বরিশালের দুগ্ধ খামার থেকে দুধ কিনতে পারছে না সাধারন মানুষ

কল্যাণ কুমার চন্দ,বরিশাল.
দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র সরকারি গবাদি পশু ও দুগ্ধ উৎপাদন খামারটির প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে বিপুল সম্ভাবনাময় খামারটির উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় প্রভাবশালী সদস্যর অনৈতিক আচরণে খামার থেকে প্রতিদিন উৎপাদিত দুধ সাধারণ মানুষের মধ্যে কম দামের বিক্রির সরকারি সিদ্ধান্তটিও ব্যাহত হচ্ছে।
অথচ বাজার দরের চেয়ে কম দামে এখান থেকে দুধ বিক্রি করতে গিয়ে প্রতিবছর সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্চা দিলেও সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি খামারের দুধ কম দামে বিক্রির মহতী উদ্যোগটি মুখ থুবরে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বর্তমানে বরিশালের খামারটিতে বিভিন্ন বয়সী ও শ্রেণীর দুই’শ গবাদি পশু লালন পালন করা হচ্ছে। যারমধ্যে দুগ্ধবতি গাভীর সংখ্যা ৩৭টি। আরও বেশ কিছু গাভী এখন গর্ভবতী। যা আগামী এক থেকে ৩ মাসের মধ্যেই বাচ্চা প্রসব করবে। বিগত ঈদ-উল আযহার সময়ে এখান থেকে বিভিন্ন বয়সী ১৩টি ষাঁড় নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। বর্তমানে এ খামার থেকে প্রতিদিন গড়ে পৌনে ৩’শ লিটার করে দুধ উৎপাদন হচ্ছে। আগামী মাসেই তা ৪’শ লিটারে উন্নীত হবার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন খামারের প্রধান নির্বাহী ও পশু উৎপাদন কর্মকর্তা। তবে উৎপাদিত দুধ ইতোপূর্বে ঠিকাদারের মাধ্যমে প্রায় ৫০ টাকা লিটার দরে বিক্রি হতো। কিন্তু বর্তমান সরকার জনগণের পুষ্টির বিষয় চিন্তা করে ঠিকাদারের পরিবর্তে সরাসরি সাধারণ জনগণের কাছে দুধ বিক্রি করার বিধান চালু করেছে। জনগণের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে এই উদ্যোগটি অত্যন্ত মহতি হলেও প্রতিদিন সকালে খামরটির গেটে দুধ কিনতে আসা সাধারণ মানুষকে নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। মাথাপিছু এক লিটার করে দুধ বিক্রি করার বিধান থাকলেও অধিকাংশ মানুষের ভাগ্যে জুটছেনা এ খামারের দুধ।
স্থানীয়দের অভিযোগে জানা গেছে, প্রশাসনসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে প্রতিদিন জনপ্রতি ৫ থেকে ১০ লিটার করে দুধ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে খামারটির প্রধান নির্বাহী এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। সূত্রে আরও জানা গেছে, বরিশাল গবাদি পশু ও দুগ্ধ উন্নয়ন খামারটিতে বর্তমানে এক বছর বয়সের উর্ধ্বে আরও ৪৩টি বকনা এবং এক বছরের নিচে ২৭টি অনুরূপ গরু রয়েছে। একটি বড় মাপের ষাঁড় ছাড়াও ২৬টি এক বছরের বেশি বয়সের এবং ২৫টি কিছু কম বয়সের অনুরূপ ষাঁড় রয়েছে। খামারটি থেকে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টাকার মতো আয় হলেও এখানের গবাদি পশুর খাবার বাবদই বছরে ব্যয় হচ্ছে প্রায় পুরো অর্থ। এছাড়াও একজন কর্মকর্তা ও ৫২ জন কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বছরে ব্যয় হচ্ছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, প্রেষণে ১০জন কর্মচারীকে অন্যত্র নিয়োজিত রাখায় খামারটির সার্বিক কর্মকান্ড ব্যাহত হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিচয়ে এসব কর্মচারী তাদের সুবিধাজনকস্থানে প্রেষণের নামে কাজ করছেন। ৫০ একর জমির ওপর স্থাপিত এই খামারটির প্রায় ৩১ একর জমিতে বর্তমানে নানা ধরনের উন্নত জাতের ঘাসের চাষ হচ্ছে। যা খামারটির গবাদি পশুর অন্যতম প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে খামারটির পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যয় কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছে।
সরকারি নিজস্ব তহবিল থেকে উন্নয়ন প্রকেল্পর আওতায় ১৯৯২-৯৩ সালে বরিশাল, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে তিনটি গবাদি পশু ও দুগ্ধ উন্নয়ন খামার স্থাপনের কাজ শুরু হয়। ভূমি অধিগ্রহণসহ অবকাঠামো নির্মাণ শেষে ১৯৯৭-৯৮ অর্থ বছরের শেষভাগে বরিশালের খামারটি চালু করে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর। তবে প্রকল্পটি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর না হওয়ায় শুরু থেকে নানা জটিলতা ও অচলাবস্থার কবলে পরে দেশের তিনটি গবাদি পশু খামারই। এমনকি এসব খামারের দেড় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এক নাগারে চার বছরেরও বেশি সময় বেতন ভাতা পায়নি। ফলে অনেকে চাকরি ছেড়েও চলে যায়। অনেক আইনী লড়াই করেন। শেষে হাইকোর্টের নির্দেশে প্রকল্পটি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরসহ এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও সরকারি রাজস্ব তহবিল থেকে প্রদান করা শুরু হয় ২০০৬ সালে। সেই থেকে এসব খামারে প্রশাসনিক জটিলতার অবসানসহ আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরে আসলেও বরিশালের খামারটির পরিপূর্ণ সংস্কারসহ এটির উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে আরও অনেক আগেই।
দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র এই দুগ্ধ উৎপাদন ও গবাদি পশু উন্নয়ন খামারটির একমাত্র ওভারহেড ট্যাংকটি আজ পর্যন্ত চালুই করা যায়নি। ফলে শেডগুলোতে বিকল্প ব্যবস্থায় পানি সরবরাহ করা হলেও তা আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত নয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসভবনেও পানি সরবরাহ প্রায় বন্ধ। কর্মচারীদের বহুতল বাস ভবনগুলো দীর্ঘদিন ধরে কোন ধরনের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। ফলে এসব ভবন ইতোমধ্যে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। জীবনের ভয়ে কোন কর্মী এসব ভবনে থাকছেন না। প্রাণিসম্পদ উৎপাদন কর্মকর্তার বাসভবনটির অবস্থাও শোচনীয়। অ্যানিমেল শেডগুলোর অবস্থাও দিন দিন রুগ্ন আকার ধারণ করছে।
সূত্রমতে, এখানে নির্মিত চারটি মিল্ক শেড, পাঁচটি ড্রাই শেড, একটি বুল শেড ও একটি আইসোলেশন শেডসহ মোট ১১টি শেডের প্রায় সাড়ে ৮৮ হাজার বর্গফুট এলাকায় ৫’শ গবাদি পশু লালন পালনের সুবিধা থাকলেও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের অনুমোদনের অভাবে তা বাস্থবায়িত হচ্ছে না। এমনকি জনবল সংকটেও খামারটি পরিপূর্ণভাবে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরিশাল গবাদি পশু ও দুগ্ধ উৎপাদন খামারের একাধিক কর্মকর্তারা বলেন, খামারের সার্বিক অবস্থা অধিদফতরসহ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।