বেতনকাঠামোর জটিলতা এবার বাস্তবায়ন পর্যায়ে

92

যুগবার্তা ডেস্কঃ এবার সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামোর বাস্তবায়ন পর্যায়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হয় গত ১৫ ডিসেম্বর। গত জুলাই থেকে হিসাব করে বকেয়াসহ ডিসেম্বর থেকে সবাই নতুন হারে বেতনও পেয়ে আসছেন।
তারপরও স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর ধাপে (গ্রেড) বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে ভিত্তি বছর গণনা এবং জ্যেষ্ঠ কর্মচারীর চেয়ে কনিষ্ঠদের বেশি বেতন পাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে খোদ সরকারি দপ্তর থেকেই।
হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের (সিজিএ) কার্যালয় গত ২৫ জানুয়ারি এ দুই বিষয়ে স্পষ্টতা চেয়ে অর্থসচিব মাহবুব আহমেদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে।
অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আর কোনো জটিলতা হওয়ার কথা নয়। তারপরও আবেদন যেহেতু এসেছে, আমরা তা গুরুত্বের সঙ্গেই দেখছি।’
জাতীয় বেতনকাঠামোর ‘উচ্চতর গ্রেডে প্রাপ্যতা’ শীর্ষক ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের স্পষ্টতা জানতে চেয়ে অর্থসচিবকে চিঠি দেয় সিজিএ কার্যালয়। ৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে ১০ বছর পূর্তিতে এবং চাকরি সন্তোষজনক হওয়া সাপেক্ষে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে একাদশ বছরে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন প্রাপ্য হবেন।’
৭(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘কোনো স্থায়ী কর্মচারী ১০ বছর পূর্তিতে উচ্চতর ধাপে বেতন পাওয়ার পর পরবর্তী ছয় বছরে পদোন্নতি না পেলে সপ্তম বছরে চাকরি সন্তোষজনক হওয়া সাপেক্ষে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন প্রাপ্য হবেন।’
১০ বছর কখন থেকে গণনা হবে এবং চাকরির সন্তোষজনক বিষয়ে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের মঞ্জুরি আদেশের দরকার পড়বে কি না—সে ব্যাপারেই অর্থ বিভাগের কাছে স্পষ্টীকরণ চায় সিজিএ।
সিজিএ চিঠিতে বলেছে, নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সব কর্মচারীরই বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) হবে প্রতিবছরের ১ জুলাই। কিন্তু ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির আগের দিন অর্থাৎ একই বছরের ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত যাঁরা ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন, তা বহাল রাখা হয়। এই কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠর চেয়ে কনিষ্ঠ কর্মচারীর বেশি বেতন পাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
অর্থসচিবকে বিষয়টি উদাহরণ দিয়েও বুঝিয়ে দেয় সিজিএ। উদাহরণটি এ রকম—পঞ্চম ধাপের দুজন কর্মচারী ‘ক’ ও ‘খ’। ‘ক’ জ্যেষ্ঠ, ‘খ’ কনিষ্ঠ। ‘ক’-এর বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির তারিখ ২০১৫ সালের ১৫ জুন। আর ‘খ’-এর ১৫ আগস্ট। ৩০ জুন ‘ক’-এর মূল বেতন ২৫ হাজার ৮৫০ টাকা এবং ‘খ’-এর ২৪ হাজার ৯৫০ টাকা।
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ১ জুলাই দুজনেরই মূল বেতন সমান অর্থাৎ ৪৬ হাজার ৯৭০ টাকা হয়। কিন্তু ‘খ’ ওই বছরের ১৫ আগস্ট ইনক্রিমেন্ট পাওয়ায় ওই দিন তার বেতন হয়ে যায় ৪৯ হাজার ৯০ টাকা। আর ‘ক’-এর বেতন ১৫ আগস্টে ৪৬ হাজার ৯৭০ টাকাই থেকে যায়।
২০১৬ সালের ১ জুলাই ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার পর ‘ক’-এর বেতন দাঁড়াবে ৪৯ হাজার ৯০ টাকা। আর ‘খ’-এর বেতন দাঁড়াবে ৫১ হাজার ৩০০ টাকা।
এ অসমতা দূর করার পথও বাতলে দেয় সিজিএ। বলা হয়, এ বছরের ১ জুলাইয়ের আগে সব কর্মচারীকে একটি করে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া যেতে পারে, যা তাঁরা এই সময়ের মধ্যে পেতেনই। তবে, ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত যাঁরা ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন, তা বাধ্যতামূলকভাবে সমন্বয় করতে হবে।
যোগাযোগ করলে হিসাব মহানিয়ন্ত্রক আবুল কাশেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘নতুন বেতনকাঠামোতে চাকরির বয়স ১০ বছর ও ৬ বছর হওয়ার পর যে পদোন্নতির কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে দুটি শব্দ যুক্ত রয়েছে। তারই স্পষ্টীকরণ দরকার। যেমন স্বয়ংক্রিয় ও সন্তোষজনক বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা অস্পষ্ট।’
সন্তোষজনকটা কে বলবে—তারও প্রশ্ন এটা। তিনি আশা করছেন, অর্থ বিভাগ শিগগির এর সমাধান দেবে। আর জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ কর্মচারীদের মধ্যে বেতনের অসমতা দূর করার ব্যাপারেও অর্থ বিভাগের পদক্ষেপ চান আবুল কাশেম।
এদিকে সিজিএ কার্যালয়ের চিঠিটিকে ষড়যন্ত্র বলে মনে করছে বাংলাদেশ অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস কর্মকর্তা পরিষদ। ১৪ ফেব্রুয়ারি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে চিঠি দিয়ে ১০ বছর ও ৬ বছর পূর্তির পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর ধাপে বেতন পাওয়ার বিষয়টি উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছে পরিষদ।
উদাহরণটি এ রকম: মি. ‘ক’ ২০০৪ সালের ২০ মে নবম ধাপে চাকরিতে যোগ দেন। চার বছর পর ২০০৮ সালের ২০ মে সিলেকশন গ্রেড পেয়ে তিনি উন্নীত হন সপ্তম গ্রেডে। এরপর কোনো পদোন্নতি পাননি। নতুন বেতনকাঠামোর অনুচ্ছেদ ৭(১-৪) অনুযায়ী, চাকরির ১০ বছর পূর্তি অর্থাৎ ২০১৪ সালের ২০ মে তিনি পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড (ষষ্ঠ) প্রাপ্য হবেন।
যোগাযোগ করলে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস কর্মকর্তা পরিষদের সভাপতি শফিউল আজম প্রথম আলোকে বলেন, সিজিএর চিঠিতে অপব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। চাকরির গণনাকালের জন্য মূল পদ বিবেচনা না করে সিলেকশন গ্রেড পাওয়ার তারিখ থেকে গণনা করার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে।প্রথম আলো