যুদ্ধে জয়ের জন্যে ভাল লঙ্গী প্রয়োজন!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ
বাংলাদেশের জাতীয় ফুল, জাতীয় ফল নিয়ে আমার শোনিমের কোন প্রশ্ন নেই। জাতীয় সংগীত নিয়েও কোন প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন করবে কি? শোনিমের কাছে অসম্ভব প্রিয় আমাদের জাতীয় সংগীত। তবে প্রশ্ন কেবল জাতীয় খেলা নিয়ে। ক্রিকেটের মত অসম্ভব জনপ্রিয় খেলা থাকতে অন্য কোন খেলা কিভাবে জাতীয় খেলা হয়, সেটা কিছুতেই বুঝে আসে না শোনিমের। নিদেনপক্ষে ফুটবল হলেও মেনে নিতে পারতো। কিন্তু সে সব না হয়ে বর্তমান প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অপরিচিত খেলা হাডুডু বা কাবাডি হয়েছে আমাদের জাতীয় খেলা। প্রশ্নটা এখানেই।
ছোট মানুষ তো, তাই প্রশ্ন করে। অনেক কিছুই এখনো অজানা; হাডুডু বা কাবাডির মত কোন খেলাই যে কেবল ওদের নিকট অজানা তাই নয়; আরো অনেক অনেক খেলাই এই প্রজন্মের অচেনা। গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্দা, ছিঃ কুতকুত, কাঁনামাছির কথা ওরা জানে বলে মনে হয় না। আমাদের ছেলেবেলায় চারজন একসঙ্গে হলেই বসে যেতাম চোর-পুলিশ খেলতে। সে এক দারুন মজার খেলা। চারখানা ছোট কাগজে চোর, ডাকাত, বাবু এবং পুলিশ লিখে ভাঁজ করে খেলা শুরু করতাম। অনেকটা লটারীর মত খেলাটি। সবাই কেবল দোয়া পড়তাম যেন পুলিশ কিংবা চোরের কাগজটি হাতে না পড়ে। ডাকাত এবং বাবুর কোন সমস্যা ছিল না। তারা নিরাপদ ছিল। বাস্তব জীবনেও নিরাপদ কেবল তথাকথিত বাবুসাহেব এবং বর্নচোরা ডাকাতের দল। বিপদ কেবল ছেঁচড়া চোর এবং হেচড়া পুলিশের।
তবে অজানা খেলাকেই যদি করবে, তাহলে লুডুকেও জাতীয় খেলা করতে পারতো। খেলাটি যে এই বাংলায় কতটা জনপ্রিয় ছিল তা একমাত্র পুরানোরাই জানে। ঘরে ঘরে আবালবৃদ্ধবনিতা দলবেঁধে লুডু খেলতো। বাবা-মাদের দেখতাম তাদের সমগোত্রদের নিয়ে প্রায় রাতেই পাল্লা দিয়ে খেলছেন। খেলা উপলক্ষ্যে ভাল খাবার দাবারের আয়োজনও থাকতো। সামাজিক বিনোদন বলতে লুডু খেলাটি ছিল অন্যতম। এক সময় আমিও দারুন খেলতাম। দুজনে বা চারজনে মিলে খেলতাম; জোড় বেঁধেও খেলতাম। খুব পারদর্শী ছিলাম তো! তাই সবাই আমাকে জোড়ে নিতে চাইতো। অপরপক্ষ খুব বেশী নজর না দিলে আমি সাধারণত ধরা খেতাম না। হাত সাফাইয়ে আমার তুলনা আমি নিজেই ছিলাম। এদিক ওদিক আড়চোখে দেখে কাঁচা গুটি সামান্য একটু ঠেলে পাকা ঘরে পাঠাতে আমার কোন বিকল্প ছিল না।
সেই লুডু না হয়ে কাবাডি হয়েছে জাতীয় খেলা। অনেককেই জিজ্ঞেস করেছিলাম; কেউই বলতে পারে না কাবাডির বিষয়টি। কেবল কাবাডি কেন, এদেশের কোন বিষয়েই কেউ কিছু ভাল করে বলতে পারে না। শহরের কোন দালান ৬ তলা, আবার কোনটা দশ। কারনটি কেউ জানে না। শত বিপদে পড়লেও মানুষ পারতপক্ষে পুলিশের কাছে যেতে চায় না কেন, বিনামূল্যে চিকিৎসা থাকার পরেও সরকারী হাসপাতালে যেতে কেন এত অনীহা, বেসরকারী শালিসে আগ্রহী হলেও সরকারি শালিসে নয় কেন, এমন হাজারটি প্রশ্ন আছে। কেবল উত্তরটি নেই। বাংলাদেশে কোন বিষয়ের কোন সহজ উত্তর নেই। উত্তর ধোঁয়া ধোঁয়া, রহস্যে ঘেরা।
