ভূমিকম্প রীতিমত হৃদকম্প তৈরী করছে!!!

120

– ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ
আমরা যখন বাংলাদেশে গেল বাংলা নববর্ষের সন্ধ্যা উপভোগে ব্যস্ত, ঠিক সেই মধুর সময় বড় একটি ভূমিকম্পে জাপানের দক্ষিনাঞ্চল প্রায় লন্ডভন্ড হয়ে যায়। রিকটারস্কেলে যার মাত্রা ছিল সাত এর উপর। খবরটি আমি প্রথমে জানতে পারিনি। সারাদিন বাসাভর্তি বৈশাখী মেহমান ছিল। সবাইকে বিদায় করে বসে ছিলাম ফুজিওয়ারা সানের জন্যে। ততক্ষনে রাত প্রায় ৯টা বেজে গেছে। ফুজিওয়ারা আমার ব্যবসায়িক বন্ধু; হন্তদন্ত হয়ে বাসায় এসে ধপাস করে সোফায় বসে পড়লো। কঠিন মুখয়াবয়ব; ভয়ানক টেনশানের চেহারা। খবর খারাপ। আমার বাসা ভেঙ্গেচুড়ে একাকার হয়ে গেছে। কোন ফার্নিচার আর অবশিষ্ট নেই; ভেঙ্গে কুটিকুটি। তবে ছেলেমেয়েরা বাইরে ছিল বিধায় ওরা রক্ষা পেয়েছে। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো ফুজিওয়ারা বলে গেল।
আমি থ মেরে গেলাম। আমার শোনিমও চুপ। কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। সারাদিনের ক্লান্তিতে এমনিতেই আমার গা প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। সেইক্ষনে সর্বনাশা এই খবর পেয়ে এবার পড়ে যাবার যোগাড়। ফুজিওয়ারা এবং ওর পরিবারের জন্য মন খুব খারাপ হচ্ছিল। এবার ঢাকা আসার পর বেচারা মহা বিপদেই পড়েছে। জাপানে দু’দিন আগে ওর স্ত্রীর বড় অপারেশন হয়েছে। সে এখনো হাসপাতালেই। এই জন্যে ওর মনটা এমনিতেও খারাপ। এর সাথে মরার উপর খাড়ার ঘাঁ হিসেবে এলো তীব্র মাত্রার ভূমিকম্প।
ভূমিকম্প জাপানে একটা মামুলি ব্যাপার। দেশটি একদিকে যেমন সূর্যোদয়ের দেশ, অন্যদিকে ভূমিকম্পেরও দেশ। পূরো ভূমির তলদেশেই আগ্নেয়গিরি। এ জন্যে সব সময়ই ভূমিকম্পের প্রবল সম্ভাবনা থাকে। সারা বছরই কোন না কোন পাহাড়ে দু’চারটে আগ্নেয়গিরির উদগিরন ঘটে; জানমাল এবং প্রকৃতির হয় ব্যাপক ক্ষতি। পূরো এলাকা ছেয়ে যায় আগ্নেয়গিরির ছাইয়ে। জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। ভয়ানক এসব জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিকে নিয়ে ব্যবসাও হচ্ছে ভাল। প্রায় সবগুলোকে ট্যুরিস্ট জোন বানিয়ে রমরমা বানিজ্য চলছে। প্রতিদিন শতশত ট্যুরিস্ট কোম্পানী হাজার হাজার ভ্রমনকারীদের দলবেঁধে নিয়ে যাচ্ছে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি দেখাতে। আগ্নেয়গিরির মুখে খাঁচায় ভরে ডিম রেখে সিদ্ধ করছে আর বিক্রি করছে দশগুণ দামে। প্রচন্ড স্বাস্থ্যকরী এই সেদ্ধ ডিম মানুষ দলবেঁধে কেনে।
এত সব আগ্নেয়গিরি আছে বলেই ভূমিকম্পও বেশী। সারাদেশেই ভূমিকম্প হয়। উত্তরের হোক্কাইদো দ্বীপে কিছুটা কম হলেও দক্ষিণাঞ্চলে বেশী হয়। রাজধানী টোকিও দেশটির মাঝামাঝিতে অবস্থিত; এখানে প্রায়দিনই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। টোকিওতে সাধারণত ভূমিকম্প হয় সমুদ্রের তলদেশে। এর কেন্দ্রে মাত্রা ৫ এর বেশী হয় না। মানুষের বসবাসস্থলে শহরে এর মাত্রা ৩ বা ৪ এর মধ্যে থাকে। দেঁপে ওঠে শহর, কেঁপে ওঠে বাড়ীঘর। তবে এতে মানুষের মধ্যে কোন কাঁপাকাঁপি, হাপাহাপি কিংবা লাফালাফি হয় না। এ যেন গা সয়ে যাওয়া একটি প্রাকৃতিক ক্রিয়া মাত্র। যার মুখোমুখি হবার জন্যে পূরো জাপানী জাতি সদা জাগ্রত থাকে।
