বিলুপ্তির পথে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা

যুগবার্তা ডেস্কঃ গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি অংশ লাঠি খেলা। ঐতিহ্যবাহী এই খেলাটি এখনো বেশ জনপ্রিয়। আবহমানকাল ধরে নওগাঁসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলায় এক সময় বিনোদনের খোরাক জুগিয়েছে লাঠি খেলা। কিন্তু কালের বির্বতণে মানুষ আজ ভুলতে বসেছে এই খেলাটি।

ঢোল আর লাঠির তালে তালে নাচা নাচি। অন্য দিকে প্রতিপক্ষের হাত থেকে আত্মরক্ষার কৌশল অবলম্বনের প্রচেষ্টা সম্বলিত টান টান উত্তেজনার একটি খেলার নাম লাঠি খেলা। লাঠি খেলা অনুশীলনকারীকে লাঠিয়াল বলা হয়। এই খেলার জন্য লাঠি সাড়ে চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা, তবে প্রায় তৈলাক্ত হয়। প্রত্যেক খেলোয়ার তাদের নিজ নিজ লাঠি দিয়ে রণকৌশল প্রদর্শন করে।

জেলার আত্রাই উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের দেছের প্রামাণিকের বয়স এখন ৪০ এর কোঠায়। তিনি জানালেন, এলাকার নাদো সরদার ও নাফের দফাদার নামে দুই লাঠি খেলার ওস্তাদ ছিলেন। তাদের কাছ থেকেই মাত্র ১১/১২ বয়সেই এই লাঠি খেলা শিখেছেন। ১২/১৪ বছর আগেই তাদের সাথে আগে লাঠি খেলাগুলো জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে খেলে থাকতেন। কোন মাঠে খেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা শুনলে আশেপাশের গ্রামের শতশত মানুষ আসতো।

২০০৪ সালের সারা দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে এই খেলাগুলো মোটামুটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে কৃষিকাজের সাথে যুক্ত হয়ে যান দেছের প্রামাণিক।

নওগাঁ সরকারি বিএমসি মহিলা কলেজের প্রাক্তন সরকারি অধ্যাপক ও গবেষক আতাউল হক সিদ্দিকী জানান, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ লাঠি খেলা আজ বিলুপ্ত প্রায়। আমাদের অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের লাঠিখেলা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম সড়কি খেলা, ফড়ে খেলা, ডাকাত খেলা, বানুটি খেলা, গ্রুপ যুদ্ধ, নরি বারী খেলা এবং দা খেলা ইত্যাদি।
গ্রামের সাধারণ মানুষেরা তাদের নৈমিত্তিক জীবনের উত্সব-বাংলা বর্ষবরণ, বিবাহ, অন্নপ্রাশন ইত্যাদি উপলক্ষে লাঠি খেলার আয়োজন করে থাকেন। এক্ষেত্রে সাধারণত কোনও লাঠিয়াল দলকে ভাড়া করে আনা হয়। বিগত দশকেও গ্রামাঞ্চলের লাঠি খেলা বেশ আনন্দের খোরাক জুগিয়েছে। সাধারণ মানুষের হূদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছিল এ খেলাটি। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসত এই খেলা দেখার জন্য। বিভিন্ন জায়গায় মাঝে মধ্যে এই খেলা দেখা গেলেও তা খুবই সীমিত। এ খেলাটি দিন দিন বিলুপ্তি হওয়ার কারণে এর খেলোয়ার সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে না কোন নতুন খেলোয়ার।

নওগাঁর সামাজিক সাংস্কৃতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন একুশে পরিষদের সভাপতি ডিএম আব্দুল বারি জানান, বর্তমান সরকারের কিছু নজর থাকায় জেলার বিভিন্ন স্থানে ছোট হলেও এই খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করে হারিয়ে যাওয়া গ্রাম বাংলার এ খেলাগুলো চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার বলেও তিনি মনে করেন।

জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমান জানান, দেশীয় সংস্কৃতি ধরে রাখতে বর্তমান সরকার বেশ আন্তরিক। তবে শুধু সরকার নয় সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন, বেসরকারি সংস্থা এবং তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে।- ইত্তেফাক