ভোটের আগে জোটের ছড়াছড়ি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সরগরম জোটভিত্তিক রাজনীতি। আদর্শগত বিরোধ থাকলেও নির্বাচনী ইস্যুতে গাঁটছড়া বাঁধছে দলগুলো। প্রায়শই নতুন নতুন জোট গঠনের খবর আসছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটছে প্যাডসর্বস্ব ভূইফোড় রাজনৈতিক দলের। কেবল নতুন জোট হয়ে থেমে থাকছে না,কয়দিন পরে ভেঙ্গেও যাচ্ছে। চলছে ভাঙ্গা গড়ার খেলা। এতে ছোট দল ভেঙে আরো ছোট হচ্ছে। কতগুলো দল বর্তমানে দেশে আছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে নির্বাচন কমিশন সূত্র বলছে, বর্তমানে দেশে আড়াই শতাধিক রাজনৈতিক দল এবং ১৩টি রাজনৈতিক জোট আছে। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দল ৩৯টি। নিবন্ধন লাভের জন্য আবেদন করেছিল ৭৬টি দল। তবে শর্ত পূরণে ব্যর্থতার কারণে তাদের কোনটিকে নিবন্ধন প্রদান করা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী কোন দল নিবন্ধিত না হলে নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দ পায় না। নির্বাচন কমিশনের সুযোগ-সুবিধা পায় না। তবে জোটে কোন একটি দল যদি নিবন্ধিত থাকে তাহলে সেই দলের প্রতীক নিয়ে জোটভুক্ত অন্যদলগুলো নির্বাচন করতে পারে। আর নিবন্ধিত কোন দল জোটে না থাকলে নির্বাচন করতে হবে স্বতন্ত্র।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জোট গঠনের পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বেখবর হয়ে যাচ্ছে এসব দল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছোট দলগুলো নিজেদের সুযোগ-সুবিধার জন্য বিভিন্ন জোটে যায়। বড় দলগুলোও নির্বাচনে প্রভাব বাড়াতে ছোট দলগুলোকে জোটে টানে।

গত তিন দিনে হয়েছে নতুন দুইটি জোট। গতকালও ৭ দলের জোট হয়েছে একটি। বাম প্রগতিশীল কমিউনিস্ট ভাবধারার রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে নতুন এ জোটের নামকরণ করা হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য’। দুই দিন আগে শুক্রবার ঘোষণা করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ঐক্যফ্রন্ট’ নামের একটি জোট। এই জোটে রয়েছে ৩৯টি দল। যার সবগুলোই অনিবন্ধিত ও ব্যক্তি-প্যাডসর্বস্ব। শুক্রবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই জোটের ঘোষণা দেন গণতান্ত্রিক ঐক্য ফ্রন্টের চেয়ারম্যান লামিনাল ফিহা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে নতুন পুরানো মিলে জোটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ টি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট, ড.কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়া অন্যদের সক্রিয় কর্মকাণ্ড তেমন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

বিএনপি, গণফোরাম, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও নাগরিক ঐক্য মিলে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট হওয়ার পর বিএনপি তাদের পুরানো জোট ২০ দলের পরিবর্তে ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে মাঠে নেমেছে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের নেতৃত্বাধীন ৫৯ দলীয় জোট গঠনের এক সপ্তাহ পরে বেরিয়ে যায় ইসলামি সমমনা ১১টি দল। এরপর এই ‘সম্মিলিত জাতীয় জোট’ ভাঙতে ভাঙতে এখন কয়টা আছে তা কেউ জানেন না। গত বছরের মে মাসে এই ঢাউস আকারের জোট গঠনের সময় এরশাদ ঘোষণা দিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে নির্বাচনে বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। যদিও এই জোটে মাত্র দুইটি দল ছিল নিবন্ধিত। গত শনিবার ’সম্মিলিত জাতীয় জোটের’ ব্যানারে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করেন এরশাদ। সেখানে এই ’বিশাল’ জোটের মাত্র তিনটি দলের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। মঞ্চে বক্তব্য রাখেন ইসলামিক ফ্রন্ট, ন্যাশনাল এলায়েন্স ও খেলাফত মজলিশের নেতারা। সিপিবির মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় বাম গণতান্ত্রিক জোট রাজপথে সক্রিয় না থাকলেও বিবৃতিতে সক্রিয়।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর অনিবন্ধিত ১৫টি ইসলামি ও সমমনা রাজনৈতিক দল মিলে গঠিত হয় নতুন জোট ‘ইসলামিক ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (আইডিএ)’। তাদের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের অধীনে ১৪ দলীয় মহাজোটকে শক্তিশালী করা এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করা। এই জোটের প্রধান মিছবাহুর রহমান চৌধুরী। বিএনপির সাবেক নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বে ৩১ দলের বাংলাদেশ জাতীয় জোট গঠন হলেও তাদের কোন হদিস নেই। ’বর্তমান রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের উদ্দেশ্যের কথা জানিয়ে কিছুদিন আগে চারটি বাম রাজনৈতিক দল একজোট হয়েছে। নাম রাখা হয়েছে ‘বাম ঐক্যফ্রন্ট’। তবে তাদের তত্পরতা প্রেসরিলিজেই বেশি। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নামে একটি জোট হয়। যা এখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্তর্ভুক্ত। অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট নামে একটি জোট হয় যা ঐক্যফ্রন্ট থেকে তিনি বাদ যাওয়ার পর ভেঙ্গে গেছে। যুক্তফ্রন্ট এখন ঐক্যফ্রন্টে। ইসলামি গণতান্ত্রিক জোটে দলের সংখ্যা ৭। তবে তারা জোট ঘোষণার পর আর কোন কার্মকাণ্ডে নেই। এনপিপির নেতৃত্বে হয়েছিল ১০ দল। তাদের ঘোষণাই সার। আবদুল লতিফ নেজামির নেতৃত্বে আছে ইসলামি ঐক্যজোটের একাংশ। আর এক অংশ আছে ২০ দলীয় জোটে। এছাড়াও আছে আরো জোট। আরো কয়েকটি জোট ও ফ্রন্ট গঠনের তত্পরতা চলছে বলে জানা গেছে। তারাও আত্মপ্রকাশ করবে।-ইত্তেফাক