যুগবার্তা ডেস্কঃ ফজর নামাজের পর আমবয়ানের মাধ্যমে শুরু হয়েছে বিশ্ব মুসলিমের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। কনকনে শীত ও কুয়াশা উপেক্ষা করে বাস-ট্রাক, কার-পিকআপসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে দলে দলে মুসল্লিরা এখনো টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা স্থলে আসছেন। তারা কাঁধে-পিঠে প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে ইজতেমা স্থলে এসে নিজ নিজ জেলার খিত্তায় অবস্থান নিচ্ছেন। অবশ্য গত কয়েকদিন থেকেই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জামাতবদ্ধ মুসল্লিরা এসে ময়দানের খিত্তায় খিত্তায় অবস্থান নিয়েছেন। টঙ্গীর ইজতেমা স্থল এখন মুসল্লিদের আগমনে মুখরিত। জুমার নামাজের আগ পর্যন্ত মুসল্লিরা আসবেন বলে জানাগেছে। তাবলীগ জামাতের মুরুব্বিরা আশা প্রকাশ করেছেন আজকে টঙ্গীতে বিশ্বের সর্ববৃহত জুমার জামাত অনুষ্ঠিত হবে।
ইতোমধেই টঙ্গীর তুরাগ তীরের ইজতেমা ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। যদিও আজ বাদ ফজর আনুষ্ঠানিক আমবয়ানের মাধ্যমে তাবলীগের মুরুব্বীরা বিশ্ব ইজতেমার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছন। তবে বৃহস্পতিবারই বিশ্ব ইজতেমার বিশাল ময়দানে লাখো মুসল্লী জমায়েত হওয়ায় বাদ মাগরিব থেকেই মুসল্লীদের মাঝে হেদায়েতী বয়ান ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
এবার প্রথমবারের মতো চার ভাগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা। দেশের মোট ৩২টি জেলা নিয়ে এবছর ইজতেমার দুই পর্ব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগামী বছর (২০১৭ সালে) বিশ্ব ইজতেমার দু’পর্বে বাকী ৩২ জেলার মুসল্লীরা অংশ নিবেন। এবছরের প্রথম পর্বে অংশ নেবে ঢাকার একাংশসহ ১৭টি জেলার তাবলিগ অনুসারীরা। দ্বিতীয় পর্বে অংশ নেবে ১৫টি জেলাসহ ঢাকার বাকী অংশের তাবলিগ অনুসারীরা। তবে বিদেশী মুসল্লীরা প্রতি বছর বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিতে পারবেন।
এবারের ২০১৬ সালের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব দেশের ৩২টি জেলার মুসল্লীদের নিয়ে টঙ্গী তুরাগ তীরে দুই ধাপে আজ শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে এবং আগামী রবিবার (১০ জানুয়ারি) আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে ইজতেমার প্রথমপর্ব শেষ হবে। এরপর চার দিন বিরতি দিয়ে ১৫ জানুয়ারি শুরু হবে দ্বিতীয় পর্ব। দ্বিতীয় পর্বে অংশ নেবে ঢাকার বাকী অংশসহ ১৬টি জেলার তাবলিগ অনুসারীরা। ১৭ জানুয়ারি দ্বিতীয় পর্বের আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে দু’পর্বের এবারের বিশ্ব ইজতেমা।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় পথে দুর্ভোগ সত্ত্বেও সকল বাধা উপেক্ষা করে মুসল্লীরা গাড়িতে চড়ে ও পায়ে হেটে বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে আসছেন দলে দলে। এ বছর বাইরের প্রায় ৩০-৪০টি দেশ থেকে ৩০ হাজারেরও বেশি মুসল্লি এজতেমায় যোগ দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রথম পর্বে মুসল্লিরা খিত্তা ওয়ারি যেভাবে অবস্থান নেবেন: এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথমপর্বে ২৭টি খিত্তায় ঢাকার একাংশসহ ১৭ জেলার মুসল্লিদের জন্য ময়দানে জেলাওয়ারি মুসুল্লিদের স্থান (খিত্তা) নির্দিষ্ট করা হয়েছে। মুসল্লিরা জেলাওয়ারি এসব খিত্তায় অবস্থান নেবেন। দ্বিতীয় পর্বে বিভিন্ন জেলার মুসল্লিরা খিত্তা ওয়ারি যেভাবে অবস্থান নেবেন: দ্বিতীয় পর্বে অংশ নেবেন ১৫টি জেলাসহ ঢাকা জেলার বাকী অংশের তাবলিগ অনুসারী মুসল্লীরা।
