মক্কা-মদিনা হুমকিতে পড়লে সৈন্য পাঠাতে পারে বাংলাদেশ

79

যুগবার্তা ডেস্কঃ পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনা সন্ত্রাসী হামলার হুমকিতে পড়লে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে সৈন্য পাঠানোর কথা বিবেচনা করতে পারে বাংলাদেশ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এ সামরিক জোটে শুধু গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের মধ্যেই সীমিত থাকবে বাংলাদেশের তৎপরতা। মক্কা নগরীর পবিত্র কাবা শরিফ ও মদিনায় হযরত মুহাম্মদ (স.) রওজা মোবারকে মসজিদে নববী অবস্থিত। সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ পবিত্র এ দুই মসজিদের খাদেম। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবেইর মঙ্গলবার চার ঘণ্টার ঝটিকা সফরে ঢাকায় এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় তিনি শেখ হাসিনার কাছে বাদশাহ সালমানের শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সংক্ষিপ্ত ও ঝটিকা সফর হলেও বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিপূর্বে ১৯৮৩ সালে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। ফলে ৩৩ বছর পর সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেন। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ৩৪ দেশের সামরিক জোটে বাংলাদেশের যোগদানের পর এ জোটের কার্যপরিধি এবং বাংলাদেশের অংশগ্রহণের মাত্রা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা ও বিতর্ক চলছে। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শেখ হাসিনার গতিশীল ও সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বে বাংলাদেশ যে উন্নতি করেছে তার ভূয়সী প্রশংসা করেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সৌদি সামরিক জোটে অংশ নেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে তার সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী জিরো টলারেন্স নীতির কথা সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছেন। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নীতিকে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে যাবে বলেও জানিয়েছেন। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এটাও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ কোনো একক দেশের নেতৃত্বে সামরিক জোটে সৈন্য পাঠায় না। শুধু জাতিসংঘের অধীনে বু­ হেলম্যাটধারী বাহিনীতে সৈন্য পাঠিয়ে থাকে। মুখোমুখি যুদ্ধে কমব্যাট ফোর্স হিসেবে কোনো দেশেই সৈন্য পাঠায় না বাংলাদেশ। এ কারণে সৌদি সামরিক জোটে গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং বেসামরিক অংশে কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে বাংলাদেশ। সূত্রটি আরও জানায়, পবিত্র দুই মসজিদে হামলার আশংকা দেখা দিলে বিশেষ বিবেচনায় বাংলাদেশ সৈন্য পাঠাতে পারে। ঢাকায় উচ্চ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেছেন, সৌদি আরব বাংলাদেশের অবস্থানের বিষয়টি অনুধাবন করেছে এবং এ নিয়ে বাংলাদেশের ওপর তাদের বাড়তি কোনো চাপ নেই। বাংলাদেশ থেকে সৈন্য পাঠানোর কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবও দেয়নি তারা। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরোধী শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করে মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্ব ধরে রাখতে চাইছে সৌদি আরব। এ লক্ষ্যে তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে পাশে রাখতে চায় সৌদি আরব। সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া এবং সিরিয়ার কারণে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে মারাত্মক চাপে পড়েছে। ইরান ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে সেই উত্তেজনার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি নেতারা তাদের মিত্র দেশগুলোর দিকে অধিকহারে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। তার অংশ হিসেবে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবেইর বাংলাদেশ সফর করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঢাকায় আসার পূর্বে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য ভারত সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এদিকে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌদি আরব সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। সৌদি আরব ১৪ ডিসেম্বর ঘোষণা করে যে, তারা ৩৪টি মুসলিম দেশ নিয়ে একটি সন্ত্রাসবিরোধী সামরিক জোট গঠন করেছে। এ জোটে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসরসহ সুন্নিপ্রধান দেশগুলো যোগ দিয়েছে। তবে ইরান, ইরাক, সিরিয়াসহ অনেক মুসলিম দেশ এতে যোগ দেয়নি। এ জোটের আওতায় রিয়াদে একটি সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ কেন্দ্র থেকে সন্ত্রাসকবলিত বিভিন্ন দেশ যেমন- ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম সমন্বয় করা হবে। সৌদি আরব সন্ত্রাসবিরোধী এ জোট গঠনের ঘোষণা দেয়ার পর পরই বাংলাদেশ রিয়াদে সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে এ জোটে যোগদানের কথা ঘোষণা করে। সৌদি সামরিক জোট নিয়ে বাংলাদেশ উভয় সংকটে পড়েছে। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান, সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং মুসলিম উম্মাহয় সৌদি আরবের প্রভাবের কথা বিবেচনায় তাদের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতে পারছে না। অপরদিকে জাতিসংঘের আওতার বাইরে সৈন্য না পাঠানোর বাংলাদেশের মৌলিক নীতি, একক জোটে সৈন্য না পাঠানোর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, নিরংকুশ রাজতন্ত্রের দেশ সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক বিষয়ে দহরম মহরম করা নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তীব্র সমালোচনা এবং ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিবেচনা করে সৌদি জোটে সৈন্য পাঠাতেও পারছে না বাংলাদেশ। এমন পরিস্থিতিতে সরকার এখন পবিত্র মসজিদের সুরক্ষার বিষয়টি ছাড়া কোনোভাবেই সৈন্য না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ সৌদি আরবের সঙ্গে বন্ধুত্বকে খুবই মূল্য দিয়ে থাকে। ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশ হিসেবে দু’দেশের রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্ক। ব্যবসা-বাণিজ্য অনুসন্ধানে এ সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাচ্ছে। সৌদি আরবে বাংলাদেশের শ্রমিকদের নিয়মিতকরণের জন্য সে দেশের সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে সৌদি আরবের বিনিয়োগ কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্মের নামে কিছু লোক ইসলামের বদনাম করছে, সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করছে যা মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি করছে। অথচ ইসলাম শান্তির ধর্ম। মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকায়ন করার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে সৌদি বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর প্রত্যাশা করেন। দু’দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির আশা প্রকাশ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী ও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইসলাম হচ্ছে শান্তি ও সহিষ্ণুতার ধর্ম। চরমপন্থাকে দমন করতে হবে। অন্যথায় তা অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়বে এবং মুসলিম উম্মাহর ভাবমূর্তি ও স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সাক্ষাতে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল জুবেইর বলেন, ইসলাম ভালোবাসা, শান্তি ও ক্ষমার শিক্ষা দেয়। অথচ সন্ত্রাসীরা ইসলামের মূল্যবোধকে অবজ্ঞা করছে। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে, চরমপন্থার বিরুদ্ধে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মিডিয়ার অংশগ্রহণ জরুরি বলেও জানান সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আদেল আল জুবেইর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নতি ও অগ্রগতির প্রশংসা করেন। পারস্পরিক স্বার্থে আগামীতে বিভিন্ন খাতে দু’দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের দেশে কর্মরত বাংলাদেশী কর্মীদের ‘কঠোর পরিশ্রমী’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশী কর্মীরা সৌদি আরবের উন্নয়নে অবদান রাখছেন।