বরিশালের শান্ত জনপদ ক্রমেই অশান্ত হচ্ছে

84

বরিশাল প্রতিনিধি ॥ জামায়াত ও বিএনপি থেকে নব্য আ’লীগে যোগদেয়া নেতাকর্মীদের একের পর এক সহিংস ঘটনায় ক্রমেই শান্ত বরিশাল অশান্ত হয়ে উঠেছে। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী যখনই সুষ্ঠু ভোটের ঘোষণা দিয়েছেন ঠিক তখনই জেলার একসময়ে রক্তাক্ত উত্তর জনপদ মুলাদীর কাজীরচর, গৌরনদীর সরিকল ও নলচিড়া, উজিরপুরের জল্লা, আগৈলঝাড়ার বাকাল ও রত্নপুর, বাকেরগঞ্জসহ অন্যান্য ইউনিয়নে আনাগোনা বৃদ্ধি পেয়েছে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা নিষিদ্ধ ঘোষিত সর্বহারা ক্যাডারদের।
সূত্রমতে, সর্বহারাদের আনাগোনার পর বিএনপি ও জামায়াত থেকে আ’লীগে যোগদেয়া কর্মীদের একের পর এক সহিংস ঘটনায় বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হামলা, মামলা ও হত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে প্রায় প্রতিদিনই আহত হচ্ছে অসংখ্য নেতাকর্মী। শুধু সহিংসতা করে ক্ষ্যান্ত নয় ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত কতিপয় প্রার্থীদের আশ্রয়ে থাকা বির্তকিত জামায়াত-বিএনপি ও নিষিদ্ধ সর্বহারা পার্টির সদস্যরা। সরকারের ভারমুর্তি ক্ষুন্ন করতে তারা ২২ মার্চের নির্বাচনে কেন্দ্র দখল করে রাখারও হুমকি অব্যাহত রেখেছে। নৌকা মার্কার প্রার্থী ব্যতিত অন্যদলের মনোনীত কিংবা স্বতন্ত্র অধিকাংশ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থীরা অভিযোগ করেন, ক্ষমতাসীন দল মনোনীত প্রার্থীর ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা সাধারণ ভোটারদের বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতিসহ ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য প্রাণনাশের হুমকির পাশাপাশি ভোটেরদিন কেন্দ্র দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারই ধারাবাহিকতায় কয়েকটি ইউনিয়নের ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর সমর্থকেরা দলীয় প্রভাব খাঁটিয়ে মাঠ দখলের চেষ্ঠা করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অধিকাংশ ইউনিয়নের প্রার্থী ও ভোটাররা জানান, নৌকা মার্কার প্রার্থীর দায়ের করা মিথ্যে মামলা ও পুলিশ দিয়ে হয়রানী শুরু করায় ইতোমধ্যে অনেক প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের এলাকা ছাড়া হয়েছেন। ফলে শংকায় রয়েছেন অন্যসব ইউনিয়নের বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রাথীরা। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে ওইসব প্রার্থীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে লিখিত আবেদন করেও কোন সুফল পাননি। গণতন্ত্রের অধিকার সমুন্নত রাখতে সাধারন ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার কেড়ে না নেয়ার জন্য ভূক্তভোগী প্রার্থীরা প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সূত্রে আরও জানা গেছে, আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটিস্থানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ রবিবার সকালে বাকেরগঞ্জ উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের ভাতশালা গ্রামে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর সমর্থক খলিল ও রানাকে কুপিয়ে জখম করেছে বিএনপির চিহ্নিত ক্যাডাররা। আহতদের শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শনিবার বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে গৌরনদীর সরিকল ইউনিয়নের বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান এস.এম মনজুর হোসেন মিলনের কুড়িরচরের বাড়িতে শতাধিক মোটরসাইকেল বহর নিয়ে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করে নৌকা মার্কার প্রার্থীর সমর্থকেরা। এসময় হামলাকারীরা চেয়ারম্যানের স্ত্রী খালেদা পারভীনসহ ১০ নারীকে পিটিয়ে আহত করে। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে এলাকার সহস্রাধীক নারী-পুরুষ লাঠিসোটা নিয়ে হামলাকারীদের ধাওয়া করে ২৫জনকে পিটিয়ে আহত ও ২০টি মোটরসাইকেল ভাংচুর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে ব্যাপক পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি র‌্যাব-৮ এর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় তিন ঘন্টা চেষ্ঠা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনেন। এসময় চেয়ারম্যান প্রার্থী মিলন চর সরিকল এলাকায় গণসংযোগে ছিলেন। স্থানীয়রা গুরুতর আহত খালেদা পারভীনকে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করেন। চেয়ারম্যান মনজুর হোসেন মিলন অভিযোগ করেন, তার সাতজন সমর্থককে পুলিশ আটক করার পর উল্টো তাকে (মিলন) প্রধান আসামি করে তার স্ত্রীসহ ৫২জনের নাম উল্লেখ করে আরও দুই’শ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা দায়ের পর পুলিশের গ্রেফতার আতংকে কুড়িরচর গ্রাম এখন পুরুষ শুণ্য হয়ে পড়েছে। মিলন আরও অভিযোগ করেন, তার জনপ্রিয়তায় ঈশ্বানিত হয়ে তাকে এলাকা ছাড়া করার জন্য হামলার পর মিথ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, চেয়ারম্যান প্রার্থী মিলনের বাড়িতে হামলাকারী অধিকাংশরাই হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত ঘরোয়ানা থেকে সদ্য আ’লীগে যোগদানকারী নেতাকর্মী। এরপূর্বে ওইসব বির্তকিত ব্যক্তিরা মিলনের সমর্থক আখ্যাদিয়ে মহিষা গ্রামের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘরে হামলা চালিয়ে ৫ জনকে আহত করে। ওই ঘটনায়ও উল্টো মামলা দায়ের করার পর সংখ্যালঘুপাড়া পুরুষ শুন্য হয়ে পরে।
