মিডিয়াকে এড়িয়ে চলছেন অর্থমন্ত্রী পদত্যাগের গুঞ্জন

35

যুগবার্তা ডেস্কঃ হঠাৎই প্রাণচঞ্চল অর্থমন্ত্রী নীরব হয়ে গেলেন। একটি দৈনিকে সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে সরকারের মধ্য থেকেই সমালোচনা শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রীও অর্থমন্ত্রীকে কম কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন। এরপর থেকেই মিডিয়াকে এড়িয়ে চলছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তার বক্তব্যকে ভুল ব্যাখ্যা দেয়ায় তিনি অভিমান করেছেন বলে তার ঘনিষ্ঠরা জানান। তিনি অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এমন গুঞ্জন রয়েছে। এর আগেও তিনি একাধিকবার পদত্যাগ করতে চেয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তা হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামনে নতুন বছরের বাজেট। এছাড়া ২৫ মার্চ তিনি প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বাধীনতা পদক নেবেন। এটা তার জন্য গৌরবজনক। এ দুটি বড় বাধা না থাকলে অর্থমন্ত্রী নিশ্চিতভাবেই পদত্যাগ করতেন এমনটাই দাবি করেছেন তার নিকটজন। তবে ক্ষুব্ধ অর্থমন্ত্রী পদত্যাগ করলেও আগামী বাজেট পাস হওয়া পর্যন্ত থাকছেন। সরকারের উচ্চ পর্যায় সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রীর ওপর প্রধানমন্ত্রীর গভীর আস্থা আছে। তিনি মনে করেন, সরকারে অর্থমন্ত্রীর বিকল্প নেই।
অর্থমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, একটি জাতীয় দৈনিকের সাক্ষাৎকালে অর্থমন্ত্রী যা বলেছেন, তা মিথ্যা নয়। অপ্রিয় হলেও এসবই সত্যি। গভর্নরের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর অনেকদিন ধরেই দূরত্ব চলছে। কিন্তু রিজার্ভ চুরির এত বড় ঘটনা গভর্নর এক মাসেও জানাননি এটা অর্থমন্ত্রী মানতে পারছেন না। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর নিয়ে তিনি যা বলেছেন তা তার মনের কথা। কিন্তু অনেক কথাই তিনি বলেছেন অব দ্য রেকর্ডে। কিন্তু তা প্রকাশিত হওয়ায় বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন। বিশেষ করে এনবিআর চেয়ারম্যানের ধারাবাহিক ব্যর্থতায় অর্থমন্ত্রী ক্ষুব্ধ। তিনি এনবিআরে অবিলম্বে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পক্ষে থাকলেও বিশেষ মহলের বাধায় তিনি অসন্তুষ্ট। রাজস্ব প্রশাসনের লাগাতার অস্থিরতা ও কর্মকর্তাদের অসন্তোষ রাজস্ব আদায় ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে অর্থমন্ত্রী মনে করেন।
সোমবার সচিবালয়ে অফিস করেছেন অন্যদিনের তুলনায় ভিন্নভাবে। এর আগের সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত এবং অর্থনৈতিক সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি বৈঠকে তিনি যাননি। এ দুটি সভায় অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্ব করার কথা ছিল। গতকাল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পূর্বনির্ধারিত মন্ত্রিসভার বৈঠকেও অর্থমন্ত্রী যোগ দিয়েছেন অনেক দেরিতে। অন্যদিনের তুলনায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিজ অফিসেও সময় কম কাটিয়েছেন। পাশাপাশি সন্ধ্যায় ইআরডিতে অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনা থাকলে সেখানে সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। যদিও প্রতি বছর এ আলোচনায় বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকরা আমন্ত্রণ পান। মূলত অর্থমন্ত্রীর মিডিয়ামুখো না হওয়া এবং কথা না বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে তার ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন। এদিকে সোমবারও সকাল থেকে অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ নিয়ে চলে গুঞ্জন। সরকারের ভেতর ও বাইরে উভয়মুখী চাপে তিনি পদত্যাগ করছেন বলে চাউর হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর গভর্নর ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করেন। এছাড়া দু’জন ডেপুটি গভর্নর এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এস আসলাম আলমকে অপসারণ করেছেন অর্থমন্ত্রী। সরকারের নীতিনির্ধারণী এবং বাইরে বিষয়টি নিয়ে এখনও নানা আলোচনা চলছে। ফলে বিভিন্ন মহলের চাপে অর্থমন্ত্রী এক ধরনের নীরব ভূমিকার প্রশ্রয় নিয়েছেন।
