মেগা প্রজেক্ট, মেগা জঞ্জাল!!!

সরদার মোঃ শাহীন:

দু’টো শহর; ঢাকা আর ময়মনসিংহ। একটি রাজধানী আর অন্যটি বিভাগীয় শহর। প্রতিদিন এই দুই শহরের মাঝে যাতায়াত হাজার হাজার লোকজনের। অথচ ময়মনসিংহ থেকে রাজধানী শহরে ঢোকার প্রবেশ মুখে মাত্র একটি সড়ক। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। সড়কটির চালুর ইতিহাস খুব পুরনো নয়। এরশাদ আমলের। ভালুকার ছোট্ট নদীটি ছিল এই সড়কটির চালুর ক্ষেত্রে একমাত্র বাঁধা। নদীর উপর ব্রিজটি তৈরী করে তিনি ময়মনসিংহ-ঢাকা সরাসরি সড়কপথ চালু করেন।

সেটি খুবই সরু দুইলেনের একটি সাধারণ সড়ক। এর আগে ময়মনসিংহ থেকে মাত্র ১২০ কিমিঃ দূরত্বের ঢাকা আসতে হতো ২২০ কিমিঃ দূরত্বের টাঙ্গাইল ঘুরে। বঙ্গবন্ধু সেতু তখনও চালু হয়নি। তাই সমগ্র উত্তরবঙ্গের গাড়ি এ পথে আসতে পারতো না। উত্তরবঙ্গের সকল গাড়ি আসতো সিরাজগঞ্জের নগরবাড়ি ঘাট দিয়ে আরিচা হয়ে পদ্মা পাড়ি দিয়ে। সে সব যানবাহন ঢুকতো ঢাকার পশ্চিম প্রবেশপথ মিরপুরের গাবতলী দিয়ে। শুধু নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, ময়মনসিংহ, এবং টাঙ্গাইলের সব যানবাহন এই পথে এসে মিলতো গাজীপুর চৌরাস্তায়।

সবেধন নীলমনি মাত্র দুইলেনের এই একটি সড়কও ছিল ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতু উদ্বোধন করলেন। যার সমস্ত আয়োজন করেছিলেন সেই এরশাদ সাহেবই। ভাল বলি আর মন্দ বলি প্রশাসন বিকেন্দ্রিকরণ আর যোগাযোগের উন্নয়নের শুরুটা তিনিই করেছিলেন। এবং মানতেই হবে, হাসিনা এসে এর বিস্তৃতি বহু গুণ বাড়িয়েছেন। তিনি ক্ষমতায় এসে যমুনা সেতুর কাজ কোনভাবেই বিলম্ব না করে দ্রুততার সাথে শেষ করলেন এবং লক্ষ্য করলেন সমগ্র উত্তরবঙ্গের সকল যানবাহন টাঙ্গাইল হয়ে গাজীপুর দিয়েই ঢাকায় ঢুকছে। তাই খুব তাড়াতাড়ি এয়ারপোর্ট থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত দুইলেনের সেই সড়কটি আটলেনে উন্নীত করলেন যাতে করে চৌরাস্তা পর্যন্ত যাতায়াত নির্বিঘ্নে করা যায়।

তাঁর যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন ইত্তেফাকের আনোয়ার হোসেন। তড়িৎকর্মা যোগাযোগ মন্ত্রী। দেশের গুরত্বপূর্ণ অনেকগুলো সেতু তৈরীতে তারও অনেক ভূমিকা আছে। সেই তিনি রাতদিন খেটে এয়ারপোর্ট থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা আট লেন করে ফেললেন। স্বল্প সময়েই করলেন। সেই যে কাজ হলো। তড়িৎ গতির কাজ। সড়ক বড় হলো; চলাচল সহজ হলো। ব্যাস, এই পর্যন্তই। এরপর থেকে আর নয়। দিনে দিনে সড়ক ব্যস্ত হয়েছে। কিন্তু বিকল্প কিছু চিন্তাও হয়নি, চালুও হয়নি।

