মাত্র একদিনের গণতন্ত্রের জন্যে এত কথা!!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন:

গণতন্ত্রের মানে জানা কি খুব জরুরী? হয়ত জরুরী; হয়ত জরুরী নয়। তবুও মানেটা জানে। সবাই না জানলেও কমবেশি অনেকেই জানে। কিন্তু খুব ভালভাবে নয়, মোটামুটি ভাবে জানে। পুরোপুরি জানে না। পুরোপুরি কি আমি নিজেও জানি? জানি না। এ নিয়ে আমার একাডেমিক পড়াশুনাও নেই। যদিও কোন কিছু ভাল করে জানার জন্যে একাডেমিক পড়াশুনাটা বাধ্যতামূলকও নয়।
আবার আমি না জানলেও দেশের গণতন্ত্রের কোন ক্ষতি এতে হবে বলেও মনে করিনা। কিন্তু যারা গণতন্ত্রের নামে এদেশে নিত্যদিন মন্ত্র পড়ছেন দীর্ঘ ৫০টি বছর ধরে, তাদের তো জানা উচিত। ভাল করেই জানা উচিত। তারা কতটা জানে, সেটা বোঝার জন্যে তাদের সাথে মাঝেমধ্যে কথা হয়। কথা শুনে এইটুকু বুঝি, তারা যতই জানার ভান করুক; খুব একটা জানেন এবং বোঝেন বলে মনে হয় না। জানা এবং বোঝার ভান করেন মাত্র।
মজার ব্যাপার হলো, গণতন্ত্র শব্দটি শুনলে ক্ষমতাসীনরা ছোটখাট একখানা কাশি দিয়ে এদিক ওদিক তাকান। কিন্তু বেশি আগান না। আগালে বিপদ আছে। কথা বাড়ালেই কথা বাড়ে। তাই আগাতে চান না। তাত্ত্বিক কথাবার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন। দেয়ালেরও কান আছে বলে ফিসফিস করে বলেন। গণতন্ত্রের এপিঠ ওপিঠ, দুইপিঠ নিয়েই কথা বলেন। তবে যা কিছুই বলেন, নিজের পিঠ বাঁচিয়ে বলেন। কথা শুনলেই বোঝা যায়, তিনি গণতন্ত্র বোঝেন বা না বোঝেন; নিজের পিঠ বাঁচানো ভালই বোঝেন।
অন্যদিকে ক্ষমতাহীনরা ঠিক উল্টো। গণতন্ত্রের কথা উঠলেই চোখ ছলছল করে ওঠে। জল ছলছল চোখে আগ্রহ নিয়ে কথা শুরু করেন। চমৎকার সব কথা। গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলে তারা পরম মজাও অনুভব করেন। বাংলাদেশে এই ক্ষমতাহীনরাই এখন গণতন্ত্রের একমাত্র প্রেমিক এবং উদ্ধারকর্মী। গণতন্ত্র উদ্ধার নয়; ক্ষমতা পুনরুদ্ধার। পুনরুদ্ধারের জন্যে তারা সাংঘাতিক পেরেশান। মুখে একটাই ছবক, নাইরে নাই! দেশে গণতন্ত্র নাই। কোট থাকলেও ঠোঁট নাই। ভাত আছে, ভোট নাই।
এসবই ঢংয়ের কথা; মুখের কথা। মনের কথা না। মনের কথা হলো, গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে তারা কোনভাবে ক্ষমতাসীন হতে চান মাত্র। আর কিচ্ছু না। ক্ষমতাসীন হয়ে গণতন্ত্র চর্চা করার কোন রের্কড তাদেরও নেই। তারা বর্তমান ক্ষমতাসীনদের চেয়েও বেশি দিন ক্ষমতাসীন ছিলেন। কোনদিন গণতন্ত্রের চর্চা করেননি। তাদের মুখে আর যাই মানাক, গণতন্ত্রের কথা মানায় না। তারা গণতন্ত্র বলতে বোঝেন একদিনের নির্বাচনতন্ত্র। পাঁচ বছরে মাত্র একদিনের জন্যে একটি মোটামুটি নির্ভেজাল নির্বাচন হবে। তারা জিতবেন। এরপর যেই সেই।
বর্তমানে গণতন্ত্রের মহাপ্রেমিক সাজাদের গুরু জাফরউল্লাহ ছিলেন স্বৈরাচারী সামরিক শাসক এরশাদের ঘনিষ্ঠ দোসর। বঙ্গভবনই ছিল তাঁর ঠিকানা। জীবনে যা কিছু বাগিয়েছেন, ঐ এক আমলেই বাগিয়েছেন। দুঃখ লাগে, এদের কাছ থেকেও এখন গণতন্ত্রের ছবক নিতে হয়! ওদের আমলে গণতন্ত্র কখনোই কি নিরাপদ ছিল? নাকি আদৌ ছিল? কিংবা গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য কোনকালেই কি অর্জিত হয়েছিল?
গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো উন্নয়ন এবং আইনের শাসন। এর একটিও এরা পূরণ করতে পেরেছে? পারেনি। পূরণের চেষ্টাও করেনি। ভিক্ষার থলি কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে দেশ বিদেশ। বাঙালী জাতি তথা বাংলাদেশকে বানিয়েছে ভিক্ষুকের জাতি। গরীব জাতি। আজো আরবেরা আমাদের মিসকিন বলে করুণা দেখাবার চেষ্টা করে। যদিও দেশে বর্তমানে দেদারসে উন্নয়ন হচ্ছে। গণতন্ত্রের লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে।
তারা যে গণতন্ত্রের কথা বলে এর মানে কি? শাহজাদা সেজে বনানীর হাওয়া ভবনে বসে কষে একটা ধমক দিয়ে বঙ্গভবনের রাষ্ট্রপতিকে বাড়ি পাঠানো? নাকি সেই রাষ্ট্রপতিকে রেলপথ দিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে তেজগাঁও পৌঁছানো? নির্বাচনকে গুড়া করে মাগুরা মার্কা নির্বাচনও নিশ্চয়ই গণতন্ত্রের প্র্যাকটিস নয়। তাহলে কোনটা গণতন্ত্র? বঙ্গবন্ধুর খুনী কর্ণেল রশিদকে সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বানানো? নাকি খুনী বজলুল হুদাকে এমপি বানানো?
তারা আসলে কোনকালেও গণতন্ত্র প্র্যাকটিস করেনি। মনের শখ পুরা করেছে মাত্র। এমনি করে মনের শখ পূরণের গণতন্ত্র তো আর জনগণ কম দেখে নাই। রাষ্ট্রপতি ভবন, প্রধানমন্ত্রী ভবনের পাশাপাশি হাওয়া ভবনের শাসনও দেখেছে। এই হাওয়া ভবনই দেশ চালাতো। চালাতো দেশের সকল বাণিজ্য। প্রধানমন্ত্রীর পুত্রবন্ধু খাম্বা মামুন দেশের সকল ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতো। নিজেও করতো, অন্যকে দিয়েও করাতো।
আর নির্বাচন এবং ভোট? ভোটের নামে হ্যাঁ, না ভোট দিয়ে নির্বাচনকে প্রহসনের নির্বাচন তো তাদের মূল নেতাই দেখিয়ে গেছেন। হ্যাঁ ভোটের বাক্স ৯৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আর তা দিয়েই জিয়াউর রহমান দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। হয়েছেন গণতন্ত্র আর বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা। শুধু কি তাই? তিনি নির্বাচন করেছেন সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়ে গণতন্ত্রের প্র্যাকটিস তিনি ছাড়া আর কেউ করেননি।
কে তিনি? ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট এর আগে দেশবাসী কেউ তাকে চিনতোই না। খুনী মোশতাকের বুদ্ধি; তিনবাহিনীর প্রধানদের আনুগত্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন। তাহলেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেয়া যায়। রশিদ দৌঁড়ে গেলো ক্যান্টনমেন্টে। গণতন্ত্র আর সংবিধান রক্ষা করার কথা সামান্য না ভেবে সেনাপতিরা সহজেই রাজি হয়ে গেলেন। এবং আধঘণ্টার মধ্যে তিন বাহিনীর প্রধান ঢাকা বেতার ভবনে হাজির হলেন। সাথে বাড়তি হিসেবে গায়ে পড়ে হাজির হলেন জিয়াউর রহমান।
