ভোটের রাজনীতিতে পিছিয়ে জাপা

57

যুগবার্তা ডেস্কঃ আগামী মার্চ মাসে ইউপি নির্বাচন। চারদিকে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। শুরু হয়ে গেছে ভোটের রাজনীতি। নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে শুরু হয়েছে দৌড়ঝাঁপ। যে যার মতো লবিং করছেন। বড় দুটো দল শুরু করেছে মাঠ পর্যায়ের জরিপ।এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে জাতীয় পার্টি। তারা ছুটছে আওয়ামী লীগের পেছনে।
ভোট হবে, তৃণমূল পর্যায়ের নেতৃত্ব নির্ধারণ হবে। মানুষের সামাজিক উন্নয়ন ও শহরবাসীর সমস্যার সমাধান দেবেন পৌর-মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা।
পৌর নির্বাচনে জাপার ব্যাপক ভরাডুবি হয়েছে। পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ অভিযোগ করছেন, সরকারে থাকার কারণে তাদের জনপ্রিয়তা কমেছ। তাই তারা সরকার থেকে বের হতে চান।
দল বলতে রাজনীতিতে শুধু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিই থাকবে বলে মন্তব্য করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ।
২০১৫ সালের ৮ জুলাই রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে জাতীয় পার্টির ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা আয়োজিত ইফতার পার্টিতে তিনি এ মন্তব্য করেন।
‘রাজনীতির মাঠ শূন্য’ মন্তব্য করে জাপা চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিএনপির কোনো অস্তিত্ব নেই। দল বলতে রাজনীতিতে শুধু আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিই থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। রাজনীতিতে সম্ভবত আমরাই থাকব এবং আগামীতে এককভাবে নির্বাচন করব।’ প্রসঙ্গত, ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে ভরাডুবি হয় জাতীয় পার্টির। এরপর তিন সিটি নির্বাচনে দল সমর্থিত প্রার্থীরা জামানত হারায়।
আসন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়ন নির্বাচনে এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে আহ্বায়ক ও এ্যাড. রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়াকে সদস্য সচিব করে ৭ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সাত সদস্য বিশিষ্ট এ নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এস.এম. ফয়সল চিশতী, সদস্য সচিব করা হয়েছে পার্টির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এ্যাড. মো. রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়াকে। কমিটির সদস্যরা হলেন, পার্টির যুগ্ম মহাসচিব গোলাম মোহাম্মদ রাজু, নুরুল ইসলাম নুরু, যুব সংহতির সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন ও জাতীয় পার্টির দপ্তর সম্পাদক সুলতান মাহমুদ।
তিনি বলেন, ‘জেলা এবং উপজেলা নির্বাচন পরিচালনা কমিটি নির্বাচন সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যা ও জটিলতা কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটিকে অবহিত করবেন।’
এরশাদসহ দলটির নেতারা মনে করছেন, আগামী দিনে নির্বাচনে ফলাফল ভালো করতে হলে তাঁদের সরকারবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। তা না হলে নির্বাচনে তাঁদের আগের চেয়েও ভোট কমে যাবে। সরকারের সঙ্গে গাঁটছড়া বহাল থাকলে ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে জাপার বর্তমান অবস্থাও টিকিয়ে রাখা যাবে না বলে আশঙ্কা তাঁদের। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জাপার মিত্র বা সমর্থক দেশগুলোও অন্তত তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে জাপার অবস্থান দেখতে চায়। তারা চায়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের সমীকরণের মধ্যে জাপা ভারসাম্য বজায় রাখুক। অন্তত ভোটের রাজনীতির তৃতীয় শক্তি হিসেবে দলটি টিকে থাক। কারণ এটি থাকলে সরকার গঠন বা প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর দাবি, মন্ত্রিসভা ছাড়ার ব্যাপারে জাপার মিত্র ওই দেশগুলোর সমর্থন রয়েছে। তারা সবুজ সংকেত দিয়েছে। ওই সংকেতই সরকার থেকে পদত্যাগের উদ্যোগ নিতে এরশাদকে সাহস জুগিয়েছে।
