মৃত্যু নিয়ে রহস্য!

রাজশাহী অফসিঃ গত ১৫ জুলাই রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ডাইংপাড়া এলাকা থেকে গোলাম মোস্তফা (৫৫) নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশের শরীরে থাকা বিভিন্ন আঘাতের চিহ্ন দেখে স্থানীয়রা বলছেন, মোস্তফাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। পরিবারেরও দাবি, পূর্ব বিরোধের জেরে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। স্থানীয় ইউপি সদস্যও মনে করছেন, তাকে হত্যা করা হয়েছে। অথচ এ বিষয়ে কোনো ধারণা নেই স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আর পুলিশের। ফলে মোস্তফার মৃত্যু নিয়ে রহস্যের জট বেঁধেছে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি মোস্তফাকে হত্যা করেছে। আর সন্দেহভাজনদের সঙ্গে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের রয়েছে সুসম্পর্ক। তারা এলাকায় প্রভাবশালীও। তাই পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে মোস্তফার মৃত্যুর ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা দায়ের করতে দেয়া হয়নি। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে থানায় দায়ের করা হয়েছে একটি অপমৃত্যুর মামলা।

নিহত গোলাম মোস্তফা উপজেলার ফুলবাড়ি গ্রামের মৃত আবুল মিয়ার ছেলে। গত ১৫ জুলাই সকালে পাশর্^বর্তী ডাইংপাড়া গ্রামের একটি পুকুর পাড়ে বরই বাগানের পাশ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহতের ছেলে হিরু আলী জানান, ১৪ জুলাই রাতে তার বাবা বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। পর দিন সকালে স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুস সাদেক তাকে ফোন করে তার বাবার লাশ পড়ে থাকার বিষয়টি জানান।

হিরু বলেন, লাশের পিঠে লাঠি দিয়ে পেটানোর দাগ ছিল। নাভি ও তলপেটের আশপাশে অন্তত ৭টি ছিদ্র ছিল। এছাড়া পুরুষাঙ্গের নিচে ও পায়ে কিছুটা ক্ষত ছিল। রক্ত বের হচ্ছিল ডান হাতের কনুই, মাথা, নাক ও মুখ দিয়ে। তারা ধারণা করছেন, তার বাবাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

তিনি জানান, পাশর্^বর্তী উদপাড়া গ্রামের ভুট্টু, ডাইংপাড়া গ্রামের এলকি এক্কা, সোনা মিয়া, জাকব, ফার্মশিষ, এলরস ও পিতরসহ আরও কয়েকজন আদিবাসীর সঙ্গে তার বাবার আগে থেকেই বিরোধ ছিল। বিভিন্ন সময় তারা তার বাবাকে মারপিট ও হত্যার হুমকি দিত। তারাই তার বাবাকে পরিকল্পিতভাবে খুন করতে পারে। তবে এদের সঙ্গে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের সুসম্পর্ক থাকায় ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ জন্য থানায় হত্যা মামলাও দায়ের করা হয়নি।

নিহতের আরেক ছেলে সাজদার রহমান বলেন, তারা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করতে চান। কিন্তু হত্যার পর্যাপ্ত আলামত থাকা সত্ত্বেও পুলিশ বলেছে, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত হত্যা মামলা নেওয়া যাবে না। ফলে সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা এখন ময়নাতদন্তের রিপোর্টে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। আর মামলা না করার জন্য তাদের নানা মাধ্যমে হুমকি দিচ্ছে। এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরেও বেড়াচ্ছে। ফলে তারাই এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দেওপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান বলেন, এটি হত্যাকা- কী না তা তিনি জানেন না। নিহত মোস্তফার এলাকার কারও সঙ্গে বিরোধ ছিল কী না সেটিও তিনি জানেন না। আর নিহতের বাড়ি তার গ্রামে হলেও লাশ উদ্ধারের সময় তিনি সেখানে ছিলেন না।

তবে প্রেমতলী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) পার্থ কুমার বলেছেন, লাশের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুতের সময় স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বার (সদস্য) উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতিতেই লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

লাশের শরীরে কোনো জখম ছিল কী নাÑজানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মেজর’ কোনো জখম ছিল না। এমনি ছোট-খাটো দু’একটি আঘাত ছিল। তবে সেগুলো একজনকে হত্যার জন্য যথেষ্ট কী না তা নিয়ে সন্দেহ থাকায় থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়নি।

এদিকে স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুস সাদেক মনে করেন গোলাম মোস্তফাকে হত্যাই করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় এটি হত্যাকা-। তা না হলে ওই রকম একটি জায়গায় (যেখানে লাশ পড়ে ছিল) লাশ পড়ে থাকার কথা না। আমি লাশের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখেছি। নাক-মুখ দিয়ে রক্তও ঝরছিল।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গোদাগাড়ী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম আবু ফরহাদ বলেন, লাশ উদ্ধারের ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। আমরা ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি। সেটি এখনও পাওয়া যায়নি। রিপোর্টে যদি বলা হয় এটি হত্যা, তবে অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলায় রুপ নেবে।

রামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক এনামুল হক জানান, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রায় প্রস্তুত। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই সেটি থানায় পাঠানো হবে। তবে লাশের ময়নাতদন্তে কী পাওয়া গেছে, সে ব্যাপারে কিছু জানাতে রাজি হননি তিনি।