অবশ্য বাঙ্গালীকে বলে লাভ কি! বাঙ্গালী তো নস্যি মানুষ! স্বয়ং আল্লাহ পাক নিজেই তো রহস্যে ঘিরে রেখেছেন তাঁর সকল সৃষ্টিকুল। বড় বড় বিজ্ঞানীর দল একটি রহস্য ভেদ করছেন তো দশটি নতুন রহস্য সামনে এসে পড়ছে। আল্লাহর সৃষ্টির রহস্য শেষ হচ্ছে না কিছুতেই। মানুষের পুরো জীবনটাই রহস্যময়। রহস্যময় এই জীবনটা শুরু হয় নামাজ বিহীন আযান দিয়ে; কানের খুব কাছে হয় সে আযান। আর শেষ হয় আযান বিহীন নামাজে; জানাজার নামাজ!!
কেবল নামাজ-কালামই নয়, রহস্যের অন্ত নেই সারা পৃথিবীতে। পুরো পৃথিবীর রহস্যময় মানুষেরা নিজেরাও রহস্যপ্রিয়; রহস্য করতে খুব পছন্দ করে। রহস্যের আবার দুটো ধরণ; একটি ইতিবাচক আর অন্যটি নেতিবাচক। বলতে একটুও দ্বীধা নেই, বাংলাদেশের এই আমরা দুঃখজনকভাবে নেতিবাচক রহস্যে বাস করতে বেশী পছন্দ করি। কোন বিষয়কেই প্রাথমিক পর্যায়ে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে আমরা মোটেই অভ্যস্ত নই। কেউ একজন কাউকে এমনি এমনি উপকার করলো তো ঝামেলায় জড়িয়ে গেল। আসলে কেইসটা কি? এমনি এমনি কারো জন্যে কিছু করে? লোকটার নিশ্চয়ই কোন মতলব আছে। এমনি নানান প্রশ্নের উদয় হয় উপকার পাওয়া লোকটির মনে।
যে কোন ভাল কাজ, তা অন্যের জন্যে বা নিজের জন্যে করুন, চারিদিক থেকে হৈ হৈ শুরু হবে। অবশ্য এই হৈ হৈ শব্দ করে হয় না; নীরবে হয়। চিপায় ফেলে কচন দেয়া যাকে বলে। আপনার অজান্তেই আপনার ভাল কাজকে খারাপ কাজ হিসেবে সাধারণের কাছে প্রচার করবে। আর কৌশলে দেবে বাঁধা; কঠিন সে বাঁধা। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কেবল বাঁধার প্রাচীর। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বাঁধা কে দেয় না? বাঁধা সবাই দেয়। ধরনটা কেবল ভিন্ন থাকে। কাজের সাথী বন্ধু সেজে বাঁধা দেয়; বাঁধা সমাজ দেয়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাও দেয়। এমনভাবে বাঁধা দেয় যেন আপনি এগুতে না পারেন। পারে তো আপনাকে জাপটে ধরে থামিয়ে দেয়। পদে পদে সবাই আপনাকে আটকিয়ে দেবে যেন আপনি সমস্যা থেকে বের হতে না পারেন।
এদেশে সৎ ব্যবসা করবেন? পারবেন না। হাজারটা ফালতু আইন করা আছে যা থাকাতে আপনি সৎ পথে থাকতে পারবেন না। সিস্টেমেটিক পদ্ধতি আপনাকে বে-লাইনে নিয়ে যাবে। পুরো আমলাতান্ত্রিক বিষয়টি এমনভাবে সাজানো যা ডিঙিয়ে আপনি লাইনে ফিরতে পারবেন না। আইনগুলো করাই হয় যেন আপনি তাদের কাছে ফিরতে বাধ্য হন। উন্নত বিশ্বে আইন করা হয়, যেন জনগনকে আমলাদের কাছে যেতে না হয়। আর আমাদের দেশে হয়, যেন জনগন তাদের কাছে যেতে বাধ্য হয়।
