বাবা মানে জমিয়ে রাখা আমার অনেক ঋণ!!!

39

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন:

বাবার গল্প যত না বাবার কাছ থেকে শুনেছি, তার চেয়ে ঢের বেশি শুনেছি মায়ের কাছ থেকে। অনেকটাই চাপা স্বভাবের ছিলেন বাবা আমার। নিজেকে চাপিয়ে রাখতেন। প্রকাশ করতেন না। কথাও বলতেন কম। তবে মা উল্টো। মা কথা বলতেন। নিজেরটা তো বলতেনই। বাবারটাও বলতেন। বাবাকে নিয়ে মা প্রায়ই কথা বলতেন। সুযোগ পেলেই বলতেন। বলতেন, তোর বাবা বয়সকালে সেই রকম ছিল দেখতে! কিসের নায়ক, কিসের কি! সব ফেল! রাজ্জাক ফেল, উত্তম কুমারও ফেল!
এ তো গেল মায়ের মুখে বাবার রূপের কথা। গুণের কথাও আছে। একবার কথা উঠলে আর থামে না। অনর্গল বলেই যাবেন। কি মহব্বতরে বাবা! কথার মাঝে কেউ যদি একটু বলতে পারে, কোথায় এমন সুন্দর! অমনি কেল্লা ফতে; তোদের চোখ আছে, বোঝার শক্তি আছে? এখন তো বুড়ো হইছে। তাই একটু কেমন হইছে। কিন্তু তখন তো তোরা ছিলি না। তোরা বুঝবি কি? আমি ছিলাম। আমি দেখছি। আমি বুঝি!
কথাগুলো বলার সময় চোখ ছানাবড়া দিয়ে উঠতো মায়ের। মহব্বতের ছানা। তবে এই মহব্বত উল্টাতে সময় লাগতো না। উল্টাতো ডাইনিং টেবিলে। ডাইনিং এ মা সবাইকে ডেকে ডেকে খাওয়াতে বসিয়েছেন। টেবিলে যাই থাকুক, কোন সমস্যা নেই। কাউকে নিয়ে মায়ের কোন টেনশনও নেই; এক বাবা ছাড়া। মা তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। কান খাড়া করে তাকিয়ে আছে। বাবা চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছেন। একটা আর্টিস্টিক খাওয়া যাকে বলে। ধৈর্য্যহারা মা শেষমেষ মুখ খুলে জানতে চাইলেন, কেমন হয়েছে? এবার বাবা নড়েচড়ে বসে মাথা নীচু করেই বললেন, কেমন জানি! ভুনাটা বেশি শুকনা শুকনা হয়েছে। একটু লসা লসা, ঝোলঝোল হলে বেশ হতো!
আর যায় কোথায়! মা কড়কড় করে উঠলো। তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠা যাকে বলে। মুহূর্তেই টেবিলের পরিবেশ মেঘলা হলো। কারো দিকে না তাকিয়ে মাথা নীচু করে আমরা খেয়েই চলেছি। যার যেটা লাগছে নিজেরাই বাটি থেকে তুলে নিচ্ছি। চামচ বাটির শব্দ ছাড়া ঘরে আর কোন শব্দ আপাতত নেই। আব্বার অবস্থা কিছুটা ভিন্ন। তিনি ক্রুড মিসাইল ফেস করছেন। একের পর এক মিসাইল। তবে খাওয়া থামাননি। চুকচুক করে খেয়েই চলেছেন। চামচ বাটির শব্দের সাথে বাবার চুকচুক শব্দ যোগ হয়েছে। বলা যায় টেবিল ঠান্ডা।
