বিগত আট বছর

তানজিল ইসলাম তানজু, সুইডেন: পৃথিবীর এমন এক দেশে বসে আমি এখন লিখছি যে দেশ আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও সভ্যতায় পৃথিবীর সেরা। শুধু তাই নয় এখানে আছে উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কয়েকশো বছরের পুরোনো বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়। আছে লুন্ড বা স্টকহোল্ম বিশ্ববিদ্যালয় যা পৃথিবীর সেরাদের মধ্যে অন্যতম। এই দেশে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়, ফটোগ্রাফি বা সংগীতেও এরা পৃথিবীর সেরাদের একজন।

বিগত আট বছরের অভিজ্ঞতায় এঁদের সম্পর্কে জেনেছি অনেক কিছু। যেমন ধরা যাক ভাষার ব্যাপারটা, এঁরা পুরোপুরি সুইডিশ ভাষায় কথা বলে। অথচ সুইডেনে এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল যে কিনা খুব ভালো ইংরেজি বলতে পারে না। ইংরেজিতে এরা এতটাই দক্ষ যে আপনি শুনলে ভাববেন মাত্র একজন আমেরিকানের সাথে কথা বলেছেন। কিন্তু গত আট বছরে এমন কোনো সুইডিশ খুঁজে পাইনি যে মিশ্রিত ভাষায় কিছু বলেছে। ইংরেজি বলার সময় শুদ্ধ ইংরেজি এবং সুইডিশ বলার সময় শুদ্ধ সুইডিশ বলতে পারাটাকে এঁরা উচিত মনে করে।

দৈনিক পত্রিকা বা রেডিও নির্ভর এই জাতি। এঁদের নিজস্ব হাজার হাজার রেডিও স্টেশন নেই, তবে যে কয়েকটা আছে তা মানসম্মত। আমার এক বন্ধু ছিল যে রেডিওতে চাকতি করতো। তার কাছে শুনেছি রেডিওতে কে কি বলবে, কতটুকু বলবে, কোন কথার প্রেক্ষিতে সমাজে বিরূপ প্রভাব পড়বে, কোন কথা মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে এসব নিয়ে প্রায় প্রতি সপ্তাহে সেমিনার হয়। বিগত আট বছরে কখনো রেডিও জকিদের বিকৃত উচ্চারণে সুইডিশ বলতে শুনিনি।

এখানকার ছেলেমেয়েরা ইংরেজি ও সুইডিশ ভাষার পাশাপাশি চাইলে স্কুলে আরো অন্যন্য ভাষা রপ্ত করতে পারে। যেমন আমার এক মামাতো বোনের বয়স ১৪ এবং সে সুইডিশ ও ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি স্কুলে বাংলা ও ফ্রেঞ্চ ভাষা শিখেছে এবং এই চার ভাষায়ও যথেষ্ট পারদর্শী। কিন্তু যতদূর মনে পরে আজ পর্যন্ত মিশ্রিত ভাষায় কখনো কথা বলেনি।

চারিদিকে এসব দেখে মাঝেমাঝে খুব লজ্জা লাগে। আমি এমন এক দেশের মানুষ, এমন এক দেশে আমার শেকড়, যে দেশে মাতৃভাষায় কথা বলতে পারার জন্য মানুষ হাসিমুখে জীবন দিয়েছে। অথচ সেই দেশে মিশ্রিত ভাষায় বা বিকৃত উচ্চারণে বাংলা বলতে পারাটা এখন একটা গর্বের ব্যাপার, সেই দেশে রেডিও জকিগুলো মাতৃভাষাকে প্রতিনিয়ত যেমন খুশি অপমান করছে, সেই দেশে স্কুলের বারান্দায় বসে মায়েরা সন্তানদের অসুস্থ প্রতিযোগিতা নিয়ে ব্যস্ত। আমরা তবে কোন পথে হাটছি ? পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমরা কি করছি ?

লেখক পরিচিতি: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, সুইডেন শাখা।