অবাক লাগে মাত্র তিনবছর আগে তারা ফাটিয়ে যুদ্ধ করেছেন। তারা সবাই বীরোত্তম! কিন্তু বীরত্ব দেখানো তো দূরের কথা, গণতন্ত্র নিয়ে ভাবা পরের কথা, রাষ্ট্রপতিকে হত্যার সামান্য একটা প্রতিবাদ পর্যন্ত করলেন না। দুই মেজরের বাধ্যগত কর্মচারীর মতো মোশতাক আনুগত্য স্বীকার করে নিলেন। এই বীরোত্তমরা মাত্র দুই মেজরের নির্দেশে নিজেদের দায়িত্ব এবং কর্তব্যকর্ম ভুলে সেদিন খুনিদের পক্ষাবলম্বন করে স্পষ্ট করেছেন বীরের মর্যাদা রাখার যোগ্যতা তাদের নেই। দেশকে অসাংবিধানিক পথে নিয়ে গেছেন তারা।
মোস্তাকের ক্ষমতা দখলের অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু নিহত হবার মাত্র আটদিন পরে দেখা গেল এই জিয়াউর রহমানই পুট করে দেশের সেনাপ্রধান হয়ে গেছেন। এমনি এমনি হয়েছেন? মোশতাক বানিয়েছেন? বললেই মানুষ বিশ্বাস করবে? মানুষ কি এতই বলদ? কিচ্ছু বোঝে না? মুজিব হত্যায় তিনি সম্পৃক্ত না থাকলে, সাজানো ঘটনায় তিনি জড়িত না থাকলে খুনীরা এমনি এমনি সেনাপ্রধান শফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াকে সেনাপ্রধান করে?
এই হলো সেই আমলে তাদের গণতন্ত্রের নমুনা। আর এই আমলে ঘটনা এতো সাজানো লাগে না। বিরোধীদল কথায় কথায় এত ফ্যাসর ফ্যাসর করে। তাই শেষ করে দাও। রাতে নয়, দিনেই শেষ করে। এত রাগঢাকের কিছু নেই। দিনে-দুপুরে সরাসরি বিরোধী দলীয় নেত্রীর গণসমাবেশের উপর গ্রেনেড মেরে নেত্রীকে মেরে ফেলো। কেল্লা ফতে। কেল্লা ফতের চেষ্টাও একদিন হলো। সত্যকে আড়াল আর মামলার আলামতকে গুম করে মামলা সাজানো হলো। জজমিয়া মামলা।
বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে গুম নিয়ে বিস্তর অভিযোগ। অথচ গ্রেনেড হামলা মামলার শুধু আসামী নয়, নথীও গুম করে দিয়েছিলেন তারা। আর বঙ্গবন্ধুর খুনীদের দেশ থেকে বিদেশে পাঠিয়ে দূতাবাসে পোস্টিং দিয়েছিলেন। এবং অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ভাবে সংসদে আইন করে ইনডেমনিটি দিয়ে ধুম করে গুম করে দিলেন হত্যাকান্ডের বিচারের পথ। হায়রে বহুদলীয় গণতন্ত্রের আইনের শাসনের নমুনা!
তবে দিন সব সময় সমন যায় না। মাত্র কয়েক দিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোর শহরের একটি সড়ক থেকে সেই সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের নাম অপসারণ করলো বাল্টিমোরের মেয়র অফিস। একজন সামরিক শাসক তথা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভেঙ্গে মার্শাল ল’র মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করা আর ইনডেমনিটি দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচারের পথ বন্ধ করা ব্যক্তির নামে সড়কের নামকরণ করে সম্মান জানাবে না আমেরিকা।
প্রিয় পাঠক! কি মনে হয়? এটাও কি শেখ হাসিনা করিয়েছেন? শেখ হাসিনার কি এতই পাওয়ার যে তাঁর কথায় আমেরিকান সরকারও চলে? যদি তাই হয়, তাহলে আর এত দাবী দাওয়া কেন? ঐ রকম একজন পাওয়ারফুল মানুষেরই তো দরকার বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে। যাঁর কথায় আমেরিকার মত দেশ চলে, তাঁর মত নেতাই তো লাগবে আমাদের। তাহলে আর কিছু না থাকুক, একদিনের নির্বাচনী গণতন্ত্র না থাকুক; শেখ সাহেবের স্বাধীন বাংলায় শেখের বেটির অভাবনীয় উন্নয়নের ছাপ তো অন্তত থাকবে!!