শুধু বাসাটা গরম। মায়ের গরম মিসাইল ক্ষেপণে বাসা এখনো বেজায় গরম। আমরা যার যার রুমে। মায়ের ধারেকাছে যাবার উপায় আব্বার নেই। তাই পান খেতে চুপচাপ বাইরের দোকানে চলে গেলেন আব্বা। এমনি পরিবেশেও আব্বা চুপ থাকতে পারেন। পারেন ঠান্ডা থাকতে। অলওয়েজ ঠান্ডা থাকা যাকে বলে। বাই বর্ন, আব্বা বেজায় ঠান্ডা প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। সবাই বলতেন, তাঁর মত শান্ত এবং ভদ্র প্রকৃতির মানুষ হয় না। যেমনি আচার আচরণে, তেমনি চলনে বলনে।
পোশাক আশাকেও কেতা দুরস্ত ছিলেন। সমাজ কল্যাণ বিভাগের ভবঘুরে আশ্রমে জয়েন করেছিলেন সেই ব্রিটিশ আমলে কোলকাতায়। যেমনি ইংরেজী বলতেন ব্রিটিশদের মত, তেমনি পোশাকও পরতেন। স্যুট, টাই পড়া চাইই চাই। শীত-গ্রীষ্ম বিবেচনা করতেন না তেমন। ফলো করতেন মহানায়ক উত্তম কুমারকে। শুধু তিনি নন, ঐ আমলে তাঁর বয়সীরাই এমনটা করতেন। চুলেও ফ্যাশন ছিল। চুল আচড়াতেন বঙ্গবন্ধুর মত ব্যাকব্রাশ করে।
একটা বাবুয়ানা ভাব। বাজার সদাইয়েও সে ভাবটা বজায় ছিল। বাজারের সেরাটা তাঁর কেনা চাই। কোন কিছু না কিনলে নাই; কিন্তু কিনলে সেরাটাই কিনবেন। ঝুড়িভরা ডিম কেনা ছিল একটি বিশেষ শখ। রোজ সকালে সিদ্ধ ডিম খেতেই হবে। একটা নয়, দুটো খেতে হবে। নিজে খেতেন, আমাদের খাওয়াতেন। খুব পছন্দ করতেন গরুর মাংস। আগেভাগেই কসাই চাচাকে বলে রাখতেন। বাজারে ভাল গরু জবাই হলে গরুর পুরো মাথাটা তাঁর লাগবেই।
কিন্তু জীবন সব সময় এক রকম যায় না। আব্বারটাও যায়নি। ৬৬ বছরের এক জীবনে ১২টি বছর আব্বার ভাল যায়নি। খানিকটা অনটনেই কেটেছে। কিছুটা বেহিসাবী জীবনের এই মানুষটিকে প্রচন্ড হিসেবী জীবন যাপন করতে হয়েছে। কর্মজীবনের শেষ দশটি বছর মনের মত করে জীবন কাটাতে পারেননি। আমরা ছেলেরা বড় হয়ে গেছি। স্কুল, কলেজ ভার্সিটির সব খরচ সামলে আব্বা আর কুলাতে পারছিলেন না। একদিক সামাল দেন, তো অন্যদিকে টান পড়ে।
শরীরটাও তেমন ভাল যাচ্ছিল না। ইতিমধ্যেই হার্ট এ্যাটাক হয়ে গেছে একবার। ধরেছে ডায়বেটিসও। দিনকে দিন কাবু হয়ে পড়ছিলেন। প্রায়ই বুকে চিনচিন ব্যাথা করে উঠতো। সারাক্ষণ পকেটে ঔষধ রাখাই লাগতো। তবুও সংসারের হাল ছাড়ার ফুসরত পাননি। হিসেবী জীবন বলে বাজার সদাইও তাঁকেই করা লাগতো। আমরা, এই অপদার্থ সন্তানের বাবাকে এইটুকু হেল্প করতে পারিনি। ছোটরা যেমন তেমন, বড়রা সুযোগ থাকার পরও সেটা করেনি।
