মন্ত্রিপরিষদ থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত এরশাদের ‘আইওয়াশ’, উল্টো আরো দুই মন্ত্রী দাবি!!

62

যুগবার্তা ডেস্কঃ জাতীয় পার্টি সরকারে থাকছে না। মন্ত্রিপরিষদ থেকে বেরিয়ে আসছেন এমন সিদ্ধান্তও নাকি হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মন্ত্রিপরিষদ থেকে বেরিয়ে আসার মুখরোচক সিদ্ধান্ত নিছক ‘আইওয়াশ’ বলে মনে করা হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ থেকে বেরিয়ে আসা তো দূরের কথা উল্টোপাল্টা দলের আরো দু’জন সিনিয়র নেতাকে মন্ত্রী করার জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে তদবির করা হচ্ছে বলেও দলের একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
দলটির শীর্ষ নেতারা এ ব্যাপারে অনানুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা না দিলেও আপাতত চুপ থাকার কৌশল নিয়েছেন। পার্টির আসন্ন জাতীয় সম্মেলনের পর এ বিষয়ে নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
এ দিকে দীর্ঘদিনের মন কষাকষি ও সব মান অভিমান ভুলে আবারো একমঞ্চে পাশাপাশি বসলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং তার সহধর্মিণী ও সংসদে বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ। নানা টানাপড়েনের পর একমঞ্চে পাশাপাশি এরশাদ-রওশন দম্পতির হাস্যোজ্জ্বল মুখো”ছবি এবং ভাব বিনিময়ের দৃশ্য ছিল চোখে পড়ার মতো। দলের এ দুই শীর্ষ নেতার এমন মহামিলন দেখে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে যেন প্রাণ ফিরে এসেছে। উজ্জীবিত নেতাকর্মীদের চোখে-মুখে ছিল অনেকটা স্বস্তির হাসি। এরশাদ নিজেও ছিলেন উজ্জীবিত ও আনন্দে উদ্বেলিত।
দীর্ঘদিন পর এমন মধুর মিলন প্রসঙ্গে এরশাদ বলেছেন, রওশন এরশাদকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান হিসেবে পেয়ে আমার হৃদয় আনন্দে উদ্বেলিত। আমাদের নতুন যাত্রা একসাথে শুরু হচ্ছে। তার এই উপস্থিতিতে আমার হৃদয় আনন্দে ভরপুর। এ আনন্দ জানানোর ভাষা নেই। দলে দুর্যোগের ঘনঘটা শেষ হয়েছে। এ দিনটি জাতীয় পার্টির জন্যও আনন্দের দিন।
জাতীয় পার্টির প্রধান কার্যালয়ের সামনে মে দিবসের শ্রমিক সমাবেশে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি হিসেবে এক সাথে মঞ্চে বসেছিলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ। শ্রমিক পার্টির সমাবেশে দলের দুই শীর্ষ নেতাকে এক সাথে পেয়ে কর্মীরা ছিলেন খুশিতে আত্মহারা। অনুষ্ঠানে শুধু রওশনই নন, রওশনের সাথে এসেছিলেন দীর্ঘদিন পার্টির কর্মকান্ডে না আসা প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা, কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, নূর-ই-হাসনা লিলি চৌধুরী এমপিসহ
অন্তত ১৩ জন এমপি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরশাদ ও রওশনের মাঝে বিদ্যমান এই বিরোধ মাঝে মধ্যে বরফ গললেও দলের বিভিন্ন ইস্যুতে একাধিকবার মুখোমুখি হয়েছেন এরশাদ-রওশন।
সর্বশেষ ১৭ জানুয়ারি জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান এবং ১৯ জানুয়ারি জিয়াউদ্দিন বাবলুকে বাদ দিয়ে এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারকে মহাসচিব বানানোর পর থেকে মুখোমুখি অবস্থান নেন এরশাদ ও রওশন। মুখোমুখি এ অবস্থানে অধিকাংশ দলীয় এমপি রওশনের পক্ষে অবস্থান করায় বেশ বিপাকে পড়েন এরশাদ। একপর্যায়ে রওশনকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান না করা হলে এরশাদের কোনো সভা-সমাবেশে যোগ দেবেন না বলে ঘোষণা দেন রওশন অনুসারী এমপিরা। এরশাদ যখন কিছুতেই এ দাবিতে কর্ণপাত করছিলেন না তখন গত সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলন করে জাপার আসন্ন অষ্টম জাতীয় কাউন্সিল বয়কটের ইঙ্গিত দেন রওশন।
রওশনের ওই আলটিমেটামের পর এরশাদ দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে বিশেষ করে জি এম কাদের ও রুহুল আমিন হাওলাদারের সাথে পরামর্শ করে রওশনকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান পদে ঘোষণা দেন। এতে দলের কর্মীরা খুশি হলেও একটি অংশ এখনো খুশি হতে পারেননি। রওশনের ভাগ্য নির্ধারিত হলেও জিয়াউদ্দিন বাবলুর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি এরশাদ। ফলে যে ঐক্যের কথা বলা হচ্ছে তা মুখরোচক আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করছেন অনেকেই। দলে আবার কোন ঝড় আসে তাই দেখার অপেক্ষায় তারা।
এ দিকে হঠাৎ করে রওশন এরশাদকে দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা হিসেব-নিকেশ ও মুখরোচক আলোচনা। কেউ কেউ মনে করছেন, রওশনের পার্টির জাতীয় সম্মেলন বর্জনের হুমকিতেই কুপোকাত হয়েছেন এরশাদ। কেউ আবার মনে করছেন এর ঠিক উল্টোটি। এ অংশের মতে রওশনের হুমকি নয়, সরকারের উপর মহলের চাপেই নত হয়েছেন এরশাদ।
