মিয়ানমারের ঐতিহাসিক নির্বাচন আজ

55

যুগবার্তা ডেস্কঃ মিয়ানমারের প্রথম অর্থবহ নির্বাচনের জন্য গতকাল সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। কয়েক দশকের সামরিক শাসনে থাকা দেশটিতে ঐতিহাসিক এ নির্বাচনে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল বিজয়ী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খবর এএফপি ও দ্য গার্ডিয়ান।

সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘদিন সামরিক শাসনের অধীন থাকা মিয়ানমার সংসদে এনএলডির সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেশটির রাজনৈতিক চিত্র বদলে দিতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তবে নির্বাচন প্রক্রিয়া, ফলাফল ও সে সম্পর্কে সরকারের মনোভাব কী হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

মিয়ানমারের বর্তমান প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন জানিয়েছেন, সরকার ও সেনাবাহিনী ভোটের ফলাফলকে সম্মান দেখাবে। এ সময় তিনি সংস্কারের পক্ষে জনগণের রায় প্রত্যাশা করেন। উল্লেখ্য, ২০১১ সালে জান্তা সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয়া সাবেক এ সেনাপ্রধান দেশটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেন।

থেইন সেইন বলেছেন, নতুন সরকারকে অবশ্যই সংবিধান মান্য করতে হবে। উল্লেখ্য, এর আগে সু চির এনএলডি বিজয়ী হলে প্রেসিডেন্ট অপেক্ষা বেশি ক্ষমতা ধারণ করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। থেইন সেইনের এ বক্তব্য ও সু চির অবস্থানকে ঘিরেই কিছুটা সংশয় কাজ করছে জনমনে।

এছাড়া দেশটির পশ্চিম রোহিঙ্গা প্রদেশের লাখখানেক মুসলিম ভোটারের ভোটদান নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ এরই মধ্যে প্রদেশটির বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা কিছু এলাকায় ভোটগ্রহণে বাধা প্রদানের ইঙ্গিত দিয়েছে।

এদিকে স্বাধীন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বড় সংখ্যক ভোটারের তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা করছেন। এ শঙ্কা বিশেষত বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় কাজ করতে আসা বিপুল সংখ্যক অভ্যন্তরীণ অভিবাসীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে তারা বলছেন।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক দলের প্রধান আলেক্সান্ডার গ্রাফ ল্যাম্বসডর্ফ বলেছেন, সামরিক এলাকায় অবস্থিত ভোটকেন্দ্রগুলোয় পর্যবেক্ষণের জন্য প্রবেশাধিকার দেয়নি সেনাবাহিনী। এ কেন্দ্রগুলোয় লক্ষাধিক ভোটার রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারলে এর স্বচ্ছতা নিশ্চিত হতো।

জানা গেছে, নির্বাচন সামনে রেখে দেশটির জনগণ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। বিশেষত ক্ষমতা ও রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর বারবার হস্তক্ষেপের ইতিহাসের কারণেই তারা এ সতর্কতা অবলম্বন করছে। এর আগে অসমর্থিত নির্বাচনের ফলাফলও অগ্রাহ্য করার ইতিহাস রয়েছে দেশটির সেনাবাহিনীর।

উইন মার উ নামে এক মুদিদোকানি এএফপিকে বলেছেন, আমি এ সরকারকে পছন্দ করি না। তারা দুর্নীতিগ্রস্ত। আমার মনে হয়, সু চি তাদের মতো হবেন না।

অন্য অনেকের মতোই ৩৬ বছর বয়সী উইন এবারই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছেন। ২০১০ সালের নির্বাচনে তিনি ভোট দেননি। উল্লেখ্য, নির্বাচনটি এনএলডি বর্জন করেছিল। আর ১৯৯০ সালে সু চির প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের সময় তার ভোট দেয়ার বয়সই হয়নি। সে নির্বাচনে সু চি একটি এলাকায় বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু সেনাবাহিনী সে ফলাফল বাতিল করে এবং ক্ষমতায় তাদের আসন পাকাপোক্ত করে।

তবে এবার একই সঙ্গে বড় ও দরিদ্র এ দেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়েছে। কিছু বিষয়ে সংশয় থাকলেও অন্য সময়ের তুলনায় এটি বেশ অর্থবহ। গতকাল ইয়াঙ্গুনে এরই অংশ হিসেবে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। অ্যাডভান্স ভোটিংয়ের অংশ হিসেবে অসুস্থ ও বয়স্কদের ভোটের জন্য বাড়ি বাড়ি ব্যালট নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

অং থেই নামে একজন নিরাপত্তাকর্মী বলেন, আমি আশা করি, প্রেসিডেন্ট তার দেয়া প্রতিশ্রুতি রাখবেন।

জাতীয় সর্বোচ্চ কার্যালয় থেকে সু চির ওপর প্রেসিডেন্ট হওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ সম্পর্কিত একটি সনদে বলা হয়েছে, বিদেশী কোনো নাগরিকের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ কোনো নাগরিক দেশটির প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। সু চির স্বামী ও সন্তান দুজনই ব্রিটিশ।

প্রসঙ্গত, মিয়ানমার ৫০ বছর ধরে কর্তৃত্ববাদী জান্তা সরকারের অধীন রয়েছে। এ সময়ে যাবতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে শক্তভাবে দমন করে ক্ষমতাসীন স্বৈরশাসক। বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশপাশি অর্থনৈতিক ধস নামে দেশটিতে। কিন্তু ২০১১ সালে সাবেক জেনারেল থেন সেইনের নেতৃত্বে জান্তা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে আধাসামরিক সরকার স্থাপিত হয়। তার পর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সামরিক নিয়ন্ত্রণ কমে আসতে থাকলেও সরকারের অভিসন্ধি বিষয়ে সংশয় দূর হয়নি। এ সংশয় এমনকি দেশটির সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে দেশটির সরকারি এক কর্মকর্তা বলেছেন, আমরা পরিবর্তন চাই। রাষ্ট্রপতি তার কথা আদৌ রাখেন কিনা, আমরা তাও দেখতে ইচ্ছুক।

মিয়ানমারের জনগণের আশাবাদী হয়ে ওঠার কারণ হিসেবে রাজনীতি বিষয়ে সু চির পৃথক দৃষ্টিভঙ্গির কথা উঠে আসছে। ১৯৮৮ সালে কঠোর হস্তে দমন করা একটি ছাত্র আন্দোলনের নৃশংসতা সম্পর্কে সু চি বলেছিলেন, এটা আমার পন্থা নয়। তার পর ২৫ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, তার নেতৃত্বাধীন এনএলডি সামরিক সরকারকে পরাজিত করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ দেশটির দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবে। দীর্ঘদিন কারাগার ও নজরবন্দি থাকা ৭০ বছর বয়সী সু চির দল এনএলডিকে ভাবা হচ্ছে ভবিষ্যৎ মিয়ানমারের স্বপ্নের বাহক।