বরিশালের জেলেদের জালে ধরা পরছে ঝাঁকে ঝাঁকে মা ইলিশ ॥ প্রশ্নবিদ্ধ প্রজনন মৌসুম

122

কল্যাণ কুমার চন্দ,বরিশাল প্রতিনিধি ॥ ইলিশ ধরায় ১৫দিনের নিষেধাজ্ঞার অভিযান শেষেও বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের জেলেদের জালে ধরা পড়ছে প্রচুর মা ইলিশ। ধরা পড়া ইলিশের ৭০ভাগের পেটেই ডিম রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলেরা। তাই প্রজনন মৌসুমের সময় নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সচেতন নাগরিকদের মতে, প্রজনন মৌসুমের সময় পনের দিন পেছানো হলে আরও বেশী ইলিশ ডিম ছাড়তে পারত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, জলবায়ুর প্রভাবে ইলিশ ধরার মৌসুম এবার জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে পিছিয়ে আষাঢ়ের শেষের দিক থেকে শুরু হয়েছে। এ হিসাব অনুযায়ী শেষ কার্তিক পর্যন্ত ইলিশের দেখা মিলবে বলে আশায় বুক বেঁধেছিলেন জেলেরা। এবছর বৈরী আবহাওয়া, জলদস্যু ও ডাকাত উপদ্রব আর ভরা মৌসুমেও ইলিশের তেমন দেখা না মেলায় জেলেরা অপেক্ষায় ছিলেন। এরইমধ্যে গত ১০ আশ্বিন থেকে ২৪ আশ্বিন পর্যন্ত দুই সপ্তাহে ইলিশের প্রজনন মৌসুম বলে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল। নিষেধাজ্ঞার সময় পার হওয়ার পরে মঙ্গলবার থেকে বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের পাইকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে ইলিশ মাছের আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাউফলের ধুলিয়া থেকে নগরীর পাইকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশ বিক্রি করতে আসা জেলে বাবুল মিয়া বলেন, বর্তমানে যেসব ইলিশ ধরা পড়ছে তার প্রায় প্রতিটির পেটেই ডিম পাওয়া যাচ্ছে। ডিম ছাড়ার উপযুক্ত সময়ের আগেই প্রজনন মৌসুম ঘোষণা করায় সব মাছ ডিম ছাড়তে পারেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বরিশাল মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে ইলিশ মাছ কাটার শ্রমিক লিটন হাওলাদার বলেন, আমি যতোগুলো ইলিশ মাছ কেটেছি তার মধ্যে ৭০ভাগের পেটেই ডিম পেয়েছি। ১৫দিন পর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে এসব ইলিশ ডিম ছাড়তে পারত। তবে দীর্ঘদিন প্রতীক্ষার পর জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ায় বেজায় খুশী নলচর থেকে ইলিশ নিয়ে আসা জেলে হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, অনেকদিন অপেক্ষার পর এখন জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ছে। সামনের অমাবশ্যায় ইলিশের আরও দেখা মিলবে।
একাধিক জেলেরা জানান, বুধবার নগরীর এ মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে প্রায় এক হাজার মণ ইলিশ এসেছে। এখানে ছোট সাইজের ইলিশের দাম ছিল মনপ্রতি সাড়ে ৭ হাজার টাকা, তিন থেকে চার’শ গ্রামের ইলিশ ১৩ হাজার টাকা, চার থেকে ৫’শ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১৮ হাজার টাকা, ৬ থেকে ৯’শ গ্রাম রফতানিযোগ্য ইলিশ ২৬ হাজার টাকা, ১ কেজি ওজনের ইলিশ ৩৫ হাজার টাকা এবং তার উপরের ইলিশ ছিল প্রতিমণ ৪০ হাজার টাকা।
জেলা মৎস্য আড়ৎদার এসোসিয়েশনের সভাপতি অজিত কান্তি দাস অভিযোগ করে বলেন, বাংলাদেশে ইলিশের নিষেধাজ্ঞা থাকায় জেলেরা সে সময় মাছ না ধরায় ভারতীয় জেলেদের জালে এবার ইলিশ বেশী ধরা পড়ছে। কারণ, বাংলাদেশী জেলেরা মাছ না ধরার কারণে ওই ইলিশগুলোর একটি অংশ চালনার খাড়ি দিয়ে ভারতের সমুদ্র সীমানায় চলে গেছে। অজিত কান্তি দাস আরও বলেন, আমার সাথে পশ্চিমবঙ্গের ইলিশ এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি অতুল দাসের সাথে কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, তাদের ওখানে এখন ইলিশ রাখার জায়গা নেই। বরিশালে ছোট সাইজের ইলিশ প্রতিকেজি ১৮৬ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও পশ্চিমবঙ্গে তা এখন মাত্র এক’শ রুপিতে বিক্রি হচ্ছে বলেও অতুল দাস আমাকে জানিয়েছেন। এজন্য ইলিশ প্রজননের মৌসুমে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় আশ্বিনের শেষ দিক থেকে করলে ভাল হতো বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রজনন মৌসুমের সময় পেছানো নিয়ে জেলে এবং মাছ ব্যবসায়ীদের অভিমতের বিষয়ে ইলিশ গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান বলেন, আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখবো। ইলিশ মাছ সাধারণত সারা বছরই ডিম ছাড়ে। তবে আশ্বিন মাসের ভরা পূর্ণিমায় ডিম ছাড়ার প্রধান মৌসুম বলে এই সময়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এবারও এখন পর্যন্ত পরীক্ষা করে যা পেয়েছি তাতে ৩৫ থেকে ৩৭ ভাগ ইলিশ ডিম ছেড়েছে। এটা ৪০ ভাগ হলে ভাল হয়। কেবল ২০১৩ সালে ৪১ ভাগ ইলিশ ডিম ছেড়েছিল বলে আমরা পরীক্ষা করে পেয়েছিলাম। তবে ইলিশের ডিম ছাড়ার জন্য আরেকটি উপযুক্ত সময় সামনের অমবশ্যায় রয়েছে। তিনি আরও বলেন, জেলেরা প্রজনন মৌসুমের সময় পিছিয়ে দেওয়ার যেসব যুক্তি তুলছেন এনিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা চালানো হবে। গবেষণার ফল অনুযায়ী প্রয়োজনে প্রজনন মৌসুমের সময় পেছানো হবে।