যে ভূমিকম্প কোন পূর্ব নোটিশ ছাড়া যে কোন সময় আঘাত এনে সবকিছু শেষ করে দিতে পারে তার সম্মন্ধে সকলের সম্যক জ্ঞান থাকা অতীব জরুরী। জাপানে স্কুল কলেজে ভূমিকম্প পাঠ্য তালিকাভুক্ত বহুকাল থেকেই। ৩ বছর বয়সে যে শিক্ষার্থী প্রথমে স্কুলে যায় তাকেও হাতে কলমে জ্ঞান দেয়া হয় কিভাবে ভূমিকম্প মোকাবেলা করতে হয়। মোটামুটি পাঁচ বছর বয়সে একজন শিক্ষার্থী পূরোপুরি শিখে ফেলে। এরপরও দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ভূমিকম্প পাঠ্য তালিকাভুক্ত থাকে। প্রতিমাসে একবার দলবেঁধে মহড়া করে। আমাদের দেশে মহড়া তো ভাল, শিক্ষামূলক আলোচনাও কোথায়ও নেই; না স্কুলে, না মিডিয়াতে। সব জায়গায় কেবল রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বেশি জ্ঞান, ধারনা এবং আগ্রহ রাজনীতি সম্বন্ধে; যা আমাদের কোন কাজেই আসে না বাস্তব জীবনে।
বাস্তবে ভূমিকম্প নিয়ে এখন কেবল জাপান নয়, গোটা বাংলাদেশও মহা ঝুঁকিতে আছে। যে কোন মূহুর্তে মহা দূর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। বাংলা নববর্ষের দুদিন আগে মিয়ানমারের ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল সারা বাংলাদেশ। ওই দেশে কম্পনের মাত্রা রিকটার স্কেলে ছিল ৬; ওটা জানা গেছে। কিন্তু ঢাকা বা অন্যান্য শহরে কত মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়েছে তা দেশবাসী জানে না। শুধু দেশবাসী কেন; সংশি−ষ্ট অধিদপ্তর, মন্ত্রনালয় কিংবা সরকারও কি জানে? জানে না এটা আমি নিশ্চিত। তবে জানার চেষ্টা করে কিনা এটা নিশ্চিত নই।
নিজে ইঞ্জিনিয়ার বলে দূরত্ব মেপে অনুমান করেবলতে পারি এর মাত্রা ৪ এর বেশী হবে না। আধুনিক বিজ্ঞানের এই যুগে আমাকে অনুমান করে বলতে হয়, হিসাব করে ধারনা নিতে হয়; এর চেয়ে লজ্জার আর কি হতে পারে! গেল চার-পাঁচ বছর আগে থেকেই জাপানে ভূমিকম্প হবার ৩০ সেকেন্ড আগেই জানা যায় ভূমিকম্প আসছে। আশা করছি ক’দিন বাদে ৩ মিনিট আগেই জানা যাবে। জনগনের হাতে থাকা প্রতিটি মোবাইলে ভূমিকম্প হবার ৩০ সেকেন্ড আগেই রিং বেজে উঠে। এটা আলাদা রিং, আলাদা রিং টোন; ভূমিকম্পের জন্য সেট করে রাখা বিশেষ রিং টোন। মানুষ শুনেই আর দেরী করে না, আগেভাগেই সতর্ক হয়; নিরাপদে থাকার প্রস্তুতি নেয়। ভূমিকম্প হবার ১০ সেকেন্ড পরেই সব টিভি চ্যানেল তাদের অনুষ্ঠান চলমান রেখে মনিটরের এক কোনায় বক্স করে লাইভ মেসেজ দিতে থাকে। ম্যাপ দেখিয়ে বলে দেয় দেশের কোথায়, কোন্ শহরে কত মাত্রার কম্পন হয়েছে। একটু পরে আবার কোথায় হতে পারে। সুনামী হবে কিনা সে ব্যাপারেও আগাম বার্তা দেয়।
আমাদের টিভি চ্যানেল এসব নিয়ে লাইভ দেখাবার চিন্তাও করে না। তাদের এত সময় কোথায়! তারা সারাক্ষন ব্যস্ত লাইভে খেলা নিয়ে, অখাদ্য টকশো আর অপরাধীর ফাঁসি নিয়ে। ঘন্টার পর ঘন্টা এসব নিয়ে লাইভ চলে। সাধারন মানুষের সাধারণ লাইফ নিয়ে লাইভ দেখাবার সময় কোথায় তাদের! আমরা মোবাইলের থ্রিজি, ফোরজি নিয়ে মাতামাতি করি; ভূমিকম্প নিয়ে করিনা। ইন্টারনেট, ফেসবুক নিয়ে ঘাটাঘাটি করি; ভূমিকম্প নিয়ে করি না! অথচ চাইলেই করা যায়। মোবাইল অপারেটরগুলো টাকা কামানোর ধান্ধায় থাকে সারাক্ষণ। নানা ধরনের অফার দিয়ে বোকা বানায়, আর ঠকিয়ে টাকা কামায়। গ্রাহকদেরকে ইন্টারনেট, ফেসবুক ব্যবহার করানোর জন্যে লোভনীয় অফার, বিরতিহীন ক্যাম্পেইন! অথচ জনগনকে এই সামান্য সেবাটুকু দেবার ব্যাপারে কোন ক্যাম্পেইন নেই!