এ ব্যাপারে অবশ্য দুটি মত জানা গেছে, একটি হচ্ছে- ঘোষণার দু’দিন আগে বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করে তার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। কারণ তারও আগে রওশনের হুমকির জবাবে এরশাদ কড়া ভাষায় পাল্টা বিবৃতি দিয়েছেন। ওই বিবৃতিতে এরশাদ বলেছেন, রওশন এরশাদ সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে যে বক্তব্য রেখেছেন তা এখতিয়ারবহির্ভূত। তিনি পার্টিকে কারো একক সম্পত্তি বা কোনো কোম্পানি নয় বলে মন্তব্য করে সংগঠনকে হেয় করেছেন। তাকে মনে রাখতে হবে, সংসদীয় দল পার্টির একটি শাখা মাত্র। এই শাখার দায়িত্ব-পার্টির নীতিমালা অনুসারে শুধু সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা। নীতিনির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা বা পর্যালোচনার ফোরাম হচ্ছে পার্টির প্রেসিডিয়াম।
তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রের ৩৯ ধারা পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে আমার সৃষ্টি করা নয়। এটা জাতীয় কাউন্সিলে গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি ধারা। এই ধারা বলেই রওশন এরশাদকেও দলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যারা ১৫-১৬ বছর দলের বাইরে ছিলেন তাদেরও দলে ফিরিয়ে এনে প্রেসিডিয়াম পদ দেয়া হয়েছে। পার্টির বর্তমান প্রেসিডিয়ামের অন্তত ৩৫ জন সদস্যই ৩৯ ধারা বলে প্রেসিডিয়ামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এটি যখন কারো পক্ষে যায় তখন এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী ধারা হয়ে যায়। আর যখন স্বার্থের বিপক্ষে যায় তখন এটা ‘অগণতান্ত্রিক’ হয়ে পড়ে। এই মানসিকতা থাকা উচিত নয়।
জাপা ও সরকারের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এরশাদের ওই বিবৃতির পরই রওশন এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। এই সাক্ষাতের পর রংপুরে যান প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা। ওই দিন এরশাদ গঙ্গাচড়ার দলীয় সমাবেশে রাঙ্গাকে পাশে রেখে রওশন এরশাদকে জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। উপস্থিত নেতাকর্মীরা দলের ঐক্যের স্বার্থে এরশাদের এ ঘোষণা সমর্থন জানান। ওই দিনই এরশাদের প্রেস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সেক্রেটারি সুনীল শুভরায় স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়ে দেয়া হয়।
অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, রওশন এরশাদকে পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করতে এরশাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে অন্য পন্থাও নেয়া হয়। এরশাদকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় যে, এ মাসেই মঞ্জু হত্যা মামলার পুনঃতদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিচ্ছে তদন্ত সংস্থা। এতেই এরশাদ অনেকটা দুর্বল হয়ে রওশনকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করার সিদ্ধান্ত নেন।
যদিও এরশাদ বলেছেন, আমি নেতাকর্মীদের সম্মতি নিয়েই রওশনকে কো-চেয়ারম্যান করেছি। রংপুরের গঙ্গাচড়া জনসভায় আমি হাজার হাজার উপস্থি’ত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সম্মতিতেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার এ সিদ্ধান্তের ফলে দলের মাঝে সব দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেছে। জাতীয় পার্টির মধ্যে প্রাণ ফিরে এসেছে। জাতীয় পার্টি আগে ঐক্যবদ্ধ ছিল না। রওশনকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করায় আজ আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। আমরা এক সাথে থাকব, এক সাথে চলব।
পার্টির একাধিক সিনিয়র নেতা বলেছেন, কোনো ধরনের চাপে নয়- পার্টির ঐক্যের স্বার্থেই স্যার (এরশাদ) রওশন ম্যাডামকে কো-চেয়ারম্যান করেছেন। অন্যথায় পার্টি ভেঙে যেতো। কারণ জি এম কাদেরকে দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা হিসেবে অধিকাংশ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও এমপিরা মেনে নিতে পারছিলেন না। রওশনকে সিনিয় কো-চেয়ারম্যান এরশাদ সাহেব বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। দলকে নিশ্চিত ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। মন্ত্রিপরিষদ থেকে বেরিয়ে আসা প্রসঙ্গে ওই নেতারা বলেন, এটা আসলে এক ধরনের আইওয়াশ। বেরিয়ে আসা তো দূরের কথা পার্টির অপর কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও বর্তমান মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারকে মন্ত্রী করতে এরশাদ তদবির করছেন বলে শুনেছি। ফলে সরকারের মেয়াদে আর মন্ত্রিপরিষদ থেকে জাপা সদস্যদের বেরিয়ে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই বলেও তারা জানান।মাছুম বিল্লাহ্, আমাদের সময়.কম