মাগুরছড়ার ক্ষতিপূরণের দাবীতে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি

42

মৌলভীবাজার প্রতিনিধিঃ ১৪ জুন মাগুরছড়া দিবস। ১৯৯৭ সালের এইদিনে মাগুরছড়ায় দায়িত্বহীনতার কারণে যে ব্লো-আউট ঘটেছে এবং গ্যাস সম্পদ, পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। এবার মৌলভীবাজার গ্যাসফিল্ডের মাগুরছড়া ব্লো-আউটের ১৯ বছর পূর্ণ হলো।
মাগুরছড়া ব্লো-আউটে গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ১৪ হাজার কোটি টাকা মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি অক্সিডেন্টাল-ইউনোকল-শেভরনের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবীতে আজ ডাকযোগে ও শ্রীমঙ্গলের ইউএনওর মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এর আগে শ্রীমঙ্গল চৌমুহনাতে মানববন্ধন সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি’র সাধারণ সম্পাদক ও ওয়ার্কার্স পার্টি নেতা বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আমিরুজ্জামান, আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক) ফাউন্ডেশন শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি আফসার আহমদ ছবদর, যুব মৈত্রী নেতা জামাল মুশরাফিয়া, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অজিত বুনার্জী, ক্লীন শ্রীমঙ্গলের সুজাউদ্দীন হামীম, ভানু লাল রায়, অনুপ ভট্টাচার্য ইন্টারন্যাশনাল ডায়লগ এইড ফাউন্ডেশন ইডাফের শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো: নাছির আহমেদ প্রমূখ।
মঙ্গলবার সকালে ক্ষতিপূরণ আদায়সহ ১০ দফা দাবিতে মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি(National Committee to realize the Compensation for Damaging Gas Resource & Environment in Magurcherra ), আরপি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম(rpnews24.com ), তেল গ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক) ফাউন্ডেশন, শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত উক্ত কর্মসূচীতে সাংবাদিক কাওছার ইকবাল, এমসিডার নির্বাহী পরিচালক তহিরুল ইসলাম মিলনসহ সর্বস্তরের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
মানববন্ধন সমবেশে মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি’র সাধারণ সম্পাদক ও ওয়ার্কার্স পার্টি নেতা বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, এতদিন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ, পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংসের হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মার্কিন কোম্পানী অক্সিডেন্টাল-ইউনোকল-শেভরনের কাছ থেকে আদায় করা যায় নি। সরকার এর দায়-দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।
মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ, পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংসের হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মার্কিন কোম্পানী অক্সিডেন্টাল-ইউনোকল-শেভরনের কাছ থেকে আদায়ে বর্তমান সরকারও বিশেষভাবে তৎপর হচ্ছেন না। তবে আমরা মনে করি, বর্তমান সরকারকেই এই বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা এই বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
তিনি আরও বলেন, মাগুরছড়া গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের পরপরই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহফুজুল ইসলামকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি এক মাসের মধ্যে ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে ১৯৯৭ সালের ৩০শে জুলাই মন্ত্রণালয়ের সে সময়ের সচিব ড.তৌফিক-ই-এলাহি চৌধুরীর কাছে দু’টি ভলিউমে প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার তদন্ত রিপোর্টটি জমা দেয়। পরবর্তীতে বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এ বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, ক্ষতিপূরণ পাওয়া ও বিতরণের বিষয়ে তদন্ত কমিটির সদস্য ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি তাজুল ইসলামকে আহবায়ক করে ৩ সদস্যের একটি সাব কমিটি গঠন করে। কমিটির অন্য দু’জন সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের এমপি ইমরান আহমেদ ও জাতীয় পার্টির এমপি মুকিত খান। তদন্ত কমিটির একজন সদস্য সাব-কমিটিকে জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে অক্সিডেন্টালের ব্যর্থতার জন্যই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। কমিটির তদন্তে অক্সিডেন্টালের কাজে ১৫/১৬টি ত্রুটি ধরা পড়ে।
মাগুরছড়া ব্লো-আউটে গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ১৪ হাজার কোটি টাকা মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি অক্সিডেন্টাল-ইউনোকল-শেভরনের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবীতে ডাকযোগে ও শ্রীমঙ্গলের ইউএনওর মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপিতে ১০ দফা দাবী তুলে ধরা হয়।
দাবিসমূহ হচ্ছেঃ ১. মাগুরছড়ায় দায়িত্বহীনতার কারণে যে ব্লো-আউট ঘটেছে এবং গ্যাস সম্পদ, পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তার জন্যে অক্সিডেন্টাল-ইউনোকল-শেভরনের কাছ থেকে কমপক্ষে ১৩,৭৬৮.৪৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে আদায় করুন। ২. মাগুরছড়ায় গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের কারণে পরিবেশগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত আনারস, লেবু, ভূমি, বসত বাড়ি, পশু পাখি, প্রাকৃতিক শোষণ ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক উৎপাদন, পশু পাখির বসতি, ভূপৃষ্ঠস্থ প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ, ভূগর্ভস্থ পানি স্তরের অধোগমন, প্রাণ বৈচিত্র, ভূমিস্থ অনুজীব, বনজ সম্পদ এবং মৃত্রিকার যে অপূরণীয় ক্ষতি, সেই ক্ষতিপূরণ আদায় করুন। ৩. মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ, বন, পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংসের অপরাধে অক্সিডেন্টাল কোম্পানীর বিরুদ্ধে তার দেশের গাফিলতি আইন(Law of Negligence ) কঠিন দায়িত্বের আইন(Law of Strict Liability ) ও ক্ষতিপূরণের আইন(Law of Compensation )এর আওতায় আদালতে মামলা দায়ের করুন। ৪. গ্যাস ও তেল উত্তোলন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিদেশী তেল কোম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত অসম, অযৌক্তিক, লুণ্ঠন ভিত্তিক, জাতীয় স্বার্থবিরোধী, দেশের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতিকর উৎপাদন অংশীদারী চুক্তিগুলো অবিলম্বে বাতিল করুন। ৫. গ্যাস ও তেল হলো জনগণের সম্পত্তি, এর মালিক সমগ্র জনগণ, তাই জনগণের অবগতির জন্য এ যাবৎকালে সংগঠিত সব আলোচনা, চুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করুন। ৬. বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান খনিজ সম্পদ লুণ্ঠন, অপচয় করার প্রক্রিয়ায় জড়িত যেই হোন না কেন তাদের চিহ্নিত করুন। ৭. বিদেশী কোম্পানিকে মুনাফা যোগান দেয়ার জন্যে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ-এর পরামর্শে দেশের উৎপাদনশীল খাত ক্ষতিগ্রস্ত করে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো বন্ধ করুন। ৮. দেশের শিল্পায়ন ও উৎপাদনশীল সামগ্রিক উন্নয়ন চাহিদা বিবেচনা করে এবং তার সঙ্গে সমন্বিতভাবেই গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই অনুসন্ধানের প্রক্রিয়ায় আগামীতে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রতিবছর দেশীয় কোম্পানি উত্তোলিত গ্যাস বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থের অন্তত শতকরা ২০ ভাগ গ্যাস অনুসন্ধান, উত্তোলন গবেষণা শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, প্রভৃতি কাজে ব্যয় করুন। ৯. দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে পঙ্গু করা চলবে না। গ্যাস অনুসন্ধান উত্তোলনের দায়িত্ব প্রধানতঃ বাপেক্সকে দিতে হবে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ১০. শহর-গ্রামে তথা দেশের সর্বত্র এবং কলে-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করতে হবে।