এরপূর্বে গত সোমবার পটুয়াখালীর বাউফলে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আশ্রাফ আলী ফকির। আ’লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী সামসুল হক ফকিরের সমর্থকদের সাথে একইদলের বিদ্রোহী প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেনে কর্মীদের সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়ে আশ্রাব আলী মারা যায়। এছাড়া বানারীপাড়ায় এক আ’লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে অস্ত্র দেখিয়ে অপর প্রার্থীকে ভয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। জেলার উজিরপুরের জল্লা ইউনিয়নের স্বতন্ত্র নারী চেয়ারম্যান প্রার্থী উপজেলা আ’লীগের সিনিয়র সহসভাপতি উর্মিলা বাড়ৈকে দেশত্যাগের হুমকি দিয়েছে নৌকা মার্কার প্রার্থী। মুলাদীর কাজিরচর ইউনিয়নের নৌকা মার্কার প্রার্থী আলহাজ্ব মন্টু বিশ্বাসের সমর্থকদের বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন অব্যাহত রেখেছে বিদ্রোহী প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইউসুফ আলীর সমর্থকেরা। গৌরনদী নলচিড়া ইউনিয়নের আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাসুদ হোসেনের নির্বাচনী অফিস ভাংচুরের পর তার সমর্থকদের মারধর করে ২০টি মোটরসাইকেল ভাংচুর করেছে নৌকা মার্কার প্রার্থীর লোকজনে। আগৈলঝাড়ার বাকাল ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ও আ’লীগ নেত্রী লাবন্য আক্তার তালুকদার গত ১১ মার্চ সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, তার সমর্থকদের নৌকা মার্কার প্রার্থী ও থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতিসহ হুমকি প্রদর্শন করে আসছেন। এজন্য তিনি (লাবন্য) থানার ওসি’র অপসারনের দাবিসহ শান্তিপূর্ন নির্বাচন নিয়ে শংকা প্রকাশ করে প্রধান নির্বাচন কমিশার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের আইজিপি, র‌্যাবের মহাপরিচালক, ডিআইজি, জেলা রিটার্নিং অফিসার, জেলা প্রশাসক, রিটার্নিং অফিসারসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছেন। বাকেরগঞ্জের গারুড়িয়া ইউনিয়নের জাতীয় পার্টি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী এস.এম কাইয়ুম খানের লাঙ্গল মার্কার তিনটি নির্বাচনী অফিস গত ৮মার্চ রাতে ভাংচুর করেছে নৌকা মার্কার প্রার্থীর সমর্থকেরা। ৯মার্চ সন্ধ্যায় ভরপাশা ইউনিয়নের লক্ষীপাশা গ্রামে বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী হারুন সিকদারের উঠান বৈঠকে যুবলীগ নেতাকর্মীর হামলা চালিয়ে ১০জনকে আহত করে। বাবুগঞ্জের বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর নগর (আগরপুর) ইউনিয়নের বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থককে হাতুরি পেটা করে গুরুতর আহত করেছে নৌকা মার্কার প্রার্থীর লোকজনে।
এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল মহানগর বিএনপির সভাপতি এ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও প্রশাসনের গ্রেফতার আতংকে বিএনপির প্রার্থী ও ভোটাররা শংকায় রয়েছেন। উত্তর জেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান জানান, দলীয় প্রভাব বিস্তারের জন্য ক্ষমতাসীন দল মরিয়া হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি অস্ত্রর ব্যবহারও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নির্বাচনের দিন যতোই ঘনিয়ে আসছে সংঘাতের আশংকা ততোই বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট তালুকদার মোঃ ইউনুস এমপি জানান, অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন উপহার দেয়ার জন্য সরকার বদ্ধ পরিকর। যে এর ব্যতয় ঘটাবে তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। র‌্যাব-৮’র অধিনায়ক লে. কর্নেল ফরিদুল আলম জানান, বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারে র‌্যাব জিরো টলারেন্স দেখাবে। সে যেই হোক। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সহিংসতা ঠেকাতেও র‌্যাবের এলিট ফোর্স তৎপর রয়েছে। জেলা প্রশাসক ড. গাজী মোঃ সাইফুজ্জামান জানান, নির্বাচনকালীন সময় অবৈধ ও বৈধ অস্ত্র ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। একইসাথে নির্বাচন নির্বিঘেœ করার জন্য কাজ করবে প্রশাসন। জেলা পুলিশ সুপার এসএম আকতারুজ্জামান জানান, সহিংসতারোধে পুলিশ কাজ করছে। এর ব্যতয় ঘটলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মোঃ হুমায়ুন কবির জানান, সহিংসতা ঠেঁকাতে পুলিশকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।