ফ্যাসাদে পড়লে আপনি তো যাবেনই। তবে তাদেরকে পাশেও পাবেন না; সামনেও না। এদেশে পাশে দাঁড়িয়ে ভরসা দেয়ার লোক নেই; সামনে দাঁড়িয়ে পথ দেখানোর লোক নেই। কিন্তু পিছনে দাঁড়িয়ে বাঁশ দেয়ার লোকের অভাব নেই। মাগনা বাঁশ নয়, নিজেদের গাটের পয়সায় কেনা বাঁশ নিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে। আর তামাশা দেখে। কেবল যে দেখে তাও নয়; পিছন থেকে টেনে ধরে। সামনে এগুতে দেয় না। আপনি মই বেয়ে বেয়ে উপরে উঠবেন? আপনাকে উঠতে দেবে না। পা ধরে নীচে টেনে রাখবে। সব সময় আমরা এরকম একটি টানা হেঁচরা খেলার মধ্যেই আছি। অনেকটা হাডুডু খেলার মতই।
জাতিগতভাবে এই খেলাটির মধ্যেই বসবাস করি সর্বদা। আমরা সবাই খেলোয়ার। কে কখন কার সাথে সর্বনাশা খেলায় মেতে উঠি, কেউই জানি না। জানি না, হাডুডু বা কাবাডি খেলাটি বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হবার এটাই আসল কারণ কিনা! কোন কিছু পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে শিশুদের বলা ঠিক হবে না বিধায় আমি শোনিমকে এটা বলতে পারিনা। না বললেও সমস্যা নেই। বড় হয়ে শোনিম ঠিকই বুঝে নেবে। কেবল অভ্যাসটি নিজে গ্রহন না করলেই হয়।
তবে গ্রহন নয়, সময় এসেছে বর্জনের। হাজারো বদ অভ্যাস ত্যাগ না করতে পারলে আমরা এগুতে পারবো না। সুন্দর জাতি গঠনের জন্যে এই বদ অভ্যাস ত্যাগ করতেই হবে আমাদের। এর কোন বিকল্প নেই। সকল খারাপ কিছু পরিহার করে সব সময় ভালকে গ্রহন করতে হবে; ভালকে অনুসরণ করতে হবে। তবে অন্ধের মত নয়, ভাল করে দেখে বুঝে সাবধানে ভালকে অনুকরন করতে হবে। না হলে অব¯’া হবে বেগতিক।
অবস্থা হবে গেদুর মত। গেদু হলো পেদুর ভাই। পেদু মেধাবী, পড়াশুনায় খুব ভাল। আর গেদু ঠিক উল্টো গোবর গণেশ। একবার দু’ভাই পরীক্ষার হলে পাশাপাশি বসে পরীক্ষা দিচ্ছে। পেদুর পাশে গেদু না বসলে পাশ করতে পারে না। পরীক্ষা চলছে; ইতিহাসের পরীক্ষা। খাতায় পেদু লিখছে, “যুদ্ধে হারিয়া হুমায়ুন ভাঙিয়া পড়িলেন না। তিনি পিতা ও গুরু বাবরের কথা স্মরণ করিলেন। বাবর কি যুদ্ধে হারিয়া কখনো ভাঙিয়া পড়িয়াছেন? পড়েন নাই। বরং উল্লাস হইয়া সহস্র সঙ্গী যোগাড় করিয়া আবার যুদ্ধ করিয়াছেন। যুদ্ধ জয়ের জন্যে ভাল সঙ্গী প্রয়োজন।”
পেদুর লেখা গেদু উঁকি দিয়ে দেখে আর লিখে। এভাবে লিখতে লিখতে যা দাঁড়ালো, “যুদ্ধে হারিয়া হুমায়ুন জাঙিয়া পড়িলেন না। তিনি পিতা ও গর“ বাবরের কথা স্মরণ করিলেন। বাবর কি যুদ্ধে হারিয়া কখনো জাঙিয়া পড়িয়াছেন? পড়েন নাই। বরং উলঙ্গ হইয়া সহস্র লঙ্গী যোগাড় করিয়া আবার যুদ্ধ করিয়াছেন। যুদ্ধে জয়ের জন্যে ভাল লঙ্গী প্রয়োজন।”-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা