বাংলাদেশিদের টাকা বাড়ছে সুইস ব্যাংকে

32

যুগবাার্তা ডেস্কঃ সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। ২০১৬ সাল শেষে সেখানে বাংলাদেশিদের নামে রয়েছে ৬৬ কোটি ৭৫ লাখ সুইস ফ্রাঁ। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এর পরিমাণ (প্রতি ফ্রাঁ ৮৪ টাকা হিসাবে) ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে সেখানে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ছিল ৫৫ কোটি ৯২ লাখ ফ্রাঁ বা ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এ হিসাবে আগের বছরের তুলনায় ২০১৬ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকা বেড়েছে ১৮ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, নির্বাচন সামনে রেখে দেশ থেকে টাকা পাচার বাড়তে পারে। অবৈধ পথে এ অর্থের একটি অংশ যাচ্ছে এসব ব্যাংকে।

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) গতকাল বৃহস্পতিবার সে দেশের ব্যাংকগুলোর সার্বিক পরিসংখ্যান নিয়ে ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৬’ নামে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে বাংলাদেশের নামে অর্থ গচ্ছিত থাকার পরিসংখ্যান রয়েছে। এতে দেখা যায়, প্রতি বছরই সুইস ব্যাংকগুলোতে এ দেশের নাগরিকদের টাকা বাড়ছে। অন্যান্য দেশের মতো এ দেশ থেকেও পাচার হওয়া অর্থের একটি অংশ এসব ব্যাংকে জমা হয়। তবে সব অর্থ পাচারের নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

গ্রাহকের তথ্য গোপন রাখার কারণে সুইস ব্যাংকগুলো অবৈধ অর্থ রাখার নিরাপদ জায়গা হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক নানা চাপের মুখে সুইজারল্যান্ড কিছুটা নমনীয় হয়েছে। উপযুক্ত প্রমাণসহ কোনো দেশ তথ্য চাইলে ক্ষেত্রবিশেষে দেশটি সহায়তা করছে। তবে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পায়নি।

গত মাসে প্রকাশিত ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্গ্নোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদনেও বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের তথ্য রয়েছে। জিএফআইর তথ্যমতে, ২০১৪ সালে এ দেশ থেকে বিভিন্ন দেশে ৯১০ কোটি ডলার বা প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বেশি মূল্য ও পরিমাণ দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) এবং রফতানির ক্ষেত্রে কম মূল্য ও পরিমাণ দেখানোর (আন্ডার ইনভয়েসিং) মাধ্যমেই প্রায় ৮০ ভাগ অর্থ পাচার হয়। সংস্থাটির হিসাবে গত ১০ বছরে এ দেশ থেকে চার লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

এসএনবির প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশিদের নামে সুইস ব্যাংকগুলোতে ‘দায়’ হিসেবে সরাসরি থাকা অর্থের পরিমাণ ৬৬ কোটি ১৯ লাখ ফ্রাঁ। এর বাইরে বিভিন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপক অর্থাৎ তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে রয়েছে আরও ৫৫ লাখ ফ্রাঁ। পরিসংখ্যান সারণিতে গত ১০ বছরের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের অঙ্কটাই সর্বোচ্চ। টাকার অঙ্কে ২০১২ সাল শেষে এসব ব্যাংকে থাকা অর্থের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। এরপর ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ছিল যথাক্রমে ৩ হাজার ১২৫ কোটি ও ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, দেশে একধরনের অনিশ্চয়তা আছে। দু’বছর পর নির্বাচন হবে। তার পর কী হয় না হয়, দেশের অবস্থা কোন দিকে যায়থ এরকম ভাবনা থেকে অনেকে টাকা পাচার করতে পারে। দ্বিতীয়ত, অনেকে নানা রকম দুর্নীতির মাধ্যমে অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করছে। এসব টাকা দেশের ব্যাংকে রাখলে জবাবদিহির মধ্যে পড়তে হতে পারে, এমন ভয়ে বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তৃতীয়ত, অর্থ পাচার হলেও সন্দেহভাজন দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে লোকজন মনে করছে, টাকা-পয়সা পাচার করে তো নিশ্চিন্তে থাকা যায়, কোনো শাস্তি হয় না। এতে করে আগে যারা পাচার করেছে তারা ছাড়াও নতুন-নতুন ব্যক্তি অর্থ পাচার করছে।

ড. সালেহ উদ্দিন মনে করেন, অর্থ পাচার ঠেকাতে কঠোর তদারকি করতে হবে। পাশাপাশি যাদের নাম প্রকাশ পাচ্ছে তাদের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। তার মতে, দেশে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন থাকলেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্য সংস্থাগুলো অন্তত দু’চারটি ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে পারে।

কয়েক বছর ধরে সুইস ব্যাংকে টাকার পরিমাণ দিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এ খবর প্রকাশিত হওয়ার পর দুই বছর আগে সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (এসএনবি) কাছে এ বিষয়ে তথ্য চেয়ে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এসএনবি তখন জানায়, কোনো ব্যক্তির নামে তথ্য চাইলে তারা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। পুরো দেশের তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড নামের প্রকাশনায় বাংলাদেশের কাছে ‘দায়’ হিসেবে যে অর্থের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়, তার মধ্যে বাংলাদেশের ব্যাংক ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের অর্থও রয়েছে, যা বৈধ। কিছু পাচার করা অর্থ থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা। তাদের মতে, কর ফাঁকি, দুর্নীতি কিংবা মানি লন্ডারিংয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া যায়। এ প্রক্রিয়ায় ভারতকে কিছু গ্রাহকের তথ্য সুইস কর্তৃপক্ষ দিতে রাজি হয়েছে। এর বাইরে তথ্য চাইলে সাধারণত পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন এমন ব্যক্তিরাও সেখানে টাকা রাখছেন। ফলে সুইস ব্যাংকের রক্ষিত সব অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়েছে এমন নয়। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিএফআইইউর প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে বর্তমানে দেশের বাইরে ৩২ জনের প্রশ্নবিদ্ধ অর্থের বিষয়ে দুদক বিস্তারিত অনুসন্ধান করছে।

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোয় বিভিন্ন দেশের বিপরীতে ‘দায়’ অথবা ‘গ্রাহকের কাছে দেনা’ খাতে থাকা অর্থকে এসএনবি সংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকে রাখা গচ্ছিত অর্থ হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশের কোনো নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান যদি অন্য দেশের নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান হিসেবে অর্থ গচ্ছিত রেখে থাকে, তাহলে তা বাংলাদেশের পরিসংখ্যানের মধ্যে আসেনি। একইভাবে সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা মূল্যবান শিল্পকর্ম, স্বর্ণ বা দুর্লভ সামগ্রীর আর্থিক মূল্যমান হিসাব করে এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অনেক দেশের নাগরিকই মূল্যবান শিল্পকর্ম বা দুর্লভ সামগ্রী সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকের ভল্টে রেখে থাকেন।

অন্যদিকে গত বছর অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক জোট আইসিআইজে প্রকাশিত পানামার আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকা থেকে ফাঁস হওয়া তথ্যে বাংলাদেশের ৫৬ ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়। এসব ব্যক্তি ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, সিসিলি, সামোয়াসহ করের স্বর্গ বলে পরিচিত বিভিন্ন দেশে নামসর্বস্ব কোম্পানি খুলে অর্থ পাচার করেছেন।-সমকাল