ব্যাক ডেটের চিঠিতে কানধরানো প্রধান শিক্ষককে বরখাস্ত

50

যুগবার্তা ডেস্কঃ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে গণপিটুনি আর কান ধরে উঠবস করানোর পর নারায়ণগঞ্জের পিয়ার সাত্তার লতিফ জামান উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে ব্যাক ডেটের চিঠিতে বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তের চিঠিতে তারিখ দেওয়া হয়েছে ১৩ মে আর স্কুল কমিটির সভাপতি তাতে সই করেছেন ১৬ মে।
শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির কথা শিক্ষামন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী বলার পরই মঙ্গলবার সেই শিক্ষককে বরখাস্তের কথা গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে।
সোমবার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও মঙ্গলবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ওই ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির কথা বলেন। এলাকাবাসী মনে করছেন, পুরো বিষয়টি শিক্ষক শ্যামল কান্তির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এ ঘটনায় দেশজুড়ে চলছে প্রতিবাদ।
সভাপতির সই করা বরখাস্তের চিঠিতে চারটি কারণ দেখানো হয়েছে। কারণগুলো হলো- ছাত্রদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ গ্রহণ, ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য ও ছুটি না নিয়ে বিদ্যালয় থেকে অনুপস্থিত থাকা এবং সময়মতো বিদ্যালয়ে না আসা।
স্কুল কর্তৃপক্ষ চিঠিতে দাবি করেছে, সতর্কীকরণ চিঠি দেওয়ার পরও এই শিক্ষক ‘অবৈধ কর্মকাণ্ড’ থেকে বিরত না হওয়ায় ১৩ তারিখের ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। চিঠিটি স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানসহ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ মোট ৬ জনের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে কয়েকদিন কেটে যাওয়ার পর গতকাল সোমবার তদন্ত কমিটি গঠন করায় পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। এরপর মন্ত্রীরা একের পর এক মন্তব্য করা শুরু করলে পরিস্থিতি আরেকটু জটিল হওয়ায় দ্রুত বরখাস্তের খবর চাউড় করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইতোমধ্যে শিক্ষকের পক্ষে আন্দোলনরতরা।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম সোমবার তার ফেসবুকে লিখেছেন, নারায়ণগঞ্জে শিক্ষককে অপমান করার তীব্র নিন্দা জানাই। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। আশা করি তা দ্রুত করা হবে।
এদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মনে করেন, শিক্ষককে কান ধরে উঠবস কারানোর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি হওয়া দরকার। তিনি বলেন, শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করানো, এটা আমার দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং অপরাধ। যারা এ অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদেরকে নিশ্চয়ই শাস্তিভোগ করতে হবে। কারণ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যায় না। এটা আমরা কোনওভাবেই বরদাশত করতে পারি না।
পযরঃর—নড়ৎশযধংঃড়–হধৎধুধহধগত শুক্রবার ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে’ আঘাত দেওয়ার অভিযোগ এনে নারায়ণগঞ্জের পিয়ার সাত্তার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে পিটিয়ে জখম করে স্থানীয় জনতা। এক পর্যায়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান তাকে কান ধরে উঠবস করতে বাধ্য করেন। এ ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় চলছে।
যদিও যিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সেই শিক্ষক মনে করেন, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফারুকুল ইসলামের বোন পারভীন আক্তারকে প্রধান শিক্ষক করতেই এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি স্কুলের শুরু থেকেই চাকরি করে আসছি। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরেই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি চাচ্ছে না আমি ওই প্রধান শিক্ষকের পদে থাকি। এ সময়টা জুড়ে স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির তিনজন সদস্য মতিউর রহমান, অভিভাবক সদস্য হিসেবে নির্বাচিত উপজেলা নির্বাহী অফিসের পিয়ন মিজানুর রহমান ও মোবারক হোসেন এ তিনজন মিলেই আমাকে পদচ্যুত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করে। পুরোটা পরিকল্পিত ও সাজানো। আমি আসলে পলিটিক্স বুঝতে পারি নাই।’
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি ও স্কুলের ধর্মের শিক্ষক মাওলানা বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘ধর্মীয় বিষয়ে প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে কোনও কথা বলতে শুনি নাই। এমনকি কোনও শিক্ষার্থী এ ধরনের কোনও অভিযোগও করেনি। জানালেতো তাৎক্ষণিক স্যারকে জিজ্ঞেস করতাম।’
এদিকে গ্রাম পঞ্চায়েত কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শামসুল হক সেদিনের ঘটনাটা আকস্মিক ঘটেছে উল্লেখ করে বলেন, ‘হঠাৎই দেখি লোকজন জড়ো হয়ে অপসারণ চাই বলে শ্লোগান শুরু করে। এরমধ্যেই শুনি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে হেডমাস্টার ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছে। এ বিষয়টা আমাদের জানা ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ সময় আমরা ভেতরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকি। এ সময় থানায় জানানোর পাশাপাশি এলাকার গণমান্য ব্যক্তিদের ডাকা হয়। শেষে দরজা ভেঙে প্রধান শিক্ষককে মারধর করে জনতা।’
শামসুল বলেন, ‘এমপি সাহেব এসে প্রধান শিক্ষককে ক্ষমা চাইতে বলেন, না হলে এলাকার মানুষকে থামানো যাবে না। এরপর তিনি এমপি সাহেবের উপস্থিতিতে কানে ধরে উঠবস করেন।’