গরুর আস্তমাথা কেনা সেই বাবা আমার মাংস তো ভাল, বড় মাছ কেনাই ভুলে গেলেন। আগে বাজারে যেতেন শখ করে। আর এখন যেতেই চান না। তারপরও যেতে হয়। নিত্যদিন সাত সকালে বাজারও আসে। তবে ভরা চটের ব্যাগ আর আগের মত ভরা থাকে না। সবজি আসে, মাছ আসে। কিন্তু ছোট মাছ। ট্যাংরা, পুঁটি আর ছোট্ট চিংড়ী। বেশি আসে শুটকী, চ্যাপা আর নোনা ইলিশ। যদিও খেতে খুবই মজা ছিল সেসব।
তবে বিরক্তিকর ছিল পুঁটি মাছের ঝোল। রোজ রোজ সবজি দিয়ে পুঁটি মাছের ঝোল খেতে ভাল লাগতো না। খেতে বসেই মায়ের সাথে ছ্যানছ্যান করতাম। এগুলো কোন খাবার হলো, এগুলো কি মানুষে খায়? প্রতিদিন কি একই খাবার খাওয়া যায়? আরো কত কি! বলতে বলতে একদিন আব্বার সামনে টেবিলে বসে একটু বেশিই বলে ফেললাম। অসহায় বাবা আমার নিতে পারেননি। প্রচন্ড কোমল প্রকৃতির সেই বাবা অসম্ভব রকম রেগে গেলেন। প্লেটের খাবার অসম্পূর্ণ রেখে হাত ধোয়া পানি প্লেটে ঢালতে ঢালতে বললেন, যেদিন নিজে কামাই করে বাজার করতে পারবি, সেদিন বড় মাছ কিনে খাবি!
বুঝতে পারছিলাম জীবনের বড় পাপটা করে ফেলেছি। কিন্তু মুখ ফুটে আব্বাকে স্যরিটা বলতে পারিনি। দিন কয়েক পরেই শুক্রবার এলো। ছুটির দিন। যথারীতি আব্বা বাজারে গেলেন। তবে বাজার আনলেন ব্যাগ ভর্তি করে। মা তো অবাক। বাসায় কি বিয়ে পরেছে, বলে মায়ের চেঁচামেচি। অথচ বরাবরের মতই আব্বা নির্বিকার। দুপুরে খাবারের সময় কাতল মাছের আস্তমাথাটা আমার পাতে তুলে দিয়ে বাবা বললেন, বড় কাতল মাছ, বাবা। খুবই সুস্বাদু। বেশি সুস্বাদু হয় এর মাথাটা। আজ তুই পুরোটা খাবি। তুই খাবি আর আমি দেখবো বাবা। চেয়ে চেয়ে দেখবো।
আমি খাচ্ছি না। মাথা নীচু করে বসে আছি। আব্বাও বসে আছেন। খুবই হাসিখুশি এবং তৃপ্তিমাখা চোখ নিয়ে বসে আছেন। পলক পড়ছে না সেই চোখে। মাছের মাথা ভেঙে আমার মুখে পুরে দিলেন মা। বললেন, নে বাবা! তুই খেলে আব্বু শান্তি পাবে। চোখের পলক না ফেলেই মুখে থাকা মাছের মাথা আমি খেতে চেষ্টা করছি। কিন্তু খুব ভাল করে পারছি না। দু’চোখ ভেঙে জল এসেছে। লজ্জায় কাঁদছি আমি!
কাঁদছেন বাবাও! টেবিলের অপর প্রান্তে বসে কাঁদছেন!! কষ্টে নয়, বড্ড খুশিতে কাঁদছেন আমার জন্মদাতা। যাঁর চোখের পানি মুছিয়ে দেবার জন্যে গেল ছাব্বিশটা বছর ধরে খুঁজে ফিরছি আমি! খুঁজছি আকাশের তারায় তারায়, খুঁজছি গোরের আঙ্গিনায়!! যাঁর কাছে আছে আমার জন্ম জন্মান্তরের ঋণ!!!