তুরাগ নদীতে ভাসমান সেতু স্থাপন: মুসল্লিদের তুরাগ নদী পারাপারের ৯টি ভাসমান সেতু স্থাপন করা হয়েছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোরের তত্ত্বাবধানে। ইতোমধ্যে সেতুগুলো মুসল্লিদের চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে।
ইজতেমা স্থলে কোন প্রকার অপরাধ সংগঠিত হলে তার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করবে। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এসএম আলম জানান, বুধবার থেকে ইজতেমা স্থলে ও আশপাশের খাবারের দোকানে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান শুরু করেছে। ইজতেমায় অংশ নেয়া মুসল্লিদের যোগাযোগের সুবিধার জন্য ইজতেমা ময়দান এলাকায় প্রয়োজন সাপেক্ষে প্রায় অর্ধশত টেলিফোন সংযোগ দেয়া হয়েছে। র‌্যাব- কন্ট্রোল রুম, পুলিশ কন্ট্রোল রুম, জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম, ফায়ার সার্ভিসের কন্ট্রোল রুম, টঙ্গী পৌরসভার কন্ট্রোল রুম, এজতেমার আমিরের রুম, বিদেশী মেহমানদের রান্না ঘরে, সেনা সদসদ্যের কন্ট্রোল রুমে, স্বাস্থ্য ক্যাম্প, পানির পাম্প সেন্টার, বিদেশী তাঁবু ও গোডাউনে এসব টেলিফোন লাইন সংযোগ দেয়া হয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ঠিক রাখতে অস্থায়ী টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা: গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, ইজতেমা ময়দানে মুসল্লিদের নিরাপত্তায় সার্বিক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আজ থেকে পাঁচ স্তরে ১২ হাজার পুলিশ সদস্য ২৪ ঘণ্টা মুসল্লিদের নিরাপত্তাদানে নিয়োজিত থাকবে। এছাড়াও সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পর্যাপ্ত সদস্য নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকবে।
পানি, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা সেবা: জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের টঙ্গী অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, ইজতেমা মাঠে স্থাপিত উৎপাদন নলকূপের মাধ্যমে প্রতিদিন তিন কোটি লিটারেরও বেশি বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের সকল পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ওজু-গোসলের হাউজ ও টয়লেটসহ প্রয়োজনী স্থানে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়াও পাকা দালানে প্রায় ৬ হাজারের মতো টয়লেট ইউনিট রয়েছে। এদের মধ্যে নষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত অজু-গোসলখানা এবং টয়লেটগুলো ইতোমধ্যে সংস্কার করা হয়েছে।
ডেসকো কর্তৃপক্ষ জানান, ইজতেমা এলাকায় সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। উত্তরা, টঙ্গী সুপার গ্রিড ও টঙ্গী নিউ গ্রিডকে মূল ১৩২ কেভি সোর্স হিসেবে নির্বাচন করা হবে, যাতে যেকোন একটি গ্রিড অকেজো হলেও সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত না হয়। ইজতেমা এলাকায় চারটি স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর এবং পাঁচটি ট্রলি-মাউন্টেড ট্রান্সফরমারও সংরক্ষণ করা হবে।
