বিমানবন্দর থেকে ইয়ারউদ্দিন খলিফার ৫২ দানবাক্স অপসারন

103

যুগবার্তা ডেস্কঃ ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে ঝুলিয়ে রাখা ৫২টি দানবাক্স খুলে ফেলা হয়েছে। বিমানবন্দরে দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে এগুলো অপসারন করেন। সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে ‘ইয়ারউদ্দিন খলিফা’র নামে এসব দানবাক্স থাকলেও এই প্রথম সাহসিকতার সঙ্গে বিমানবন্দরকে সেই গোল দানবাক্স থেকে মুক্ত করা হলো।
প্রসঙ্গত, ঢাকাসহ দেশের ব্যস্ততম এলাকাগুলোর বিভিন্ন অলিতে গলিতে বিদ্যুতের খুঁটি, টি ষ্টল বা মুদি দোকানে ছোট ছোট দানবাক্স ঝুলিয়ে অবৈধ বাণিজ্য শুরু করেছে একদল প্রতারক চক্র। “মির্জাগঞ্জ মরহুম ইয়ারউদ্দিন খলিফা সাহেবের দরবারের ইয়াতিমখানার দানবাক্স”- শিরোনামে লাল দান বাক্সগুলো এখন চোখে পড়ার মতো।
নাখালপাড়ার হাজী মরন আলী রোডের একটি বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা গেল, এরকম দান বাক্স। দানবাক্সের পিছনে লেখা রয়েছে মোঃ হারুন,নং-১১৮। হারুনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানালেন একমাস পরপর এ দান বাক্সগুলো খুললে দুইতিন শত টাকা পাওয়া যায়। এভাবে তার অধীনে রয়েছে দুইশত দানবাক্স।
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের পীর সাহেবের দরবারের অনুমতি নিয়েই তিনি দানবাক্স ব্যবহার করছেন। এজন্য প্রতি মাসে তাকে একটি নির্দিষ্ট অংকের টাকা কমিটিকে দিতে হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পীরের দোহাই দিয়ে পুরো রাজধানী জুড়ে বানিজ্য করছে একদল প্রতারক চক্র। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখা গেছে একই দৃশ্য।
একটি সূত্রে জানা গেছে,মিরপুর-১ এর স্থায়ী বাসিন্দা মতিন এই বাক্স তৈরি করে চাহিদানুযায়ী সর্বত্র সরবরাহ করে। বিভিন্ন এলাকার দানবাক্সের পিছনে বিভিন্ন মানুষের নাম ও সিরিয়াল নম্বর বসানো রয়েছে।
এদেরই একজনের মোবাইল নম্বর জোগার করে যোগাযোগ করলে সে জানাল তার নাম মনির। বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে। সে মাজারের জব্বার মলিকের অনুমতি নিয়ে দানবাক্স পরিচালনা করছে। সে আগে গাড়ি চালাত। এখন দান বাক্স তদারকি করেই সংসার চালায়। ঠিক এভাবেই একশ্রেনীর অসাধু লোক মাজারের নাম ভাঙ্গিয়ে দান বাক্স ব্যবসা করে আসছে।
এব্যাপারে মাজারের একনিষ্ঠ ভক্ত ও বিশিষ্ট মুরিদ তেজগাঁ এলাকার জনৈক বাসিন্দা জনাব আশরাফুল ইসলাম বলেন, তিনি মাজার কমিটির সভাপতিকে এব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি বলেছেন এ ধরনের আরও অভিযোগ মাজার কমিটির কাছে এসেছে। তারা এ ব্যাপারে কিছু জানেন না। তিনি এ ধরনের অসাধু লোকদের শাস্তি দাবী করেন।
কে এই ইয়ারউদ্দিন খলিফা?
ইয়ারউদ্দিন খলিফা শরীয়তপুর জেলার পালং থানার ধামসী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মোহম্মদ সরাই খাঁ। মানুষকে ইসলামের পথে ডাকতে এবং ইবাদত-বন্দেগি করার অনুকূল পরিবেশ পেতে তিনি নিজ জন্মস্থান ছেড়ে মির্জাগঞ্জে চলে যান। তার সঠিক জন্মতারিখ সম্পর্কে জানা যায়নি। তার প্রকৃত নাম ইয়ারউদ্দিন খাঁ। তিনি নিজ হাতে জামা-টুপি সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন বলে ওই অঞ্চলে তার নাম হয় খলিফা বা দর্জি। সাধারণত পটুয়াখালী অঞ্চলে কাপড় সেলাইকারীদের ‘খলিফা’ নামে অভিহিত করা হয়। তবে এখানে খলিফা অর্থ তা সেটি নয়। বরং প্রচলিত দর্জি থেকেই খলিফা নামের উত্পত্তি হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তিনি কতটা শিক্ষিত ছিলেন তাও সঠিকভাবে জানা যায়নি।
তার জন্মস্থান ধামসীতে এক মহামারীতে স্ত্রী ও সন্তান মারা যাওয়ায় পর অনুমান ৩৮ বছর বয়সে তিনি মির্জাগঞ্জে যান। পেশা হিসেবে তিনি দোকানদারি (হকারি) করতেন। বিভিন্ন হাটে তিনি তার দোকান বহন করে নিয়ে যেতেন। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেন স্থানীয় মির্জাগঞ্জ গ্রামের মোঃ গগন মল্লিক। ছোট একটি ডিঙ্গি নৌকায় করে তিনি বিভিন্ন হাটে তার দোকান নিয়ে যেতেন। মাঝি হিসেবে নৌকা চালাতেন গগন মল্লিক।
তার জীবদ্দশায় অনেক অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পায়। তিনি প্রায় ৭৪ বছর পর ইন্তেকাল করেন। শ্রীমন্ত নদীর পাড়ে তার কবর দেয়া হয়। তার কবরের পাশেই নির্মিত হয়েছে সুবিশাল মসজিদ, একটি আলিম মাদরাসা, একটি হাফেজিয়া মাদরাসা, একটি এতিমখানা ও একটি ফোরকানিয়া মাদরাসা। বর্তমানে পাঁচতলা বিশিষ্ট কয়েকটি ভবনের কাজ চলছে। দরবারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হচ্ছে মির্জাগঞ্জ দরগাহ শরীফ মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি। এ সবক’টি প্রতিষ্ঠান সরকারের ওয়াক্ফ প্রজেক্টের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। প্রতি বছর বাংলা সনের ফাল্গুন মাসের ২৪ ও ২৫ তারিখে দু’দিনব্যাপী ইসালে সওয়াব মাহফিল হয়। ইসলামী শরিয়ত কঠোরভাবে পালন করার চেষ্টা করা হয়। গান-বাজনার প্রতারণা, বেদায়াতি কাজের কোনো সুযোগ এখানে নেই। দরবারের আয় মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানার কল্যাণে ব্যয় করা হয়। দরবারের খেদমতে রয়েছেন হুজুরের বিশ্বস্ত খাদেম গগন মল্লিকের সন্তান ও নাতিরা। বর্তমানে এ দরবার সরকারের ওয়াক্ফ এস্টেটের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।