মমতা নিয়ে নার্সদের কথা শুনুন

27

প্রভাষ আমিনঃ ডাক্তারদের চেয়ে নার্সরা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে অসহায় অবস্থায় হাসপাতালে যান, তখন নার্সরাই সার্বক্ষণিকভাবে তাদের পাশে থাকেন। ডাক্তারদের বিরুদ্ধে আমাদের অনেক অভিযোগ থাকলেও নার্সদের বিরুদ্ধে অভিযোগ শোনা যায় খুব কম। সাদা পোশাক পড়লেই অন্যরকম এক স্নিগ্ধতা ভর করে নার্সদের অবয়বে। সব নার্সকেই আমার কাছে মমতাময়ী মনে হয়। সত্যি কথা বলতে কী আমি এখন পর্যন্ত কোনও মমতাহীন নার্স দেখিনি।
নার্সদের নিয়ে অনেক অসাধারণ প্রেম কাহিনি আছে। ‘দ্বীপ জ্বেলে যাই’ ছবিতে নার্সের চরিত্রে সুচিত্রার অনবদ্য অভিনয় এখনও দর্শক হৃদয়ে ভালোবাসার দ্বীপ জ্বেলে আছে। অনেকদিন ধরে আমার ধারণা ছিল নার্স মানেই নারী। তবে এ ধারণা ঠিক নয়, অনেক পুরুষ নার্সও আছেন। ব্যাচ, মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নিয়োগের দাবিতে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা বেকার নার্সেস এসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ বেসিক গ্র্যাজুয়েট নার্সেস সোসাইটি বেশ কয়েকদিন ধরেই আন্দোলন করছে। কিন্তু সরকার তাদের দাবির তোয়াক্কা না করেই, গত শুক্রবার পিএসসির অধীনে নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে নিয়েছে। আন্দোলনরত নার্সরা দাবি করেছেন, দুই-তৃতীয়াংশ নার্স নিয়োগ পরীক্ষা বর্জন করেছে। কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম দাবি করেছেন, ৯০ ভাগ নার্স পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, যেহেতু নার্সদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তাই পিএসসি পরীক্ষা ছাড়া তাদের নিয়োগের কোনও বিকল্প নেই। কার দাবি সত্য, নার্সদের দাবি কতটা যৌক্তিক আমি জানি না, কিন্তু তারা বেশ কয়েকদিন ধরে রাস্তায় আন্দোলন করছে।
গত বুধবার রাতে আন্দোলনরত নার্সরা ধানমণ্ডিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বাসা ঘেরাও করতে গিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ তাদের নির্মমভাবে পিটিয়েছে। তাতে অনেকেই আহত হয়েছেন। একজন গর্ভবতী নার্সের গর্ভপাত হয়েছে বলেও পত্রিকায় পড়েছি। উল্টো পুলিশ নার্সদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। মোহাম্মদ নাসিম একজন ক্যারিয়ার পলিটিশিয়ান। নিজে রাজপথে দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছেন, পুলিশের পিটুনি খেয়েছেন। নিজে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পুলিশ চালিয়েছেন। দুই দিক থেকেই তিনি জানেন, পুলিশ কতটা নিষ্ঠুর হতে পারেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কি রাজপথে আন্দোলন করা নিষিদ্ধ? মোহাম্মদ নাসিমদের চেয়ে বেশি রাজপথে আন্দোলন তো আর কোনও দল করেনি। তাহলে আজ তারা যে কোনও আন্দোলনের ব্যাপারে এতটা কঠোর হয়ে যান কেন? ভয়ে?

বিরোধী দল জাতীয় পার্টি সরকারের পোষা, রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি রাজপথে নেই। নার্সরা আন্দোলন করে তো সরকার পতন ঘটিয়ে ফেলবে না। তাহলে এত ভয় কেন? মোহাম্মদ নাসিম যদি নার্সদের একটি প্রতিনিধিদলকে ডেকে তার বাসায় নিয়ে চা খাইয়ে একটু মমতা দিয়ে তাদের কথা শুনতেন, তাহলেও তো তারা একটু সান্তনা পেতো। নার্সরা নিশ্চয়ই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মুখের ওপর বেয়াদবি করতো না। নার্সরা আপনার বাড়িতে গেল, আপনি তাদের চা না খাইয়ে লাঠি দিয়ে আপ্যায়িত করলেন!
মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, আপনি নিজেও জানেন, লাঠি দিয়ে আন্দোলনকে ভয় দেখানো যায়, দমন করা যায় না। মানুষের মনে ক্ষোভের আগুনটা ধিকি ধিকি জ্বলতেই থাকে। লাঠিচার্জ করার চেয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা সহজ। নার্সরা এত মমতা নিয়ে রোগীদের পাশে থাকে, আমরা কি একটু মমতা নিয়ে তাদের পাশে থাকতে পারি না? তাদের কথাটা একটু সহানুভূতি নিয়ে শুনতে পারি না?-লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিষ্ট