কে চালু করবে? সরকার বদলে যখন যারাই এসেছে তারাই চুপ করে থেকেছে। ক্যামেরার সামনে এসে বড় বড় কথা বলা আর দেশের বাইরে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে ভিক্ষা করা ছাড়া আর তেমন কিছু করেছে কি? স্বাধীন বাংলাদেশকে ভিক্ষুকের জাতি বানাবার জন্যে এদের অবদান কোনদিন ভুলবার নয়। এরা এদের নিজেদের বাড়ি যাবার পথ হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ এ পথ নিয়েও ভাবেনি। অথবা ভাবার সময়ই পায়নি। অথচ ঘুরেফিরে তারাই বাংলাদেশের ক্ষমতায় সবচেয়ে বেশি সময় ছিল।

ক্ষমতার সদ্ব্যবহার শুধু তারা কেন, অন্যেরাও খুব একটা করেনি। করলে রাজধানী শহরে সমগ্র বাংলাদেশের সকল যানবাহন ঢোকা এবং বের হবার মাত্র চারটি পথ থাকতো? দুই কোটি লোকের শহরে ঢোকার চারদিকে মাত্র চারটি পথ। ভাবা যায়? চারটি পথ কেবল আমার আমলে নয়, আমার বাবার আমলে ছিল। ছিল আমার দাদার আমলেও। অথচ উন্নত দেশে দেখেছি দশলক্ষ লোকের শহরের প্রতিটি দিকে কমপক্ষে চারটি করে মহাসড়ক। যাতে সকল সময় শহরে অনায়েসে ঢোকাও যায়, বেরও হওয়া যায়।

নিয়মিত শহরের উন্নয়নে কাজ করলে এতদিনে হয়ে যেত। আমাদের দেশে অনেক কিছুই হয়। হয় না যে তা না। হয়, কিন্তু নিয়মিত হয় না। নিয়ম মেনেও হয় না। এটাই দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল। টানা আট বছর। উল্লে−খ করার মত কোন কাজ হয়নি এই দেশের সড়ক, মহাসড়ক নিয়ে। নিত্যদিন সড়কে গাড়ি বেড়েছে, জ্যাম বেড়েছে। কিন্তু সড়ক বাড়েনি, বাড়েনি এর প্রশস্ততা।

এক্ষেত্রে গেল বছরগুলোর গল্প ভিন্ন। এই সময়ে সমগ্র বাংলাদেশে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভাটের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। উন্নয়ন হয়েছে টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহের মহাসড়কেরও। গাজীপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়ক চার লেনের হয়েছে। হয়েছে গাজীপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কও চার লেনের। কিন্তু বিপত্তি বাঁধিয়েছে চৌরাস্তা-এয়ারপোর্ট সড়কটি। চার লেনের হবার সুবাদে যত সহজে টাঙ্গাইল এবং ময়মনসিংহ থেকে সকল যানবাহন চৌরাস্তায় এসে পৌঁছায়, ঠিক তার উল্টো হয় চৌরাস্তা থেকে ঢাকা পৌঁছাতে।

গাড়ি আর আগায় না। গাজীপুর থেকে ঢাকা এয়ারপোর্ট পর্যন্ত সড়কটি যারপরনাই জ্যামের সড়ক গেল সাতটি বছর ধরে। জ্যাম তো নয়, কঠিন জ্যাম। রাত বারোটার পর থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত সময়টুকু ছাড়া একবার এই সড়কে ঢুকলে বের হবার আর কোন জো ছিল না। বেশ কয়েকদিন আগ পর্যন্ত মাত্র ১৫ মিনিটের এই পথটুকু জ্যাম মাড়িয়ে আসতে আড়াই ঘন্টারও বেশি সময় লাগতো। এখন লাগে না। প্রশাসনের উদ্যোগে কিছু জঞ্জাল সাফ করার কারণে জ্যামটা কিছুটা কমেছে।