গত ১৮ জানুয়ারি এরশাদ তাঁর ভাই গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান এবং ২০ জানুয়ারি জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে সরিয়ে রুহুল আমিন হাওলাদারকে দলের মহাসচিব নিযুক্ত করেন। এরশাদের নেতৃত্বে দলের এই অংশ সরকার থেকে বেরিয়ে সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা রাখার পক্ষপাতি। তবে দলের প্রেসিডিয়ামের সদস্য বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের সমর্থক বলে পরিচিত নেতারা মন্ত্রিসভায় থাকতে আগ্রহী। এরশাদের আমন্ত্রণে কোনো বৈঠকে তাঁরা যোগ দিচ্ছেন না। মন্ত্রিসভায় থাকা না থাকা নিয়ে কার্যত জাপা নেতারা এখন দ্বিধাবিভক্ত।
সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট অংশ নেয়নি। ১৫৪টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি আসনগুলোর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৭২.৫৯ এবং জাপা ৭.২১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল।
২০০৮ সালের নির্বাচনে জাপা ৭.০৪ শতাংশ ভোট পেয়ে ২৭টি আসন, ২০০১ সালের ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে ৭.২৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৪টি আসন, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ১০.৬৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ৩২টি আসন এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ১১.৯২ শতাংশ ভোট পেয়ে ৩৫টি আসন লাভ করে জাপা।
বস্তুত গত পাঁচটি নির্বাচনেই তৃতীয় শক্তি হিসেবে টিকে আছে জাপা। কিন্তু এবারই প্রথম বিরোধী দলে থাকা সত্ত্বেও মন্ত্রিসভায় রাখা হয়েছে জাপাকে। এতে সরকার ও বিরোধী দল এখন অনেকটাই একাকার হয়ে গেছে। ফলে জাপার ‘বিরোধীদলীয়’ চরিত্র হারাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ কারণে সর্বশেষ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত উপজেলা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ সরকারের কোনো নির্বাচনেই জাপা সুবিধা করতে পারেনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের পাশাপাশি দলটির নেতাকর্মীদের বড় অংশও মনে করছে, এভাবে চলতে থাকলে একসময় জাপা আওয়ামী লীগের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে। দলের অস্তিত্ব বলতে কিছু থাকবে না।
জানতে চাইলে জি এম কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টি কখনোই বলেনি যে আমরা সংসদ থেকে বের হব। আমরা বলছি, এখন যেভাবে জাপা চলছে তাতে দেশের জনগণ মনে করতে পারে যে এই দলের আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই। এরা সরকারেরই অংশ। ফলে কর্মী-সমর্থক এবং ভোটাররা জাপার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। আগামী নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে। তাই আমরা আগামী নির্বাচনের প্রশ্নে ভোট হিসাব-নিকাশ করে দেখছি। মনে করছি, সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়ে থাকলে অন্তত দু-তিন পার্সেন্ট ভোট বেশি পাব। মন্ত্রিত্ব সুবিধাপ্রাপ্ত তিন-চারজন ব্যক্তির জন্য পুরো দল ধ্বংস হতে পারে না।’
এক প্রশ্নের জবাবে মহাজোট সরকারের সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ভোট কখনো ভাগ হয় না। অ্যান্টি-আওয়ামী লীগ ভোট ভাগ হয়। ফলে সেদিকে খেয়াল রেখেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে।’
দলটির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারও মনে করেন, ভোটের রাজনীতি করতে চাইলে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা ছাড়া জাপার সামনে অন্য কোনো পথ খোলা নেই। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘সরকারকে আমরা আশ্বস্ত করতে চাই যে সংসদে আমরা থাকব। কিš‘ সরকারে থাকলে জাপা সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। আগামী নির্বাচন যখনই হোক না কেন, ভোটের হিসাব জাপাকে বিবেচনায় রাখতে হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জাপা সংসদে থাকছে। ফলে সরকার অ¯ি’তিশীল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমরা উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিতেও টিকে থাকতে চাই।’এম কবির, আমাদের সময়.কম