জানা গেছে, সোমবার সকালে বাসা থেকে বের হয়ে অর্থমন্ত্রী সকাল সাড়ে নয়টায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিজ অফিসে আসেন। এরপর সেখান থেকে সকাল ১০টার পর মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে যোগ দিতে বেরিয়ে যান। তবে অন্যান্য দিন যথাসময়ে মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেও সোমবার একটু দেরিতে হাজির হয়েছেন। আবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পুনরায় ফিরে আসেন মন্ত্রণালয়ে। সেখানে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদসহ দু’জন সচিবের সঙ্গে দীর্ঘ সময় নিয়ে বৈঠক করেন। অন্যান্য দিন অর্থ মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার, দর্শনার্থী অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। কিন্তু সোমবার পুরো মন্ত্রণালয় এক ধরনের ফাঁকা ছিল। ছিল অনেকটা নীরব। মন্ত্রী রুমে বসে অফিস করলেও বাইরে থেকে কোনো ধরনের দৌড়ঝাঁপ ছিল না অন্য কর্মকর্তাদের। অর্থমন্ত্রীর অফিস দেখে বোঝার উপায় ছিল না তিনি ভেতরে বসে অফিস করছেন। কর্মকর্তারাও খুব বেশি অর্থমন্ত্রীর রুমে প্রবেশ করেননি। অফিসের অন্য কর্মচারীরাও ছিল শান্ত ও ব্যস্তহীন। বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে দুপুরের খাওয়ার উদ্দেশ্যে নিজ বাসায় যান অর্থমন্ত্রী। এরপর তিনি মন্ত্রণালয়ে ফিরে আসেনি। সব মিলে তিনি আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা অফিস করেছেন।
সন্ধ্যায় ইআরডিতে পূর্বনির্ধারিত বৈঠকে প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। সেখানে সাংবাদিকদের কোনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ইতিপূর্বে প্রাক-বাজেট আলোচনার কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। প্রতিটি বৈঠকে সাংবাদিকদের ডাকা হয়। সোমবার অর্থনীতিবিদদের নিয়ে এ বৈঠক ছিল। অন্যান্য বছর সেখানে ডাকা হলেও কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই এ পর্বে সাংবাদিকদের ডাকা হয়নি। এদিকে খোলামেলা বক্তব্যের কারণে অর্থমন্ত্রী দলের ভেতর নতুন করে সমালোচনার শিকার হয়েছেন। এমনকি স্বয়ং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যে কারণে একই দৈনিকে প্রকাশিত বক্তব্যের একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আবুল মাল আবদুল মুহিতের সফলতা অনস্বীকার্য। কিন্তু তার এসব সফলতাকে ম্লান করে দিয়েছে আর্থিক খাতের কয়েকটি বড় ধরনের দুর্নীতি। বিশেষত, হলমার্ক কেলেংকারি, বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেংকারি, বেসিক ব্যাংকে দুর্নীতি এবং সর্বোপরি শেয়ারবাজার কেলেংকারি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। শুধু তাই নয়, এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়াও সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে নিজের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে খোলামেলা বক্তব্য রেখেছিলেন মুহিত। যে কারণে এখন অনেকেই তার ওপর নাখোশ বলে জানা যায়।
এদিকে ১৮ মার্চ গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার/ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের এক সভায় অর্থমন্ত্রীর বাড়াবাড়ি রকমের আচরণ করেছেন বলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা। বৈঠকে নেতারা জানান, অর্থমন্ত্রীর অতিকথনের জন্য সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। একটি পত্রিকাকে দেয়া অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎকারের বিষয়ে উষ্মা প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, গভর্নরের পদত্যাগের পরও তাকে নিয়ে মন্ত্রীর এরকম প্রকাশ্য বক্তব্য তার বোধগম্য নয়।
আতিউর রহমানের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের বিষয়টি এভাবে পত্রিকায় না নিয়ে এলেই অর্থমন্ত্রী ভালো করতেন বলেও প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিদায়ী গভর্নরের প্রশংসাও প্রধানমন্ত্রী করেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুকরা জানান। প্রধানমন্ত্রী এ-ও বলেন, ‘আমি পদ্মা সেতুর জন্য অর্থমন্ত্রীর কাছে টাকা চেয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কোথা থেকে টাকা দেব?’ সেই টাকার ব্যবস্থা আতিউরই করে দিয়েছিল।’