মৃত্যুদণ্ড পুনর্বিবেচনার আবেদন করবেন মীর কাসেম

48

যুগবার্তা ডেস্কঃ জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলী রিভিউ করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী মতিউর রহমান আকন। শনিবার দুপুরে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ বন্দি মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত মীর কাসেম আলীর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি সাংবাদিকদের কাছে এ কথা জানান।
মতিউর রহমান আকন বলেন, ‘৬ জুন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের লিখিত রায় প্রকাশ পেয়েছে। মীর কাসেম আলী রিভিও করবেন কি-না সে বিষয়ে জানার জন্য আজ আমরা এসেছিলাম। তিনি(মীর কাসেম আলী) আমাদের রিভিউ করার নির্দেশ দিয়েছেন।’
এর আগে মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেমসহ পাঁচ আইনজীবী গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ বন্দি এই জামায়াত নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বনিক জানান, শনিবার দুপুর ১২টার দিকে মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন, অ্যাডভোকেট নাজিবুর রহমান, অ্যাডভোকেট বজলুর রহমান ও অ্যাডভোকেট নুরু উল্লাহ মীর কাসেম আলীর সঙ্গে দেখা করতে কারাগারে যান। পরে কারাগারের একটি কক্ষে তারা ৪০ মিনিটের মত কথা বলেন।
চূড়ান্ত রায়
একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২০১২ সালের ১৭ জুন মতিঝিলে নয়া দিগন্ত কার্যালয় থেকে কাসেমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের বছর ৫ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার যুদ্ধাপরাধের বিচার।
২০১৪ সালের ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দুই অভিযোগে মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ড এবং আট অভিযোগে সব মিলিয়ে ৭২ বছরের কারাদণ্ড হয়।
এর ষোল মাস পর আপিলের রায়ে এক অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং আরও ছয় অভিযোগে ৫৮ বছর কারাদণ্ডের সাজা বহাল রাখে সর্বোচ্চ আদালত। মার্চে যখন ওই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়, মীর কাসেম তখন গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে। সেখানেই তিনি রায় শুনেছেন বলে কারা কর্তৃপক্ষ জানায়।
যে অভিযোগে ফাঁসি
অভিযোগ ১১: ১৯৭১ সালে ঈদুল ফিতরের পরের যে কোনো একদিন মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা চট্টগ্রাম শহরের কোনো এক অজ্ঞাত স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। তাকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের ফলে জসিমের মৃত্যু হলে আরো পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশসহ তার মৃতদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনালে তিন বিচারকের ঐক্যমতের ভিত্তিতে এ অভিযোগে মীর কাসেমের ফাঁসির রায় হয়। আপিলেও তা বহাল থাকে।
এ মামলার বিচারে রাষ্ট্রপক্ষ ৬৩ বছর বয়সী মীর কাসেমকে আখ্যায়িত করেছে পাকিস্তানের খান সেনাদের সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হওয়া ‘বাঙালি খান’ হিসাবে, যিনি সে সময় জামায়াতের তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় ছাত্রসংঘের বাছাই করা সদস্যদের নিয়ে গঠিত সশস্ত্র আলবদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার হিসেবে মীর কাসেম যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান, তা উঠে এসেছে এই রায়ে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, একাত্তরে তার নির্দেশেই চট্টগ্রাম টেলিগ্রাফ অফিস সংলগ্ন এলাকায় হিন্দু মালিকানাধীন মহামায়া ভবন দখল করে নাম দেওয়া হয় ডালিম হোটেল। সেখানে গড়ে তোলা হয় বদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের ঘাঁটি এবং বন্দিশিবির। সেখানে অসংখ্য মানুষকে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়, যাদের লাশ পরে ফেলে দেওয়া হতো চাক্তাই চামড়ার গুদাম সংলগ্ন কর্ণফুলী নদীতে।
ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর্যবেক্ষণে সেই ডালিম হোটেলকে বলা হয় ‘ডেথ ফ্যাক্টরি’। ডালিম হোটেল ছাড়াও নগরীর চাক্তাই চামড়ার গুদামের দোস্ত মোহাম্মদ বিল্ডিং, দেওয়ানহাটের দেওয়ান হোটেল ও পাঁচলাইশ এলাকার সালমা মঞ্জিলে বদর বাহিনীর আলাদা ক্যাম্প ও নির্যাতন কেন্দ্র ছিল সে সময়।
ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, “ডালিম হোটেলে ঘটে যাওয়া সবধরনের অপরাধের ব্যাপারে সবকিছুই জানতেন মীর কাসেম। এসব অপরাধে তার ‘কর্তৃত্বপূর্ণ’ অংশগ্রহণও প্রমাণিত। ফলে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৪ (২) ধারা অনুযায়ী তিনি ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের’ দোষে দোষী।”
ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মীর কাসেম ১৯৮৫ সাল থেকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ অর্থাৎ মজলিসে শুরার সদস্য হিসেবে দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। তিনি হলেন জামায়াতের পঞ্চম শীর্ষ নেতা, চূড়ান্ত রায়েও যার সর্বোচ্চ সাজার সিদ্ধান্ত এসেছে।