‘মধুর’ দ্বন্দ্বে টালমাটাল জাপা

92

যুগবার্তা ডেস্কঃ হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করছে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে। দলটি বরাবরই অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ভুগেছে। ভুগছে এখনো। একাধিকবার ভাঙন দেখা জাপা আবার ভাঙনের মুখে বলে অনেকে মনে করছেন।
এরশাদ গত রোববার ছোটভাই জিএম কাদেরকে পার্টির কো-চেয়ারম্যান করার পরদিনই বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ নিজেকে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন।
রওশনের এই ঘোষণায় ক্ষিপ্ত এরশাদ রংপুর থেকে ঢাকায় ফিরেই জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে পার্টির মহাসচিবের পদ থেকে জিয়াউদ্দিন বাবলুকে অব্যাহতি দিয়ে রুহুল আমিন হাওলাদারকে আবার মহাসচিব করেছেন। এরশাদের এই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেছে রওশনের নেতৃত্বাধীন দলের সংসদীয় বোর্ড। তবে এত কিছুর পরও কোনো পক্ষই কাউকে বহিষ্কার বা পাল্টা বহিষ্কার করেনি।
ফলে জাতীয় পার্টির এই অবস্থায় এক ধরনের ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। আসলে দলটিতে কী হতে যাচ্ছেন তা এখনো স্পষ্ট নয়। দলটি কি আসলেই ভেঙে যাচ্ছেন নাকি এটি এরশাদ-রওশনের নাটক, তা নিয়েও চলছে নানা মুখরোচক আলোচনা। পার্টিতে এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দলের নেতাকর্মীরা। কে কার পক্ষে অবস্থান নেবেন- তা নিয়ে বেশির ভাগ নেতাকর্মীই এখন দোটানায় পড়েছেন।
জাতীয় পার্টি পরিচালনায় বরাবরই মূল কান্ডারি হলেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। অনেকে এরশাদের একক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে দলটিতে বিভক্তি আনার চেষ্টা করেছেন বহুবার। আবার কেউ কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থে দল থেকে চলে গিয়ে নতুন দল গঠন করেছেন। কিন্তু মূল ধারার রাজনৈতিক দল হিসেবে এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি এখনও স্বমহিমায় বহাল তবিয়তে টিকে আছে। এই শক্ত অবস্থানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মঙ্গলবার বনানীস্থ দলীয় চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে আসা নেতাকর্মীদের অনেকে বলেন, ‘দলের প্রতিষ্ঠাতা এরশাদ যেখানে জাতীয় পার্টির অস্তিত্ব সেখানে। এর বাইরে কিছু নেই। আর যারা নেতিবাচক কিছু করার চেষ্টা করেছেন তারা সবাই আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন।’
১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি গঠনের ঘোষণায় বলা হয়েছিলো ‘দেশের সকল গণতন্ত্রকামী জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক শক্তিগুলোর বিভক্তির প্রবণতা কাটিয়ে একটি একক রাজনৈতিক দলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা থেকে জাতীয় পার্টি গঠন করা হয়েছে।’
কিন্তু, দেখা যাচ্ছে আগের মতো সেই ঘোষণার ঠিক উল্টো ব্যাপার ঘটছে এখন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের শরিক জাতীয় পার্টি একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করছে। সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন রওশন এরশাদ। দল থেকে মন্ত্রীও আছেন কয়েকজন। আর দলের চেয়ারম্যান এরশাদ নিজেই প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ক্ষমতা ভাগাভাগির জের ধরে আগে যেমন জাতীয় পার্টিতে ভাঙন ধরেছিলো, দ্বন্দ্বে আবারও সেই একই টালমাটাল অবস্থায় দলটি।
এর আগে বিএনপিবিহীন দশম সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণের বিপে ছিলেন এরশাদ। হাওলাদারও সেই পক্ষ নেন। অন্য দিকে রওশনের নেতৃত্বে পার্টির আরেকটি অংশ নির্বাচনে থাকার পক্ষে অবস্থান নেয়। বাবলু ছিলেন সেই পক্ষে। বর্জন করেও আইনের মারপ্যাঁচে সেই ভোটে জিতে সংসদ সদস্য হয়েছেন এরশাদ, পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের পদ। একই সাথে রুহুল আমিন হাওলাদার নির্বাচনের বিপক্ষে থাকলেও নিজে ও স্ত্রী রত্না আমিন হাওলাদারও এমপি হয়েছেন। আর বিএনপির বর্জনে রওশন হয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা। পরে রুহুল আমিন হাওলাদারও রওশনের পক্ষে অবস্থান নেন। ভোট নিয়ে এমন মতভেদের জেরে ২০১৪ সালের এপ্রিলে জাতীয় পার্টির মহাসচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় হাওলাদারকে। নতুন মহাসচিব হন রওশনঘনিষ্ঠ বাবলু। তখন জাতীয় পার্টির নেতাদের সরকারে থাকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দুই পরে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই এরশাদ বলেছিলেন, রওশনই তার কান্ডারি।
যদিও এরশাদ বলেন, দুইজন নেতা আমার এবং আমার স্ত্রী রওশন এরশাদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই, থাকতে পারে না। আগের রাতে সভাপতিমন্ডলীর যে বৈঠকে রওশনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়েছে- সেই সভা রওশন ডাকেননি বলেও দাবি করেন এরশাদ। আমার স্ত্রী রওশন দলের এরশাদ প্রেসিডিয়াম মেম্বার। প্রেসিডিয়াম মিটিং ডাকার এখতিয়ার একমাত্র আমার। আমি এখনো চেয়ারম্যান আছি। সিদ্ধান্ত কেবল আমিই দিতে পারি। পার্টির দিকটি আমিই দেখি আর রওশন দেখেন পার্লামেন্টারি বডি। আমাদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই, দ্বন্দ্ব কখনো ছিলও না। সোমবার যা হয়েছে তা প্রেসিডিয়াম মিটিং ছিল না। রওশন কোনো মিটিং ডাকেননি। রওশনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার যে ঘোষণা এসেছে, তা দেয়ার বাবলু কে? প্রশ্ন করেন এরশাদ।মাছুম বিল্লাহ, আমাদের সময়.কম