ফায়ার সার্ভিসের টঙ্গীর স্টেশন অফিসার মোর্শেদ আলম জানান, ইজতেমা স্থলে তাদের একটি কন্ট্রোল রুমও স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে সার্বক্ষণিক কর্মকর্তাসহ ফায়ারম্যানরা থাকবেন। ময়দানের প্রতি খিত্তায় ফায়ার এস্টিংগুইসারসহ ফায়ারম্যান, গুদাম ঘর ও বিদেশি মেহমানখানা এলাকায় তিনটি পানিবাহী গাড়ি, তিন সদস্যের ডুবুরি ইউনিট, একটি স্ট্যান্ডবাই লাইটিং ইউনিট এবং পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স থাকবে।
তিনি আরো জানান, ইজতেমা মাঠের ধুলাবালু নিয়ন্ত্রণে তাদের উদ্যোগে ইজতেমা মাঠের আশেপাশের এলাকায় পানি ছিটানো হবে।
টঙ্গী সরকারি হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার পারভেজ আলম জানান, ইজতেমায় আগত মুসুল্লিদের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবা দিতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ মেডিক্যাল অফিসারদের তালিকা ও ডিউটি রোস্টার করা হয়েছে। মুসল্লিদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিতে মুন্নু গেট, এটলাস গেট, বাটা কারাখানার গেট ও টঙ্গী হাসপাতাল মাঠসহ ছয়টি অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এখানে হৃদরোগ, অ্যাজমা, ট্রমা, বার্ন, চক্ষু এবং ওআরটি কর্নারসহ বিভিন্ন ইউনিটে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ চিকিৎসা দেবেন। রোগীদের হাসপাতালে নেয়ার জন্য সার্বক্ষণিক ১৪টি অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন থাকবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা: গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, ইজতেমা ময়দানে মুসল্লিদের নিরাপত্তায় সার্বিক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। শুক্রবার থেকে ১২ হাজার পুলিশ সদস্য ২৪ ঘণ্টা মুসল্লিদের নিরাপত্তাদানে নিয়োজিত থাকবে। এছাড়াও সাদা পোষাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পর্যাপ্ত সদস্য নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকবে।
মুসল্লিদের সুবিধার্থে ইজতেমা শুরুর আগের দিন থেকে বি আরটিসির ২২৮টি স্পেশাল বাস সার্ভিস ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে। বি আরটিসির একটি সূত্র জানায়, ৭ জানুয়ারি থেকে ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত চলাচলকারী স্পেশাল বাসের মধ্যে তিনটি বাস বিদেশী মুসল্লিদের জন্য রিজার্ভ থাকবে।
অপরদিকে বিশ্ব ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের যাতায়াতে সুবিধার্থে বাংলাদেশ রেলওয়ে ২৮টি বিশেষ ট্রেন পরিচালনা করবে। এছাড়া সব আন্তঃনগর, মেইল, এক্সপ্রেস ও লোকাল ট্রেনে অতিরিক্ত ২০টি কোচ সংযোজন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, দুই ধাপের ইজতেমার প্রথম ধাপের শুক্রবার ঢাকা-টঙ্গী-ঢাকা দুটি ‘জুমা স্পেশাল, আখেরি মোনাজাতের আগের দু’দিন জামালপুর ও আখাউড়া থেকে দুটি করে চারটি অতিরিক্ত ট্রেন পরিচালনা করা হবে। আখেরি মোনাজাতের আগের দিন লাকসাম-টঙ্গী একটি, আখেরি মোনাজাতের দিন ঢাকা-টঙ্গী-ঢাকা সাতটি, টঙ্গী-ঢাকা সাতটি, টঙ্গী-লাকসাম একটি, টঙ্গী-আখাউড়া দুটি, টঙ্গী-ময়মনসিংহ চারটিসহ মোট ২১টি আখেরি মোনাজাত স্পেশাল ট্রেন চালু থাকবে। মাছুম বিল্লাহ, অঅমাদের সময়.কম