বাংলাদেশের ভেতরে ‘আসাম’ জানে না মন্ত্রণালয়

83

যুগবার্তা ডেস্কঃঃ বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের অঙ্গরাজ্য ‘আসাম’! সেখানে বসবাস সেই রাজ্যের মানুষের। তাদের নিজস্ব ‘অসমীয়া’ ভাষা ও সংস্কৃতি আছে। তারা নিজেদের নামের পরে উপাধি লেখে ‘আসাম’। অথচ বাংলাদেশের ভেতরে ‘আসাম রাজ্যের মানুষদের’ খবর জানেন না সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
পার্বত্য রাঙামাটি পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডের একটি গ্রামের নাম ‘আসামবস্তি’। সেখানে বসবাস এসব অসমীয় বংশোদ্ভূত প্রায় দুই হাজারের মতো মানুষ। তারা বাংলাদেশি নাগরিক হলেও নিজেদের অসমীয়া মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। যদিও তারা কালক্রমে নিজেদের ‘অসমীয়া’ ভাষা ও সংস্কৃতি ভুলে যাচ্ছেন। এখন বাংলায় কথা বলেন। তবে উচ্চারণে অসমীয় টান রয়েছে। এ বিষয়ে কথা হয় আসামবস্তির বাসিন্দা পঙ্কজ আসামের সঙ্গে। পেশায় তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি জানান, পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠী আমরা অসমীয়রা। এ অঞ্চলে তালিকাভুক্ত যে ১০টি নৃগোষ্ঠী রয়েছে। তার মধ্যে আমরা নাই। আদিবাসীদের যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তার কিছুই আমরা পাই না।
তিনি জানান, আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির জন্যে আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে নানা জায়গায় আবেদন করেছি। কিন্তু এখনও স্বীকৃতি পাইনি। তবে আমরা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।
কথা হয় আসামবস্তির আরেক বাসিন্দা নিহার আসামের সঙ্গে। তিনি চট্টগ্রামে সড়ক ও জনপথ বিভাগে চাকরি করেন। তিনি জানালেন তাদের পূর্ব পুরুষদের ইতিহাস। কী কারণে ভারতের আসাম থেকে রাঙামাটিতে এসেছিলেন এবং কী কারণে এখানে বসবাস শুরু করেছেন।
নিহার আসামের কথায়, শুধু আসামবস্তি নয়, রাঙামাটি সদরে মাঝেরপাড়া ও গর্জনতলীতেও অসমীয়রা বাস করেন। যারা নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি। অধিকাংশই বৌদ্ধ ও সনাতন ধর্মাবলম্বী। বংশগতভাবে অসমীয়। রাঙামাটির এই তিন গ্রাম এবং এর বাইরে বান্দরবান জেলা সদরের উজানীপাড়া, মধ্যমপাড়া ও খাগড়াছড়ি জেলার গঞ্জপাড়ায় সর্বমোট দুই হাজারের মতো অসমীয়া পরিবার বসবাস করেন। তিনি জানান, তাদের পূর্বপুরুষরা আঠারো শতকের শেষের দিকে বর্তমান ভারতের আসাম থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছিলেন। আসাম তখন বর্তমান বাংলাদেশের সঙ্গে একীভূত ‘পূর্ববাংলা’ ছিল।
নিহার আসাম বলেন, বংশপরম্পরায় শুনে আসছি, আমাদের পূর্বপুরুষ বীরযোদ্ধারা (অসমীয়) খুব অল্পদিনের মধ্যেই আসাম রাইফেলসের হয়ে বিশেষ অভিযান চালিয়ে কুকিসহ সব গোষ্ঠীর বিদ্রোহ দমন করেন। ব্রিটিশ সরকার আমাদের এই পূর্বপুরুষদের রাজকর্মচারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর তারা পার্বত্যাঞ্চলেই স্থায়ীভাবে বসতি গড়েন। আমাদের আত্মীয়স্বজন এবং বংশধরদের অনেকেই আসামে রয়েছেন। আমরা এখন আলাদা দেশের অধিবাসী। ইচ্ছে করলেই একে-অন্যের সঙ্গে সরাসরি যোগ রাখতে পারি না। তাদের খুব মিস করি।
শান্তু আসাম নামের এক যুবক জানান, সরকারি চাকরি ও কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিবাসীদের কোটা থাকলেও আমাদের সেটা নেই। ১৯৮৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে যে ১০টি নৃগোষ্ঠী তালিকাভুক্ত হয়। তাদের মধ্যে আমাদের নাম ছিল না। এ কারণে আমরা অবহেলিত।
রাঙামাটির আসামবস্তিতে বসবাসকারী এসব অসমীয়াদের বিষয়ে কিছুই জানে না পাবর্ত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. শামসুজ্জামান বলেন, আমার কাছে বিষয়টি পুরোপুরিই নতুন। আমাদের বর্তমান প্রতিমন্ত্রী (পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক) মহোদয়ের পূর্বপুরুষরাও তো মনে হয় নেপাল থেকে এসেছেন। এ রকম যারা বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছেন, তারাই পাহাড়ি উপজাতি। কিন্তু, অসমীয়রা যে এখানে (পার্বত্যাঞ্চল) এসেছে এবং তাদের যে অসমীয় আলাদা ভাষা আছে, তা জানা নেই।
তিনি এ সময় এই প্রতিবেদকের কাছে জানতে চান তারা কোন এলাকায় বসবাস করছে। তিনি অবশ্য বলেন আমার জানা মতে, রাঙামাটিতে আসামবস্তি নামে একটি এলাকা আছে। তবে সেখানে তারা (অসমীয় বংশোদ্ভূত) করপোরেট বা ইনডিভিজ্যুয়াল আইডেন্টিটি নিয়ে বসবাস করছে কি না তা জানা নেই। হতে পারে, তারা এখন মেইনস্ট্রিমের সঙ্গে মিশে বাংলা ভাষাভাষী হয়ে গেছেন।মাছুম বিল্লাহ, আমাদের সময়.কম