এই জ্যাম যাতে না থাকে কিংবা এই পথ ধরে সমগ্র উত্তরবঙ্গ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, ময়মনসিংহ এবং টাঙ্গাইলের গাড়ীগুলো যেন সহজে ঢাকা চলে আসতে পারে এই জন্যে কেবল এই একটি মাত্র সড়ক দিনকে দিন প্রশস্ত করার চেষ্টা হয়েছে। অথচ একটি বারের জন্যেও কেউ ভাবেনি এভাবে কেবল একটি মাত্র সড়ক বার বার প্রশস্ত না করে কিংবা একই সড়কের উপরে বিআরটি নামের নতুন ধারণায় প্রকল্প না নিয়ে আলাদা আরো দু’টি নতুন সড়কই হতে পারতো এর সহজ সমাধান এবং আশাতীত ভাবে কমতো জনদুর্ভোগ।

জনগণকে কোনরূপ ভোগান্তিতে না ফেলে অনায়েসে বতর্মান সড়কটির দু’দিকে দু’টি সম্পূর্ণ নতুন সড়ক বানাতে পারতো। একটি মাইল তিনেক পশ্চিমে আর অন্যটি মাইল তিনেক পূর্বে একেবারে রেলপথের দু’পাশ ঘিরে। বিশেষ করে রেল লাইনের দু’পাশ দিয়ে সড়ক বানালে না লাগতো জমি অধিকরণ, না হতো সড়ক নির্মাণের কারণে কোনরূপ জনদুর্ভোগ। বর্তমানে বিদ্যমান সড়কটিকে একই রকম রেখে এবং মানুষের চলাচলে বছরের পর বছর কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে খুব সহজেই এবং অল্প বাজেটে হয়ে যেত নতুন দুটি সড়ক। নতুন দুটি মাইলস্টোন।

এভাবে বংলাদেশের উত্তরের সব জেলার সব যানবাহন কোনরূপ বিড়ম্বনায় পড়া ছাড়া গাজীপুর চৌরাস্তা দিয়ে খুব সহজে ঢাকায় প্রবেশ করতো। আর মোট তিনটি মহাসড়কের কারণে গাজীপুরের উন্নয়ন হতো অভাবনীয় রকমের। গাজীপুর সিটি করপোরেশন হতো দৃষ্টিনন্দন এবং অধিকতর বসবাসযোগ্য। এবং বছরের পর বছর জনদুর্ভোগ এমন চরম আকার ধারণ করতো না।

অথচ এসব না করে শুরু হলো মহা বিরক্তিকর বিআরটি প্রকল্প। সড়কের মাঝখান দিয়ে দুই লেনের বিশেষ বাস চালু করতে যেয়ে দু’পাশের রাস্তাকে বরং সরু করে ফেলা হলো। বর্তমানের আট লেনের সড়কটি কোন কোন জায়গায় ছোট হয়ে দাঁড়ালো চার লেনে। এটা একটা কাজ হলো? বুঝলাম, বিআরটি চালু হলে সিটি বাস উঠে যাবে। কিন্তু পাবলিক গাড়ি আর দূরপাল্লার বাস তো উঠবে না। বরং নতুন নতুন বাস বাড়বে। তখন কি হবে?

কী আর হবে? হবে নতুন প্রকল্প, নতুন বাজেট। আর নতুন করে জনদুর্ভোগ। এভাবেই তো চলছে। অথচ এভাবে চলতে দেয়া উচিত না। একটু ভাবা উচিত। বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে প্রকল্প প্রণয়ন করা উচিত। উচিত, সময়মত প্রকল্প শেষ করা আর একটি প্রকল্পের সাথে অন্য প্রকল্পের সমন্বয় থাকা। সমন্বয়হীনতা বিপর্যয় ডেকে আনে। ডেকে আনে জঞ্জাল। মেগা প্রজেক্টের সাথে মেগা জঞ্জাল।

-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।