তথাকথিত ক্যাম্পেইন এর নামে তারা তথাকথিত দেশপ্রেমিক সাজে। অথচ ভয়ানক নির্মম আমাদের মোবাইল কোম্পানীসমূহ! আমাদের নোবেল জয়ী ডঃ ইউনুসও মোবাইলের ব্যবসা করেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কোম্পানী গ্রামীণ ফোনের ৩৮ শতাংশ শেয়ারতাঁর। হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করেন। তিনি কোনভাবেই এর দায় এড়াতে পারেন না। আমেরিকায় লবিং করে নোবেল আনতে পারেন। জাপানের নানা প্রতিষ্ঠান থেকে অনুদান আনেন, হরেক পদের ব্যবসা আনেন। কেবল বাংলাদেশের মানুষের জন্যে এই সামান্য প্রযুক্তিগত ধারনাটুকু আনতে পারেন না। কী নির্জীব আমাদের শান্তিতে নোবেল জয়ী! তিনি নির্জীব, নাকি নির্মম, জানি না; তবে এটা জানি, ব্যবসা ছাড়া তিনি কিছুই বোঝেন না। আসলে জানলেও আমিও ব্যাপারটি পূরোপুরি বুঝি না! হয়ত আমার বোঝার ক্ষমতাই নেই। না হলে এতদিনে নিশ্চয়ই আমি নোবেল কমিটির মত বাংলাদেশের মানুষের শান্তির জন্যে তাঁর কোন না কোন ভূমিকা খুঁজে পেতাম!!
বাংলাদেশে ভূমিকম্পের সন্ধ্যায় আমি ছিলাম অফিসের বেজমেন্টে; পত্রিকা অফিসে। এডিটিং রুমে বসে মিটিং করছি; সবাই লাফিয়ে উঠলো। আমি কিছুই টের পেলাম না। আমাকে নিয়ে শিবলী দৌঁড় লাগালো। সবাই দৌঁড়াচ্ছে, আমিও দৌঁড়াচ্ছি। বোঝার চেষ্টা করছিলাম আসলেই কম্পন অনুভূত হয় কি না। তবে সকলের লাফালাফি আর ঝাপাঝাপিতে কোন কম্পনই টের পাইনি। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলাম। ভবনের বাইরে লোকে লোকারন্য। সবার মধ্যে কঠিন আতঙ্কের ছাপ। ভূমিকম্পের সময় মাটির নীচে থাকা সবচেয়ে আতঙ্কের; সবচেয়ে রিস্কি। একবার আটকা পড়লে আর রক্ষে নেই।
এর দু’দিন পরেই নববর্ষ; বাংলা নববর্ষ। জাপান সময় রাত প্রায় ৯টা। কেঁপে উঠলো জাপানের দক্ষিনাঞ্চল। ফুজিওয়ারার কষ্টে যেমনি দুঃখিত, তেমনি এই দুই ভূমিকম্পের মাঝে যোগসূত্র থাকলেও থাকতে পারে ভেবে মনটা এমনিতেও দুঃশ্চিন্তায় ভারাক্রান্ত। বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকায় ভূমিকম্পের মাত্রা ৬ হলে আর রক্ষে নেই। ধ্বংসস্তুপে পরিনত হবে পূরো নগরী। প্রায় দু’কোটি লোকের বাস এ শহরে। মহা বিপদের জন্যে আগাম প্রস্তুতি দরকার। দরকার সংশিলিস্ট বিষয়ে সকলের বৈষয়িক জ্ঞান অর্জন এবং মানসিক প্রস্তুতি নেয়া।
এর জন্যে সবাই সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। সব দায়িত্ব সরকারের নয়। সরকার এসব করবে কেন? আর কারো দায়িত্ব নেই? সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে যারা দেদারছে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছে, সেই মোবাইল কোম্পানী এবং টিভি মিডিয়া এগিয়ে এলেই তো কাজটি করা যায়। মহা বিপদ থেকে কিছুটা হলেও বেঁচে যায় লক্ষকোটি বাংলার মানুষ!!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা