ভিন্নমত তো অপরাধ নয়

74

প্রভাষ আমিনঃ
যায়যায়দিন একটি ইতিহাস। বাংলাদেশে সংবাদপত্রের ইতিহাস লিখতে গেলে অবশ্যই যায়যায়দিন-এর জন্য আলাদা অধ্যায় রাখতে হবে। আশির দশকে স্বৈরাচার এরশাদের আমলে, যখন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ধারণাটাই অন্যরকম ছিল, তখন ভিন্ন স্বাদের যায়যায়দিন দিয়ে চমক সৃষ্টি করেছিলেন শফিক রেহমান। যায়যায়দিন-এর মূল বিনিয়োগ ছিল সৃজনশীল আইডিয়া। শুধুমাত্র কন্টেন্ট দিয়ে যে ৩২ পৃষ্ঠার একটি নিউজপ্রিন্টের ম্যাগাজিন পাঠকপ্রিয়তা পেতে পারে, তার উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল যায়যায়দিন। পরে এই ধারাটি অনেক শক্তিশালী হয়েছিল। বলা হয়, শুরুতে যায়যায়দিন-এর অফিস ছিল শফিক রেহমানের মাথা আর ব্রিফকেস। তিনি নিজে লিখতেন এবং আইডিয়া দিয়ে লেখাতেন। কিন্তু শফিক রেহমানের হুল সহ্য হয়নি সামরিক সরকারের। যায়যায়দিন বন্ধ হয়ে যায়, দেশছাড়া হন শফিক রেহমান। এরপর স্বৈরাচারের পতনের পর দেশে ফেরেন তিনি। নতুন করে প্রকাশিত হয় যায়যায়দিন। কিন্তু সেই ধার আর ফিরে পাওয়া যায়নি। ডুবতে বসা যায়যায়দিনকে বাঁচাতে ১৯৯৯ সালে ট্যাবলয়েড আকারে দৈনিক হিসেবে প্রকাশিত হয়। কিন্তু তাও পাঠক টানতে ব্যর্থ হয়। এরপর ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আনুকূল্যে তেজগাঁওয়ে শিল্প প্লট বরাদ্দ নিয়ে যায়যায়দিন মিডিয়া কমপ্লেক্স নির্মাণ করে নতুন স্বপ্নের পথে যাত্রা শুরু করেন শফিক রেহমান। কিন্তু এই দফায়ও ভরাডুবি। শেষ পর্যন্ত শফিক রেহমানকে তার প্রিয় যায়যায়দিন ছেড়ে আসতে হয়। যদিও এখনো যায়যায়দিন প্রকাশিত হয়, তবুও এই যায়যায়দিন সেই যায়যায়দিন-এর ছায়াও নয়।
শফিক রেহমান একজন উচ্চশিক্ষিত, রুচিশীল, অভিজাত, রোমান্টিক ও স্বাপ্নিক মানুষ। তবে অনেকটাই ইউটোপিয়ান। তেজগাঁওয়ে তার গড়া যায়যায়দিন মিডিয়া কমপ্লেক্স দেখলে তার সম্পর্কে এই বিশেষণগুলোকে বাড়াবাড়ি মনে হবে না। এটা বাংলাদেশের কোনো পত্রিকার অফিস বলে মনে হয় না। কখনো কখনো মনে হয়, অফিস নয়, সংবাদ জাদুঘর বুঝি। প্রতীকী হলেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ কাচে ঘেরা অফিস বাইরে থেকে দেখা যেত। অফিসে ছিল সিনেমা হল, কফিশপ, ডরমিটরি, লাইব্রেরি। পত্রিকা প্রকাশের আগেই শফিক রেহমান তার কর্মীদের অ্যাটিকেট-ম্যানার শিখিয়েছেন। কীভাবে চা খেতে হয়, কীভাবে কাটা চামচ ধরতে হয়, কীভাবে সিনেমা দেখতে হয়, এমনকি কীভাবে বাথরুম ব্যবহার করতে হয়; তাও শেখানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। মুফতে টাকা পেলে তা দিয়ে অনেক কিছুই করা যায়। শফিক রেহমানও তার কল্পনায় যা যা ভেবেছেন, তা সবই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। হয়তো কোনো একদিন বাংলাদেশের পত্রিকা অফিস এমন হবে। কিন্তু এখনো বাংলাদেশের বাস্তবতা এই অবাস্তত কল্পনাকে অনুমোদন করে না। তাই অনিবার্যভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়যায়দিন। তবে শফিক রেহমানের যেন তাতে কিছুই যায় আসে না। তিনি ব্যস্ত আছেন ‘লাল গোলাপ’ উপস্থাপনা নিয়ে।
শফিক রেহমান দীর্ঘদিন লন্ডনে ছিলেন। বাংলাদেশে ফিরে তিনি বাঙালিকে সেই ব্রিটিশ কেতা শেখানোর চেষ্টা করেন। স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের অর্জনকে আড়াল করে দিয়ে একই দিনে বাংলাদেশে চালু করেন ভালোবাসা দিবস। তিনি সিনেমা দেখাতে ক্লাব খোলেন, ইংরেজি শেখাতে প্রতিষ্ঠান গড়েন, গণতন্ত্র শেখাতে ‘ডেমোক্রেসিওয়াচ’ বানান। কিন্তু তার সব স্বপ্নই অধরা রয়ে যায়। একদা প্রতাপশালী সম্পাদক শফিক রেহমান এখন ‘মৌচাকে ঢিল’ নামে একটি চটুল ম্যাগাজিনের সম্পাদক। আশির ঘরে গিয়ে হয়তো আর নতুন করে স্বপ্ন দেখা যায় না। তবুও তো তিনি একটি পত্রিকা প্রকাশ করছেন। আমরা হয়তো আশির অনেক আগেই কাবু হয়ে যাব।
আমি জানি তার অনেক কিছুই কল্পনা; তবু তার এই রুচি, আভিজাত্য দেখতে ভালোই লাগে। যদিও তার সঙ্গে আমার মতের প্রবল অমিল, তবুও আমি তাকে পছন্দ করি। কারণ সমতের গোঁয়ারের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে তার মতো একজন শিক্ষিত উদার গণতন্ত্রীর সঙ্গে তর্ক করাটাও আনন্দের। সেই আনন্দের স্মৃতি অবশ্য আমার খুব বেশি নেই। তার সঙ্গে খুব বেশি মেশা হয়নি। বরং উল্টো টকশোতে প্রশ্ন করে তাকে বিব্রত করার চেষ্টা করেছি।
এত বিপর্যয়ের পরও শফিক রেহমানের প্রভাব এখনো কিছু কম নয়। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার তালিকা অনেক লম্বা। সেই আনুষ্ঠানিক তালিকায় নাম নেই শফিক রেহমানের। তবে বেগম খালেদা জিয়া সবচেয়ে বেশি যার কথা শোনেন বলে প্রচলিত, তিনি শফিক রেহমান। শফিক রেহমানের লেখা ‘দিনের পর দিন’ একসময় দারুণ জনপ্রিয় ছিল। মইন-মিলার টেলিফোনিক পরকীয়া প্রেম কাহিনীর মাধ্যমে উঠে আসত সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ ভাবনা। শফিক রেহমানের সেই ছন্দময় গদ্য, চমৎকার শব্দচয়ন আমরা বড় মিস করি। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার ভাষণ শুনলে আমরা নস্টালজিক হয়ে যাই। খালেদা জিয়ার কণ্ঠে শুনি শফিক রেহমানের গদ্য। শুনতে ভালোই লাগে। নতুন ভাষা রাজনীতিতে নতুনত্ব আনতে পারে।
হঠাৎ করে এক বছরের পুরনো মামলায় শফিক রেহমানকে নাটকীয়ভাবে গ্রেফতার করা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এতদিন শুনেছি পুলিশ পরিচয়ে ভুয়া লোকজন গিয়ে মানুষকে তুলে নিয়ে আসত। এখন ঘটছে উল্টো ঘটনা। শফিক রেহমানকে গ্রেফতার করতে সাংবাদিক পরিচয়ে তার বাসায় ঢুকেছে পুলিশ। এটাই বোধহয় কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা। শুধু হুট করে গ্রেফতার করা নয়, আশি বছর বয়সী শফিক রেহমানকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত থাকা। এ ষড়যন্ত্রটি হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এফবিআই এজেন্টকে ঘুষ দিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার চেষ্টার মামলায় দুজনের সাজাও হয়েছে। শফিক রেহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্যি হলে, তা অবশ্যই গুরুতর। আইনমন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রী বলছেন, শফিক রেহমানকে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই গ্রেফতার করা হয়েছে। সজীব ওয়াজেদ জয়ও তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস আমাকে অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্রে শফিক রেহমানের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা উদ্ঘাটন করেছে। তারা এ বিষয়ে প্রমাণাদি আমাদের সরকারের কাছে দিয়েছে। তাকে এই প্রমাণের ভিত্তিতেই গ্রেফতার করা হয়েছে। আমি এর চেয়ে বেশি কিছু প্রকাশ করতে পারছি না। কিন্তু এই প্রমাণ দ্ব্যর্থহীন এবং অখণ্ডনীয়।’ এটা ঠিক বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যরা সব সময়ই ঝুঁকির মুখে থাকেন। শেখ হাসিনাকে অসংখ্যবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। শেখ হাসিনার সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্তরসূরি সজীব ওয়াজেদ জয়ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যান। কিন্তু শফিক রেহমানের সঙ্গে আমার সখ্য না থাকলেও, তাকে যতটা চিনি, এ ধরনের কাজের সঙ্গে তার জড়িত থাকাটা বিশ্বাস করতে আমার কষ্ট হচ্ছে। যেমন কষ্ট হয়েছিল সাবের হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্লেট চুরির মামলা বা মুনতাসীর মামুনের বিরুদ্ধে সিনেমা হলে বোমা হামলার মামলা। শফিক রেহমানকে গ্রেফতারের পর প্রায় সব পত্রিকায় লেখা হয়, ‘বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিক রেহমান গ্রেফতার’। কথাটা মিথ্যা নয়। শফিক রেহমান অবশ্যই বিশিষ্ট সাংবাদিক। অনেকে তার গ্রেফতারকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু এখানে আমার একটু দ্বিমত আছে। শফিক রেহমানকে তার কোনো লেখা বা বলার কারণে গ্রেফতার করা হয়নি। মানে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে তার গ্রেফতারের কোনো সম্পর্ক নেই। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্যি হলে তো তিনি অপরাধী, আর মিথ্যা হলে রাজনৈতিক হয়রানির শিকার। সত্য-মিথ্যা প্রমাণিত হবে আদালতে। কিন্তু এর সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কোনো সম্পর্ক নেই। অপরাধী হলে তিনি সাজা পাবেন, এ নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবুও একজন প্রবীণ নাগরিক হিসেবে শফিক রেহমান সরকারের কাছে একটু বাড়তি সহানুভূতি আশা করতে পারতেন। বিশিষ্ট সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদও সহিংসতার মামলায় দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আছেন। শওকত মাহমুদও সাংবাদিক হিসেবে নয়, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবেই মামলার আসামি হয়েছেন। তবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও আমার বিশ্বাস হয়নি। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ সাংবাদিকতায় না হলেও টকশোতে সরকারের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। তিনিও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলেই আশঙ্কা করি। একই কথা মাহমুদুর রহমান মান্নার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে মাহমুদুর রহমানের প্রসঙ্গ ভিন্ন। তিনি কারাভোগ করছেন, আমার দেশ-এ অপসাংবাদিকতার দায়ে। যদিও তার বিরুদ্ধেও কাগজে-কলমে অন্য অভিযোগ আনা হয়েছে।
সাংবাদিক হলেই তাকে গ্রেফতার করা যাবে না, আর রাজনীতিবিদ হলেই যেনতেন মামলায় নাম ঢুকিয়ে বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রাখা যাবে; এমনটা আমি মনে করি না। গণতান্ত্রিক দেশে ভিন্নমত থাকবে, বহুমত থাকবে। বিরোধী দলের নেতারা সরকারের সমালোচনা করবেন। তারা যতক্ষণ আইন না ভাঙছেন, ততক্ষণ তাদের গ্রেফতার করা যাবে না। যদি তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তাহলে দ্রুত তাদের বিচার করা হোক। নইলে অবিলম্বে শফিক রেহমান, শওকত মাহমুদ ও মাহমুদুর রহমান মান্নাকে মুক্তি দেওয়া হোক, অন্তত জামিনে মুক্তি দেওয়া হোক। তারপর বিচার চলতে তো বাধা নেই। ভিন্নমত তো অপরাধ নয়। সরকারবিরোধিতা আর রাষ্ট্রদ্রোহিতা তো এক নয়।
লেখক : সাংবাদিক
ই-মেইল : probhash2000@gmail.com