্জিলে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান গ্রেফতারকৃতদের দেয়া তথ্যে পরিচালনা করা হয় বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম। সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন আরেক কর্মকর্তা বলেন, গ্রেফতারকৃতদের দেয়া তথ্যমতে, কল্যাণপুরের মতো মিরপুর, পল্লবী, মোহাম্মদপুর, আশকোনা, উত্তরখান, কামরাঙ্গীরচর, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, রামপুরা, মীর হাজীরবাগ, লালবাগের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকা, কামরাঙ্গীরচর, রায়েরবাজার ও পুরান ঢাকাসহ অন্তত অর্ধশত এলাকায় ঘনবসতিপূর্ণ ও নিম্নাঞ্চলে অন্তত ১৯টি আস্তানার খবর তাদের কাছে রয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট ঠিকানা না থাকায় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা এসব আস্তনা শনাক্ত করতে কাজ করে যাচ্ছেন। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এর আগেও এসব এলাকায় জঙ্গিদের বিভিন্ন আস্তানায় অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি), জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও হরকাতুল জিহাদ (হুজি) সংগঠনগুলোর অনেক সদস্যকে আইনশৃংখলা বহিনীর সস্যরা গ্রেফতার করেন। এসব আস্তানা থেকে উদ্ধার করা হয় হ্যান্ডগ্রেনেড, বোমা, বিস্ফোরক ও জঙ্গিদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার তথ্যসহ ডায়েরি। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের আস্তানা থাকতে পারে। এর মধ্যে মিরপুর, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর ও আশকোনা এলাকার জঙ্গিদের আস্তানাগুলো শনাক্ত করে অভিযান চালিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও র‌্যাব। ২০০৪ ও ২০০৫ সালে দেশব্যাপী জেএমবির জঙ্গি কার্যক্রমের সময়ও রাজধানীর চারদিকের নিম্নাঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আস্তানা গড়ে তোলে। প্রতিবেশীদের অসচেতনতার সুযোগ নিতে কিংবা আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় সহজে গা-ঢাকা দেয়ার সুযোগ নিতে তারা এমন স্থানগুলোর প্রতি আগ্রহ দেখায় বলে জানান পুলিশের ওই কর্মকর্তা। কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. সানোয়ার হোসেন বলেন, ২০ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুরের একটি বাসায় জঙ্গিদের বোমা কারখানায় অভিযান চালায় গোয়েন্দা পুলিশ। সেখান থেকে শক্তিশালী বোমা, হ্যান্ডগ্রেনেড ও আত্মঘাতী সুইসাইড ভেল্টসহ নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। ওই আস্তানা থেকে উদ্ধার করা বোমা দিয়ে ছোটখাটো ভবন উড়িয়ে দেয়া সম্ভব ছিল। ওই অভিযানের পর তদন্তে নেমে আস্তানায় ১২ থেকে ১৫ জন জঙ্গির নাম-পরিচয় জানতে পারে গোয়েন্দা পুলিশ। এসব প্রশিক্ষিত জঙ্গি একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রাজধানী ঘিরে আস্তানা বানিয়ে অবস্থান করছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এর আগের দিন ১৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানীর বাড্ডার সাঁতারকুলে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় জঙ্গিদের হামলায় ডিবি পুলিশের এক পরিদর্শক গুরুতর আহত হন। এ সময় আটক করা হয় জঙ্গি সংগঠন এবিটির দুই সদস্যকে। তারা হল জামাল হোসেন ওরফে কামাল এবং শাহআলম ওরফে হিরণ ওরফে সালাউদ্দিন। পরে জিজ্ঞাসাবাদে সালাউদ্দিনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই রাতেই মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিংয়ের বি-ব্লকের ২৮ নম্বরের আলহাজ মওলানা আবদুল মালেকের বাড়িতে জঙ্গিদের আরেকটি আস্তানায় অভিযান চালানো হয়। এর কয়েক দিন পর ২৮ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণখানের দলিয়াপাড়ায় ২৪২ নম্বরের একটি বাড়িতে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান পরিচালনা করে গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় সেখান থেকে দুইটি বোমা ও বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। তবে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি ডিবি পুলিশ। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর মিরপুরের ১ নম্বর সেকশনের এ-ব্লকের ৯ নম্বর রোডের ৩ নম্বর বাড়িতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১৬টি হ্যান্ডগ্রেনেড উদ্ধার করে। ওই বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় জেএমবির তিন সদস্যকে। আটকরা জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, তাদের কার্যক্রম চালাতে অনেকটা নিরিবিলি এলাকা পছন্দ। নিরিবিলি এলাকায় বাসা ভাড়া নিলে কেউ সন্দেহ করবে না। বাসা ভাড়া নেয়ার ৪-৫ মাস পর আবার পরিবর্তন করে আস্তানা গড়ে তোলা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে উৎখাত করতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সদস্যরা। এজন্য রাজধানীর দক্ষিণ ও উত্তরের নিম্নাঞ্চল যাত্রাবাড়ী এবং মিরপুরে দুটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলা হয়েছিল। ২০১৫ সালের ১ অক্টোবর উত্তর বাড্ডার একটি আস্তানা থেকে গ্রেফতার করা হয় জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানকে।