মানব হলে তবেই না মানবাধিকারের প্রশ্ন!!

112

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ
গত সংখ্যায় ভূমিকম্প নিয়ে লিখেছিলাম। মনটা তখন খুবই ভারাক্রান্ত ছিল। সেই দুঃখে আক্রান্ত ভারী মন নিয়েই ঢাকা ছেড়েছি এপ্রিলের মাঝামাঝি। আমার শোনিমকে রেখে দূরে কোথায়ও গেলে এমনিতেও খুবই নিঃসঙ্গ লাগে। এর সাথে এবার যোগ হয়েছে জাপানী ভূমিকম্প। তবে এবার জাপানী নাগরিক ফুজিওয়ারা সান সাথে থাকাতে একাকিত্ব কিছুটা কম ছিল। ঢাকা থেকে চায়না হয়ে জাপান। পথে চায়নার কুনমিং এ যাত্রা বিরতিতে রাত্রি যাপন। মোটামুটি এটাই ছিল সফর পরিকল্পনা। এমনিতে একটু দেরী করেই এয়ারপোর্টে যাই। সাথে এবার সঙ্গী আছে বলে আগেভাগেই বের হলাম।
আগের রাতে বৃষ্টি হওয়া ঢাকার সকাল। চারিদিকে রৌদ্রকোজ্জ্বল এবং ফঁকফঁকা। আকাশ এবং রাস্তাঘাট; দুটোই পরিস্কার। এভাবে প্রকৃতি নিজে জল ছিটিয়ে ধুঁয়েমুছে পরিস্কার না করলে বাংলাদেশকে পরিস্কার করার জো নেই! এদেশে কাজের লোক আছে; কেবল কাজ করার লোক নেই! অবাক করা বিষয়! গেল সাত মাসের পরিচিত ঢাকা এয়ারপোর্ট আজ অচেনা মনে হলো। বাইরে তেমন মানুষজন নেই। কোথায়ও চেকপোষ্টের নামে জিজ্ঞাসাবাদ নেই, নেই হয়রানি। ফুজিওয়ারা সান এসব দেখে তো মহা অবাক। সে তো গত কয়েক মাস জিজ্ঞাসাবাদ আর হয়রানি দেখে দেখে অভ্যস্ত। পুলকিত নয়নে আমার কাছে বিষয়টি জানতে চাইলো। আমি নিজেও জানি না বলে অবাক হচ্ছিলাম আর জানার চেষ্টা করছিলাম যেন তাকে কিছুটা হলেও জানানো যায়।
অলিখিত রেড এলার্টের নামে গেল সাতটি মাস এক রকম জেলখানা বানিয়ে রেখেছিল দেশের প্রধান এই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটিকে। এয়ারপোর্ট মানেই হাই সিকিউরিটি, হাই এলার্ট। এটা খুবই সেনসিটিভ এলাকা, চলাচলে কঠিন সীমাবদ্ধতা। সংশি−ষ্ট লোকজন ছাড়া বাদবাকী সবার চলাচলে কঠিন নিষেধাজ্ঞা আছে। সে জন্যে নিরাপত্তার নামে করণীয় সবই করতে হবে; তবে বাড়াবাড়ি করে জেলখানা বানানো যাবে না। এতে করে মানুষের ভোগান্তি কত চরমে পৌঁছে, আমি নিজেই তার ভুক্তভোগী। সাধারণত কাউকে বিদায় দিতে বা স্বাগত জানাতে এয়ারপোর্টে আমার যাওয়া হয় না। ডিসেম্বরের শুরুতে গিয়েছিলাম এক নিকটাত্মীয়কে রিসিভ করতে। আমি একাই গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম যাবো আর আসবো; একাই পারবো।
ভাবনাটি কত বড় ভুল ছিল তা পৌঁছার পর টের পেলাম। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কনকোর্স হলে টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ঢোকার নিয়ম ছিল। ছিল টয়লেট এবং নামাজের ব্যবস্থা। অজস্র মশার কামড়ের কমতি না থাকলেও মোটামুটি বসে বসে দু’চার ঘন্টা কাটিয়ে দেয়া যেত। কেবল ঠোঁট চেপে মুখটি বন্ধ রাখলেই হতো যেন হুট করে গুনগুন করতে করতে অভিজাত এলাকার অভিজাত মশা মুখের ভেতরে ঢুকতে না পারে।
লক্ষ্য করলাম, বিশেষ নিরাপত্তার নামে পূর্বের সব নিয়ম স্থগিত করা হয়েছে। কোনভাবেই কারো ভিতরে ঢোকার অনুমতি নেই। বাইরে খাঁ খাঁ রৌদ্রের মাঝেই আগতরা স্বজনের আগমনের অপেক্ষায় থাকবে। তা যত ঘন্টাই লাগুক; কিংবা যত বৃষ্টিবাদলই থাকুক। সারাদেশ বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল থেকে মা-বোনেরা বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আসছে তাদের স্বজনকে হয় বিদায়, নয় অভ্যর্থনা জানাতে। তাদের জন্যে বাইরে বসার জায়গা তো ভাল, আশেপাশের ত্রি-সীমানায় একখানা টয়লেট পর্যন্ত নেই। এখানে রৌদ্রে পুড়ছে, বৃষ্টিতে ভিঁজছে। কেউ মাটিতে বসে, কেউ বা শুয়ে আছে; আর কেউ কেউ গ্রীলের ফাঁকফোঁকর দিয়ে ভেতরে দেখার চেষ্টা করছে কাঙ্খিত মানুষটি আসলো কিনা। টয়লেট না থাকলে বাংলাদেশে পুরুষেরা কোনভাবে কাজটি সেরে নিতে পারে। কিন্তু মা-বোনেরা? এদেশে কিডনী সমস্যা মহিলাদেরই বেশী হবার পেছনে এটাই মূল কারণ।
মুশকিল হলো বের হবার দুটি গেইট। দুটো দুই মাথায়। এমন কোন ব্যবস্থা ওখানে নেই যা দিয়ে বোঝা যায় কোন্ ফ্লাইটের যাত্রী কোন্ গেইট দিয়ে বের হচ্ছে। ভেতরে যাত্রীর যোগাযোগেরও কোন কায়দা নেই। আর মোবাইলের কল্যাণে তা থাকলেও যাত্রী নিজের গেইটের শানে নযুল জানে না বলে সামনের কাউকে ফলো করে পেছনের যাত্রী বের হতে থাকে; যে যেদিক দিয়ে পারে বের হয়। বাইরে অপেক্ষমান মানুষেরা একবার এই গেইটে কিছুক্ষন আর একবার সেই গেইটে কিছুক্ষন দৌঁড়াদৌঁড়ি করে পেরেশান হয়, হয়রান হয়। দেখলে মনে হয় হয়রান নয়, ক্রিকেটের রান নেবার জন্যে দৌঁড়াচ্ছে।
আমি জেলখানা দেখিনি; তবে ছোটবেলায় লঙ্গরখানা দেখেছিলাম। শত শত মানুষের খাবার পাওয়া নিয়ে আহাজারি, কাড়াকাড়ি আর এদিক সেদিক দৌঁড়াদৌঁড়ি। এয়ারপোর্টের বাইরে এসব মানুষদের দেখে ছোটবেলায় দেখা লঙ্গরখানার কথা খুব মনে পড়লো। এখানে খাবার নিয়ে নয়, কিন্তু কাঙ্খিত স্বজনকে পাওয়া নিয়ে এদিক সেদিক দৌঁড়াদৌঁড়ি আর পুলিশের বাড়াবাড়ি সে কথাকেই মনে করিয়ে দেয়। সাধারণ মানুষ যে প্রশাসনের কাছে কতটা অসহায় সেটা এয়ারপোর্টে এসে আরেকবার অনুভব করলাম।
আমি বিশ্বাস করি রেড এলার্টের দরকার ছিল এবং আছে। কিন্তু সে কি এভাবে? দরকার হলো এয়ারপোর্টকে সত্যিকার অর্থে সিকিউর্ট করা। অথচ বলতে গেলে আজো অনেকটাই ইনসিকিউর্ট। রানওয়ের চারপাশ খোলা। যে কেউ যখন তখন ঢুকে যেতে পারে। হাতে একখানা পাসপোর্ট এবং টিকিট সদৃশ্য কিছু একটা নিয়ে যে কেউ সহজেই টারমিনাল ভবনেও ঢুকে যাচ্ছে। সে আসলেই যাত্রী কিনা, নাকি সন্ত্রাসী, সেটা পরখ করার কেউ নেই। তাহলে এসব করে লাভ কি? বাইরে খোলা, অথচ ভিতরে যে কেউ কৌশলে অহরহ যেতে পারে; সে সব ঠিক না করে রেড এলার্টের নামে নিরিহ সাধারণ জনগনকে আটকে দেয়া হলো। রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো শত শত মেয়েছেলেকে; ফেলে দেয়া হলো তাদেরকে চরম ভোগান্তিতে। কি সেলুকাস! যেখানে সিকিউর্ট করা দরকার সেখানে করলো না। করলো, যেখানে না করলেও চলে, সেখানে। এটা বাংলাদেশ বলেই সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ হলো সব সম্ভবের দেশ।
যাই হোক, ১৭ই এপ্রিলে ঢাকা ছাড়ার সময় সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নিয়ে জানলাম রেড এলার্ট প্রত্যাহার হয়েছে বলে আর এয়ারপোর্টে হয়রানি নেই। সিভিল এভিয়েশনের দু’জন বড় কর্মকর্তার খামখেয়ালীর কারনে এই ভুল সিদ্ধান্তে সাতটি মাস জনগন ভোগান্তির স্বীকার হয়েছে। তবে খুশীর কথা এই যে সরকারের টনক নড়েছে, কর্মকর্তা বদল হয়েছে এবং জনগন পেয়েছে স্বস্তি। সব শুনে মনটা নিমিষেই ভাল হয়ে গেল। ভাল খবর শুনলে কার মন ভাল না হয়?
মোটামুটি এমনি ভাল মন নিয়েই পূরো জার্নি শেষ করলাম। কুনমিং থেকে সাংহাই হয়ে বিকেল পাঁচটার কিছু পরে পে−ন নামবে টোকিওর হানেদা এয়ারপোর্টে। আমিও মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছি। টোকিওতে দুটি এয়ারপোর্ট হানেদা আর নারিতা। আগে নিয়মিত নারিতা এয়ারপোর্ট ব্যবহার করতাম। ইদানিং বাদ দিয়েছি। রাত ১০টা থেকে ভোর ছয়টা অবধি নারিতা এয়ারপোর্ট বন্ধ থাকে; কোন পে−ন উঠানামা করতে পারে না। তাই সব ফ্লাইটে সব সময় নারিতা যাওয়া যায় না। যদিও এটি জাপানের সবচেয়ে বড় এয়ারপোর্ট।
এটি বন্ধ থাকার এক মজার কাহিনী আছে। ৩৫ বছর আগে সরকার যখন টোকিও শহর থেকে ৭০ কিঃমিঃ দূরে প্রশান্ত মহাসাগরের পাড়ে নারিতায় এয়ারপোর্টের জন্যে জমি অধিগ্রহন করে তখন বেঁকে বসে একজন মাত্র জমিওয়ালা। কিছুতেই তার জমি এয়ারপোর্টের জন্যে দেবেন না। সেই থেকে কোর্টে মামলা চলছে; ফয়সালা হয়নি আজ অবধি। কি আর করা। জাপান সরকার ওনার জায়গাটুকু বাদ দিয়েই এয়ারপোর্ট চালু করেছে ৩০ বছর আগে। প্রচন্ড ব্যস্ত নারিতা এয়ারপোর্ট। মিনিটে মিনিটে বিমান ওঠানামা করে। ওনার বাড়ীটি বড় বেড়া দিয়ে ঘেরাও করে চারপাশে এয়ারপোর্টের কার্যক্রম চলছে।
সমস্যা হলো বাড়ীটির অবস্থান এয়ারপোর্টের ঠিক মাঝামাঝি; আর চতুষ্পার্শ্বে রানওয়ে। চারিদিকে ঘেরাও দিলেও তার যাতায়াতের জন্যে প্রায় দুই কিঃ মিঃ সুড়ঙ্গ পথ তৈরী করে দিয়েছে সরকার যেন তিনি নিজের মত করে বাঁধাহীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন। রাতে যেন তার ঘুমের ব্যাঘাত না হয় সেই জন্যেই আদালতের নির্দেশে এয়ারপোর্টটি রাত দশটার পর বন্ধ থাকে। একজন মাত্র মানুষের ঘুমের জন্যে পূরো এয়ারপোর্টকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়।
কী কঠিন এদের মানবাধিকার আইন। এক দেশের সাধারণ একজন নাগরিকের সুনিদ্রার জন্যে রাত দশটার পর এয়ারপোর্ট বন্ধ করে দেয়া হয়, আর অন্য দেশের মানুষেরা সারা রাত্র এয়ারপোর্টের ভিতরে কিংবা বাইরে বিনিদ্রা যাপন করে। বাংলাদেশ ও জাপান একই মহাদেশের দুটো দেশ হলেও মানবাধিকার প্রশ্নে দু’দেশের অবস্থানে কত ফারাক। অবশ্য বাংলাদেশের এই আমরা যে আসলেই মানব এরই বা প্রমান কি? এদেশের বড় বড় মানুষদের কখনো ছোট ছোট মানুষকে মানব সন্তান হিসেবে মূল্যায়ন করতে তো দেখিনি। আমরা আমজনতা মানুষ হলেই না আমাদেরকে মানব ভাববে। মানব হলে তবেই না মানবাধিকারের প্রশ্ন আসে!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা